সেই স্বপ্ন
দুই দুটি বছর কেটে গেছে।
'নবজাগরণ ইলেকট্রনিক্স' এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্বের কয়েকটি মহাদেশের একাধিক দেশে সুনামের সাথে পণ্য রপ্তানি করছে। কারখানায় এখন প্রায় তিন হাজারেরও বেশি শ্রমিকের কর্মযজ্ঞ। প্রতিদিন শত শত ফ্রিজ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বোঝাই ট্রাক কারখানার বিশাল গেট দিয়ে ঢুকছে আর বের হচ্ছে।
এত পরিবর্তন ও বিশালতার মাঝেও কিন্তু একটি নির্দিষ্ট নিয়ম এতটুকু বদলায়নি।
প্রতিদিন সকালে অরিন্দম সেন অফিসে ঢোকার আগে নিজের গাড়ি থামিয়ে প্রধান গেটে দাঁড়িয়ে রামুর সঙ্গে অন্তত দুই মিনিট কথা বলেন।
— "সব ঠিক আছে তো রামু?"
— "জি স্যার, ঈশ্বরের কৃপায় সব ঠিক আছে।"
— "গেটে কোনো সমস্যা বা অসুবিধা?"
— "না স্যার, কোনো অসুবিধা নেই।"
সংক্ষিপ্ত এই সৌজন্যমূলক কথা শেষ করে দু'জনই যার যার দায়িত্বে ফিরে যান। এটি যেন প্রতিদিনের এক অদৃশ্য আত্মিক বন্ধন।
সেদিন ছিল এক মেঘলা শনিবার।
দুপুরের পর কারখানার প্রধান উৎপাদনে কাজ তুলনামূলক কিছুটা কম। রামুর ডিউটি ছিল সকাল ছয়টা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত।
দুপুর তিনটার দিকে অন্য সহকর্মীকে গেটে বসিয়ে রামু পাশের ছোট বিশ্রামঘরে একটু জিরিয়ে নিতে গেল। বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, সঙ্গে বয়ে চলেছে হালকা ভেজা ঠান্ডা বাতাস।
সারাদিনের ক্লান্তিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চেয়ারে হেলান দিয়ে রামুর চোখ দুটো লেগে এল।
হঠাৎ সে এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পেল—
চারপাশের আকাশ কুচকুচে কালো মেঘে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি রাস্তায় নেমে এসেছে ভয়ংকর ঝড়-বৃষ্টি। অরিন্দম সেনের সেই চেনা কালো প্রিমিয়াম গাড়িটি আঁকাবাঁকা নির্জন পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ির ভেতরে বসে আছেন অরিন্দম সেন, সুচিত্রা দেবী এবং তাঁদের ছোট ছেলে।
ঠিক তখনই পাহাড়ি রাস্তার ধারে বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বহু পুরোনো ও বিশাল এক ওক গাছ প্রচণ্ড শব্দে মচমচ করে ভেঙে পড়ল!
ধড়াম...! বিশাল গুঁড়িসহ গাছটি আছড়ে পড়ল ঠিক অরিন্দম সেনের চলন্ত গাড়ির ওপর! ক্ষণিকের মধ্যে গাড়ির কাচ চুরমার হয়ে ভেতরে ঢুকে গেল, লোহার মজবুত ছাদ চ্যাপ্টা হয়ে মিশে গেল সিটের সাথে!
স্বপ্নের ভেতর রামু চিৎকার করে উঠে সেই দিকে দৌড়ে যেতে চাইছে, কিন্তু তার দুটো পা যেন মাটিতে শিকড় গেড়ে জমে গেছে! সে একচুলও নড়তে পারছে না! সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল—
— "স্যার... স্যার... গাড়ি থামান! ওইদিকে যাবেন না স্যার...!"
কিন্তু কেউ তার চিৎকার শুনতে পেল না।
তারপর... চারদিকে এক নিস্তব্ধ, দমবন্ধ করা অন্ধকার আর নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা।
ঝাঁকুনি দিয়ে রামুর ঘুম ভেঙে গেল!
