সন্ধ্যাবেলা পুকুরপাড়ে দাদু ও নাতি, নাতির হাঁটুতে ছোট্ট চোট, পাশে ফুটবল

একটি ছোট্ট গল্প

আদর্শ ছেলে

পুকুরপাড়ে দাদু-নাতির এক বিকেল, আর একটি পুরোনো কবিতার নতুন করে বোঝা।

পুকুরের ঘাটে বসে অলসভাবে জলে পা ছপছপ করছিল দশ বছরের নীল। মুখে তার মেঘ জমে আছে। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে একটু চোট পেয়েই কেঁদে-কেটে একাকার করে বাড়ি চলে এসেছে সে। খেলাধুলা হোক বা পড়াশোনা—একটু কঠিন কিছু দেখলেই পিছিয়ে যাওয়া নীলের পুরোনো অভ্যাস।

নীলের ঠাকুরদা রতনবাবু লাঠি ঠুকঠুক করে এসে তার পাশে বসলেন। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই তিনি নাতিকে দেখছিলেন।

নীল“দাদু, আমি আর কোনোদিন ফুটবল খেলতে যাব না। একটু আছাড় খেলেই হাঁটু ছড়ে যায়, ভীষণ ব্যথা লাগে!”

রতনবাবু মৃদু হেসে পকেট থেকে একটি ছোট কাগজের টুকরো বের করলেন।

দাদু“নীল, তোকে একটা ছড়া শোনাই?”

তারপর তিনি ধীরে ধীরে বললেন—

ছড়াটি

সে ছেলে কে চায় বল, কথায় কথায়
আসে যার চোখে জল, মাথা ঘুরে যায়?

হাত পা সবারই আছে, মিছে কেন ভয়?
চেতনা রয়েছে যার, সে কি পড়ে রয়?

কবিতা ঋণ — আদর্শ ছেলে, কুসুমকুমারী দাশ

নীল“এটা তো সেই ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটা! স্কুলে পড়েছি।”

দাদু“পড়েছিস ঠিকই, কিন্তু বুঝেছিস কি?”

নীল চুপ করে রইল।

দাদুতার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “দেখ নীল, জীবনে ছোটখাটো আঘাত, ভয় আর বাধা আসবেই। কখনও পড়ে যাবি, কখনও ভুল করবি, কখনও হয়তো ব্যর্থও হবি। কিন্তু তাই বলে ভয় পেয়ে সবকিছু ছেড়ে দিলে চলবে?”

নীল ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

দাদু“সাহসী মানুষও ব্যথা পায়, ভয়ও পায়। কিন্তু সে ভয়কে নিজের পথের শেষ হতে দেয় না। পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ায়, ভুল হলে আবার চেষ্টা করে। আসল কথা হলো—হাল না ছাড়া।”

কথাগুলো নীলের মনে গিয়ে বিঁধল। সে নিজের ধুলো লাগা হাঁটুর দিকে তাকাল।

নীল“দাদু, আমি কি সত্যিই কথায় কথায় হাল ছেড়ে দিই?”

দাদুমিষ্টি হেসে বললেন, “মাঝে মাঝে দিস। তবে মানুষ চাইলে নিজেকে বদলাতে পারে। তোর হাত-পা আছে, বুদ্ধি আছে, মন আছে। সবচেয়ে বড় কথা—চেষ্টা করার শক্তি আছে।”

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। হাঁটুর ব্যথা তখনও আছে। কিন্তু মনের ভয়টা যেন অনেকটাই কমে গেছে।

নীলহাঁটুর ধুলো ঝেড়ে দৃপ্ত গলায় বলল, “দাদু, কাল বিকেলে আমি আবার মাঠে যাব।”

দাদু“আবার পড়ে গেলে?”

নীলএকটু ভেবে বলল, “তাহলে উঠে দাঁড়াব।”

দাদু“আর খুব ব্যথা পেলে?”

নীল এবার হেসে ফেলল।

নীল“তখন কাঁদতেও পারি! কিন্তু মাঠ ছেড়ে পালাব না।”

দাদুনাতির কাঁধে হাত রেখে গর্বের হাসিতে বললেন, “এই তো! আজ তুই কবিতাটা শুধু পড়িসনি—তার মানেটাও বুঝেছিস।”

সেদিন নীল হয়তো কোনো বড় পুরস্কার পায়নি, কোনো কঠিন পরীক্ষায় পাশও করেনি।

কিন্তু সে তার নিজের সবচেয়ে বড় ভয়টার বিরুদ্ধে প্রথমবার দাঁড়াতে শিখেছিল। আর সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল তার আদর্শ ছেলে হয়ে ওঠার পথ।

আজকের শিক্ষা

ব্যথা পেলে কাঁদা দোষের নয়। ভয় পাওয়াও স্বাভাবিক।

আসল সাহস হলো—আবার উঠে দাঁড়ানো, আবার চেষ্টা করা।

তুমিও পারবে। 🌱

কবিতা ঋণ আদর্শ ছেলে — কুসুমকুমারী দাশ