সে হাঁপাচ্ছে, বুকে হাত দিয়ে দেখে তার হৃদস্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম! শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন বাতাসেও রামুর পুরো শরীর ভয়ের ঠাণ্ডা জলে আর ঘামে ভিজে একসার!
ঠিক তখনই বিশ্রামঘরের বাইরে অত্যন্ত পরিচিত এক গাড়ির হর্ন শোনা গেল—পোঁ... পোঁ...!
রামু চমকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
বাইরে ঠিক অরিন্দম সেনের সেই কালো চকচকে গাড়িটি প্রধান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে! আজ তিনি পরিবারকে নিয়ে শহরের বাইরে এক পাহাড়ি রিসোর্টে সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছেন। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে সিকিউরিটিকে গেট খোলার সংকেত দিচ্ছে।
রামুর বুক দুরদুর করে ধড়ফড় করতে লাগল। সে নিজের দুই হাতে কপাল চেপে ধরে ফিসফিস করে নিজেকে বলল—
— "না... না... ঈশ্বর! এটা স্রেফ একটা সাধারণ খারাপ স্বপ্ন... কাজের চাপে দেখা সাধারণ স্বপ্ন..."
কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই রামুর মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল আগের ঘটনাগুলো—সেই ট্রাকের ব্রেক ফেল হওয়ার আগাম সংকেত... হারিয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশ সঠিক জায়গায় খুঁজে পাওয়া... হুট করে বিকেলে বৃষ্টির কথা বলা... যে প্রতিটি কাকতালীয় সংকেত পরে হুবহু বর্ণে বর্ণে সত্যি হয়ে গিয়েছিল!
রামু আর এক মুহূর্তও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নীতি, নিয়ম আর চাকরির ভয় ভুলে সে এক দৌড়ে সিকিউরিটি কেবিন থেকে বেরিয়ে চলন্ত গাড়ির দিকে ছুটল!
সে সোজাসুজি অরিন্দম সেনের গাড়ির একদম সামনে গিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল এবং চিৎকার করে বলে উঠল—
— "স্যার... স্যার! প্লিজ... আজ আপনারা কোথাও যাবেন না! গাড়ি ব্যাক করুন স্যার!"
হঠাৎ এই কাণ্ডে ড্রাইভার কষে ব্রেক কষল। গাড়ির ভেতরে বসে থাকা অরিন্দম সেন চরম অবাক হয়ে গাড়ির কাচ নামিয়ে বাইরে এলেন—
— "কী হয়েছে রামু? রাস্তায় এভাবে হাত তুলে দাঁড়ালে কেন? কোনো জরুরি খবর আছে?"
রামুর কণ্ঠ ভীতিতে কাঁপছে, চোখ দুটো আতঙ্কে প্রায় ঠিকরে বেরোচ্ছে! সে কোনো কথা গুছিয়ে গুছিয়ে বলতে পারছে না। বুকটা কামারের হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে।
সে তোতলাতে তোতলাতে শুধু বলল—
— "স্যার... আমি একটু আগে... খুব ভয়ংকর একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি স্যার! আপনারা পাহাড়ি রাস্তায় যাবেন না... আপনার গাড়ির ওপর..."
পেছনের সিটে বসা সুচিত্রা দেবী জানালার কাচ নামিয়ে রামুর ফ্যাকাশে ও ঘামে ভেজা মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি এক মুহূর্তে অনুভব করলেন—এই সাধারণ মানুষটি কোনো নাটক বা অভিনয় করছে না... সে সত্যিই কোনো এক অজানা অদৃশ্য আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে!
(চলবে...)
সিদ্ধান্ত
রামুর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও কাকুতি-মিনতিভরা কথা শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য গেটের চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারখানার প্রধান গেটে তখন কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী ও স্টাফ দাঁড়িয়ে। সবাই চরম বিস্ময় নিয়ে রামুর দিকে তাকিয়ে আছে—মালিকের গাড়ির সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে অশুভ স্বপ্নের কথা বলা মানে তো চাকরি হারানোর স্পষ্ট পথ তৈরি করা!
অরিন্দম সেন গাড়ি থেকে ধীর পায়ে নেমে এলেন। তিনি রামুর কাঁধে হাত রেখে খুব শান্ত ও নরম স্বরে বললেন—
— "রামু, শান্ত হও আগে। কী দেখেছ পরিষ্কার করে বলো তো?"
রামু কাঁপানো গলায় তার একটু আগের দেখা স্বপ্নের প্রতিটি বর্ণ তুলে ধরল—সেই পাহাড়ি রাস্তায় নামা কালো কালবোশেখী ঝড়... রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশালাকার পুরোনো ওক গাছ... প্রচণ্ড শব্দে গাছটি মচমচ করে ভেঙে আছড়ে পড়া... আর তারপর চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর সেই ভয়াবহ পরিণতি!
কথা শেষ করে রামু দুই হাত জোড় করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজেও জানে না, এত বড় শিল্পপতি মালিক তার এই আজব ও কুসংস্কারঘেঁষা কথার ওপর ভরসা করে সফর বাতিল করবেন কি না।
অরিন্দম সেন কয়েক সেকেন্ড নীরব হয়ে রইলেন। তিনি কোনো অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারে বিশ্বাসী আধুনিক মানুষ নন। কিন্তু এই রামুকে তিনি গত দুই বছর ধরে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই লোকটা কোনোদিন মিথ্যার আশ্রয় নেয়নি, কোনোদিন অকারণে কাজ ফেলে আতঙ্ক ছড়ায়নি।
ঠিক তখনই সুচিত্রা দেবীও গাড়ি থেকে নিচে নেমে এলেন। তিনি রামুর আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে শান্ত গলায় বললেন—
— "আজকের এই সামাজিক অনুষ্ঠানটি কি খুবই জরুরি অরিন্দম?"
অরিন্দম একটু ভেবে বললেন—
— "না, স্রেফ সৌজন্যমূলক একটি দাওয়াত।"
— "তাহলে আজকের দিনটা না গিয়ে একদিন পরে গেলে কি খুব বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে?"
অরিন্দম সেন স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— "না, সম্ভবত কোনো ক্ষতি হবে না।"
সুচিত্রা দেবী রামুর দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় বললেন—
— "তাহলে আজ আমরা আর কোথাও যাচ্ছি না।"
গাড়ির ড্রাইভার ঘটনা দেখে তাজ্জব বনে গেল!
অরিন্দম সেন কয়েক মুহূর্ত চিন্তামগ্ন থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন—
— "ঠিক আছে।"
তিনি ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন—
— "অনুষ্ঠানের উপহারগুলো তুমি এই গাড়িতে করে রিসোর্টে পৌঁছে দিয়ে এসো। আমরা অন্য দিন নতুন গাড়িতে যাব।"
ড্রাইভার একা গাড়িটি নিয়ে হর্ন বাজিয়ে কারখানার গেট পেরিয়ে চলে গেল।
অরিন্দম সেন, সুচিত্রা দেবী এবং তাঁদের ছোট ছেলে আবার প্রধান ভবনের কেবিনের দিকে ফিরে গেলেন। রামু বুকের ভেতর থেকে এক বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকের ওপর চেপে থাকা পাথরের মতো ভারটা যেন নেমে গেল।
ঠিক চল্লিশ মিনিট পরের কথা...
কারখানার মেইন কন্ট্রোল রুমের ফোনটা হঠাৎ বিকট শব্দে বেজে উঠল।
রিসেপশনিস্ট ফোনটা কানে তুলতেই তাঁর মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে ও সাদা হয়ে গেল! তিনি কাঁপতে কাঁপতে রিসিভার রেখে দৌড়ে অরিন্দম সেনের কেবিনে এলেন।
— "স্যার... স্যার...!"
— "কী হয়েছে রিয়া? এভাবে হাঁপাচ্ছ কেন?"
— "স্যার... আপনার সেই কালো গাড়িটা...!"
অরিন্দম সেন চেয়ার ছেড়ে মুহূর্তে উঠে দাঁড়ালেন—
— "কী হয়েছে গাড়ির? ড্রাইভার ঠিক আছে?"
— "হাইওয়ের কাছে পাহাড়ি মোড়ে একটা বিশাল পুরোনো গাছ ভেঙে পড়েছে স্যার! পুরো গাড়িটা একদম চ্যাপ্টা হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে...!"
সুচিত্রা দেবীর হাতের চায়ের কাপটা মেঝেতে পড়ে অমনি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল!
কয়েক মিনিটের মধ্যে অরিন্দম সেন পুলিশ নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন।
রাস্তার দুই পাশে শত শত উৎসুক মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গ্যাসের কটার দিয়ে বিশাল গাছের গুঁড়ি কেটে গাড়ি বের করার চেষ্টা করছেন। সেই দামি কালো গাড়িটি দুমড়ে-মুচড়ে একদম চেনা যাচ্ছে না! ভাগ্যক্রমে ড্রাইভার কপালজোরে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা অরিন্দমের দিকে এগিয়ে এসে ভয়ার্ত গলায় বললেন—
— "মি. সেন, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান! আপনারা যদি এই গাড়ির পেছনের সিটে থাকতেন... তবে আজ চরম বিপর্যয় ঘটে যেত!"
অরিন্দম সেন স্তব্ধ হয়ে সেই চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া ভাঙা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একবার আকাশের দিকে তাকালেন, আর মনে মনে রামুর ফ্যাকাশে চোখের কথা ভাবলেন।
সেদিন রাতে পুরো কারখানায় একটাই আলোচনা—
"রামুর দেখা সেই ভয়ংকর স্বপ্ন আবার হুবহু সত্যি হলো!"
পরদিন সকালে অরিন্দম সেন নিজে স্পেশাল পিয়ন পাঠিয়ে রামুকে তাঁর কেবিনে ডেকে পাঠালেন।
রামু ভয় পাচ্ছিল, ভাবছিল হয়তো কালকের পাগলামির জন্য তাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে। সে ভয়ে ভয়ে অফিসে ঢুকল।
কেবিনে ঢুকতেই সুচিত্রা দেবী নিজে এগিয়ে এসে রামুর সামনে একটি মোড়ানো বাক্স তুলে দিলেন।
বাক্স খুলতেই দেখা গেল—ভেতরে একটি অত্যন্ত দামি হাতঘড়ি, একটি সোনার চেইন এবং একটি খাম। খামের ভেতরে এক বিশাল অঙ্কের টাকা!
সুচিত্রা দেবীর দুই চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে আসছিল। তিনি হাত দুটি ধরে আবেগপ্লুত গলায় বললেন—
— "তুমি শুধু আমার স্বামীর জীবন বাঁচাওনি রামু... তুমি আমার গোটা সংসারটাকে ছারখার হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছ!"
রামুর চোখেও জল চলে এল। সে ধীর গলায় হাত জোড় করে বলল—
— "ম্যাডাম... এসবের কী দরকার ছিল? আমি তো কেবল আমার ভেতরের অনুভূতির কথা বলে কর্তব্যের নির্দেশ পালন করেছি মাত্র।"
অরিন্দম সেন কিন্তু সোফায় চুপচাপ বসে ছিলেন।
তাঁর মুখে কোনো হাসি ছিল না, আবার কোনো উচ্ছ্বসিত আবেগও ছিল না। তিনি গভীর চিন্তামগ্ন দৃষ্টিতে রামুর দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় শুধু বললেন—
— "রামু... কাল সকাল ঠিক দশটায় আবার আমার অফিসে এসো। তোমার সাথে আমার বিশেষ কথা আছে।"
রামু অবাক হয়ে মাথা নাড়ল। সে ঘুণাক্ষরেও জানত না—পরদিন সকালে এই কেবিনে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তটি তার জন্য অপেক্ষা করছে!
(চলবে...)
কঠিন সিদ্ধান্ত
পরদিন সকাল।
কারখানার প্রধান ভবনের সামনে এক অস্বাভাবিক ও ভারী নীরবতা। গতকালের সেই অলৌকিক দুর্ঘটনার খবর ইতিমধ্যেই গোটা কারখানায় ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রমিক থেকে কর্মকর্তা—সবার মুখে একটাই কথা—
"গতকাল ওই রামু যদি সময়মতো এসে বাধা না দিত, তবে আজ আমাদের মালিক আর তাঁর পরিবার কেউ বেঁচে থাকতেন না!"
ঠিক সকাল দশটায় রামু অরিন্দম সেনের সেন্ট্রাল কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
ভেতরে বসে আছেন মালিক অরিন্দম সেন, সুচিত্রা দেবী, মানবসম্পদ বিভাগের (HR) প্রধান এবং নিরাপত্তা বিভাগের চিফ অ্যান্ডারসন।
রামু কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে দরজায় হালকা নক করল।
— "ভেতরে এসো রামু।"
সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। মাথা বিনীতভাবে নিচু করা, হাত দুটো সামনে জোড় করা।
অরিন্দম সেন কিছুক্ষণ নীরব হয়ে বসে রইলেন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি বন্ধ নীল খাম বের করলেন। খামটি রামুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন—
— "এটা তোমার জন্য রামু।"
রামু ভেবেছিল হয়তো কালকের ঘটনার জন্য কোম্পানি থেকে আরও কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বা সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। সে মুখে একটি অমায়িক হাসি ফুটিয়ে খামটি হাতে নিল। কিন্তু খামটি খুলে চিঠির বয়ানে চোখ বোলাতেই তার মুখের সব আলো নিভে গেল! হাতের খামটা থরথর করে কাঁপতে লাগল!
চিঠির ওপর মোটা হরফে লেখা—
"চাকরি সমাপ্তির নোটিশ (Termination Letter)"
কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ঘরের বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল। রামু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
অবশেষে সে কাঁপানো বিষণ্ণ গলায় বলল—
— "স্যার... আমি... আমি কি কোনো ভুল করেছি স্যার?"
সোফায় বসে থাকা সুচিত্রা দেবী চমকে উঠে দাঁড়ালেন—
— "অরিন্দম! এসব কী হচ্ছে? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?"
তাঁর কণ্ঠে চরম ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সুর। কিন্তু অরিন্দম সেন হাত তুলে শান্তভাবে স্ত্রীকে থামালেন। তিনি ধীর পায়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে রামুর সামনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
— "রামু, গতকাল তুমি নিজের প্রাণ বাজি রেখে আমাদের পুরো পরিবারকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছ। এই ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা আমি কোনোদিন পুরো জীবনে শোধ করতে পারব না।"
রামুর চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।
অরিন্দম সেন এক মুহূর্ত থেমে ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে সুদৃঢ় গলায় বললেন—
— "কিন্তু আমি তো কেবল একজন স্বামী বা পিতা নই রামু... আমি এই হাজার হাজার শ্রমিকের আস্থা ও নীতিতে চলা প্রতিষ্ঠানের প্রধানও বটে!"
তিনি রামুর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
— "গতকাল দুপুর ঠিক তিনটের সময় তুমি কোথায় ছিলে রামু?"
রামু মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বলল—
— "গেটের পাশের বিশ্রামঘরে..."
— "সেখানে তুমি কী করছিলে?"
রামু এবার আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অরিন্দম সেন নিজে উত্তর দিলেন—
— "তুমি তোমার নির্ধারিত ডিউটির সময় চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছিলে!"
কেবিনের ভেতর পিনপতন নীরবতা নেমে এল।
অরিন্দম সেন শান্ত কিন্তু অটল বরফের মতো গলায় বললেন—
— "তুমি যদি অন্যায়ভাবে ডিউটির সময় ঘুমিয়ে না পড়তে রামু, তবে তুমি সেই স্বপ্নও দেখতে না! আর আজ যদি আমি নিজের প্রাণ বাঁচানোর ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতায় তোমার এই অমার্জনীয় অপরাধ ক্ষমা করে দিই... তবে আগামীকাল কারখানার অন্য একশো জন নিরাপত্তারক্ষীও ডিউটিতে ঘুমিয়ে ধরে পড়লে বলবে—'স্যার, আমরাও তো একটু ঘুমিয়েছিলাম!'"
তিনি টেবিলের ওপর রাখা কোম্পানির লাল রঙের নিরাপত্তা নীতিমালার বইটা তুলে ধরলেন।
— "এই নিয়ম আমি নিজে হাতে লিখেছিলাম রামু—'ডিউটির সময় ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাজনিত ঘুম চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ।' আজ যদি আমি নিজের জীবন বাঁচানোর অজুহাতে কোম্পানির এই মূল ভিত্তি ও নিয়ম ভেঙে দিই, তবে কাল থেকে কোনো কর্মচারীকে শাসন করার বা নীতি শেখানোর নৈতিক অধিকার আমার থাকবে না!"
রামুর দু'চাপসা চোখ দিয়ে অনবরত জলের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল—
— "স্যার... আপনার সিদ্ধান্ত একদম ঠিক। কোম্পানির নিয়মের চেয়ে কোনো ব্যক্তি বড় হতে পারে না।"
সুচিত্রা দেবী অবিশ্বাসের চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আর নিজের কান্না ও রাগ সামলাতে পারলেন না। চিৎকার করে বললেন—
— "যে মানুষটা কাল তোমার আর তোমার ছেলের জীবন বাঁচাল, আজ কেবল এই সামান্য নিয়মের অজুহাতে তুমি তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছ অরিন্দম? তোমার কি একটুও বুক কাঁপল না?"
অরিন্দম সেন জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিচু কিন্তু শক্ত গলায় বললেন—
— "আমি তাকে কোনো শাস্তি দিচ্ছি না সুচিত্রা... আমি কেবল নীতি আর নিয়মকে বাঁচিয়ে রাখছি।"
রামু দুই হাত জোড় করে সুচিত্রা দেবীর দিকে তাকিয়ে বলল—
— "ম্যাডাম, প্লিজ স্যারকে ভুল বুঝবেন না বা দোষ দেবেন না। যে নিয়ম কারখানার সাধারণ শ্রমিকদের মানতে হয়, আমার জন্য তো তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। স্যার একদম সঠিক কাজ করেছেন।"
রামুর এই মহানুভবতা দেখে সুচিত্রা দেবীর চোখ আবার জলে ভেসে গেল।
রামু অরিন্দম সেনের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো এক সশ্রদ্ধ স্যালুট ঠুকল। তারপর ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে অশ্রুসজল চোখে শেষবারের মতো প্রিয় কারখানাটার দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত শ্রমিক কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
তারা কেবল দেখল—যে মানুষটিকে গতকাল কারখানার প্রধান নায়ক হিসেবে সবাই মাথায় তুলে নাচছিল... আজ সে হাতে একটি নীল খাম নিয়ে মাথা নিচু করে নীরবে কারখানার সেই চেনা প্রধান গেট অতিক্রম করে চিরদিনের জন্য বেরিয়ে যাচ্ছে!
অরিন্দম সেন কেবিনের জানালার কাচ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রামুর সেই একাকী বিদায় নেওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে কঠোর নীতিবাদী এই মানুষটির চোখ থেকেও প্রথমবারের মতো দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
(চলবে...)
সম্মানের দোকান
কারখানার সেই সুবিশাল প্রধান গেটের বাইরে ছিল বহু পুরোনো একটি বটগাছ।
রামু ধীর পায়ে হেঁটে এসে সেই গাছের গোড়ার বাঁধাই করা ছায়ায় এসে বসে পড়ল। তার হাতে চাকরি শেষ হওয়ার সেই নীল খাম। দু'চোখ ভরে অশ্রুর ধারা নেমে আসছে, কিন্তু তার মুখে কারখানার প্রতি বা মালিকের প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগের সুর নেই।
সে শুধু পরম শান্তিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল—
— "আমি যদি সময়মতো ডিউটির ঘরে ঘুমিয়ে না পড়তাম..."
বাকি কথাটা সে আর শেষ করতে পারল না।
অন্যদিকে, অরিন্দম সেনের সেন্ট্রাল কেবিনে তখন শ্মশানের নীরবতা।
সুচিত্রা দেবী কাচের জানালার বাইরে তাকিয়ে অভিমানের ভঙ্গিতে বললেন—
— "আজ তুমি অহেতুক নিয়মের দোহাই দিয়ে নিজের জীবন রক্ষাকারী একজন খাঁটি ও ভালো মানুষকে চিরতরে হারিয়ে ফেললে অরিন্দম।"
অরিন্দম সেন চশমাটা খুলে অত্যন্ত ধীর ও শান্ত গলায় উত্তর দিলেন—
— "না সুচিত্রা... আমি কোনো ভালো মানুষকে হারাইনি। আমি এক খাঁটি মানুষকে ভুল স্থান থেকে সরিয়ে তার সঠিক ও যোগ্য পথে পাঠালাম।"
সুচিত্রা অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকালেন।
অরিন্দম টেবিলের গোপন ড্রয়ার খুলে একটি নীল ফাইল বের করলেন। ফাইলের ভেতরে গত দুই বছরের রামুর প্রতিটি কাজের রিপোর্ট। একটা জায়গাতেও কোনো নেতিবাচক মন্তব্য বা ভুলের আঁচড় নেই। প্রতিটা মূল্যায়নে বিভাগীয় প্রধানরা লিখেছেন—'সৎ', 'সময়নিষ্ঠ', 'সুশৃঙ্খল', 'বিশ্বস্ত' ও 'অত্যন্ত সৌজন্যপূর্ণ'।
অরিন্দম ফাইলটি স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন—
— "যে মানুষটা সততার প্রতীক, সে সাময়িকভাবে এক জায়গায় চাকরি হারাতে পারে সুচিত্রা... কিন্তু নিজের আদর্শ আর সম্মান কোনোদিন হারায় না।"
সেদিন সন্ধ্যায় সুচিত্রা দেবী অরিন্দমের নির্দেশেই একাকী রামুর বাড়িতে গেলেন।
শহরের প্রান্তে একটি সাধারণ ইটের দেওয়াল ও টিনের চালের ঘর। উঠোনে প্রদীপ জ্বালা তুলসী মঞ্চ। রামুর বৃদ্ধা মা দরজা খুলতেই দেশের এত বড় ধনকুবের শিল্পপতির স্ত্রীকে নিজের দরজায় দেখে হতবাক হয়ে গেলেন—
— "ম্যাডাম! আপনি আমাদের এই গরিবের কুঁড়েঘরে?"
সুচিত্রা ঘরে ঢুকে পরম মমতায় বৃদ্ধার হাত ধরলেন। রামুও চেয়ার ছেড়ে সসম্মানে উঠে দাঁড়াল—
— "ম্যাডাম, আপনি এখানে কষ্ট করে কেন এলেন?"
সুচিত্রা টেবিলের ওপর একটি মোটা রাজকীয় খাম রাখলেন। রামু খামটি দেখেই চট করে মাথা নাড়ল—
— "না ম্যাডাম, ক্ষমা করবেন! আমি আর কোনো অনুগ্রহ বা টাকা নেব না।"
সুচিত্রা আলতো হেসে উত্তর দিলেন—
— "এটা কোনো দান বা দয়া নয় রামু।"
— "তবে?"
— "এটা তোমার নতুন জীবনের রাজকীয় মূলধন।"
রামু কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। সুচিত্রা দেবী চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন—
— "তুমি কি সারাজীবন অন্যের দরজায় গেটপাহারাদারির চাকরিই করে যেতে চাও? নাকি একদিন নিজের যোগ্যতায় নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাও?"
রামু নিচু স্বরে বলল—
— "আমার ছোটবেলা থেকেই একটা স্বপ্ন ছিল ম্যাডাম... নিজের ছোট্ট একটা ইলেকট্রনিক্সের দোকান দেব, যেখানে মানুষ ঠকবে না।"
সুচিত্রা দেবীর মুখে এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল—
— "তবে আজ সেই স্বপ্নটাই পূরণ করো রামু!"
তিনি খামটা রামুর হাতে তুলে দিয়ে বললেন—
— "এটা কোনো ঋণ নয়, এটা একজন কৃতজ্ঞ মায়ের পক্ষ থেকে দেওয়া উপহার। আর একটা শর্ত আছে কিন্তু!"
রামু অবাক হয়ে তাকাল—
— "কী শর্ত ম্যাডাম?"
সুচিত্রা দেবী সুদৃঢ় গলায় বললেন—
— "দোকানে তুমি শুধু ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রি করবে না রামু... মানুষের অটুট বিশ্বাসও বিক্রি করবে!"
রামুর চোখ জলে ভেসে গেল। সে খামটি কপালে ঠেকিয়ে বলল—
— "আমি আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই কথা রাখব ম্যাডাম।"
সেদিন রাতে অরিন্দম সেন বারান্দায় একা বসে ছিলেন। সুচিত্রা ফিরে এসে সব ঘটনা বললেন। অরিন্দম সেন জানালার বাইরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন—
— "তুমি একদম সঠিক কাজটা করেছ সুচিত্রা।"
সুচিত্রা একটু অভিমান করে বললেন—
— "তাহলে এই কাজটা তুমি নিজে কেন করলে না? তাকে এভাবে তাড়িয়ে দেওয়ার কী দরকার ছিল?"
অরিন্দম সেন আকাশের তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন—
— "আমি যদি এই টাকা দিতাম সুচিত্রা, তবে বাইরের সমাজ আর কর্মীরা বলত—বরখাস্ত করাটা স্রেফ এক নাটক ছিল! কিন্তু তুমি দেওয়াতে রামু বুঝতে পেরেছে, এটা এক মায়ের আত্মিক কৃতজ্ঞতা... যা কোম্পানির কঠোর আইনি সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে।"
সুচিত্রা দেবী স্তব্ধ হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি প্রথমবার অনুভব করলেন—অরিন্দম সেন কেবল একজন সফল কোটিপতি শিল্পপতি নন... তিনি এক মহৎ, প্রাজ্ঞ ও ন্যায়পরায়ণ নেতা!
তিন মাস পরের কথা...
শহরের এক ব্যস্ত ও প্রধান মোড়ে চমৎকার সাজানো ছোট একটি নতুন শোরুম খুলেছে। ওপরে জ্বলজ্বল করছে নীল রঙের সাইনবোর্ড—
"রামু ইলেকট্রনিক্স" — বিশ্বাসই আমাদের আসল মূলধন
দোকানটি খুব বিশাল কিছু নয়, তবে অসম্ভব পরিচ্ছন্ন ও সুসংগঠিত। এক পাশে আধুনিক ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, অন্য পাশে সার্ভিস কাউন্টার আর বসার স্থান।
প্রথম দিন থেকেই রামু একটি স্বীয় নীতি চালু করেছিল—যে ক্রেতাই দোকানে ঢুকবেন, তাঁকে প্রথমে বসিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা জল দেওয়া হবে। তারপর কাজের কথা। কোনো গ্রাহকের প্রয়োজনের তুলনায় যদি কম দামের পণ্যই যথেষ্ট হয়, রামু কোনো প্রলোভনে না গিয়ে তাকে সেটাই সাজেস্ট করত।
অনেকে বলত—
— "এভাবে সততা দেখাতে গেলে ব্যবসায় লাভ হবে না রামু!"
রামু শুধু একগাল নিষ্পাপ হাসি হেসে বলত—
— "বিশ্বাসে সাময়িক লাভ কম হলেও, কোনোদিন লোকসান হয় না ভাই।"
একদিন দুপুরে একটি কালো চকচকে গাড়ি দোকানের সামনে এসে থামল।
রামু তখন এক বৃদ্ধ গ্রাহককে খুব ধৈর্য ধরে ফ্রিজের ব্যবহারবিধি বুঝিয়ে দিচ্ছিল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন স্বয়ং অরিন্দম সেন এবং সুচিত্রা দেবী! তাঁরা কোনো গোপনীয়তা না রেখে, কোনো সাধারণ ক্রেতার ছদ্মবেশ না ধরে... একদম প্রকাশ্যে, মাথা উঁচু করে একজন মহান নেতা ও অভিভাবক হিসেবে রামুর দোকানে পা রাখলেন।
গ্রাহক বিদায় নেওয়ার পর রামু মুখ তুলে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল!
সে এক মুহূর্তের মধ্যে দোকান থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসে অরিন্দম সেনের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেল। অরিন্দম সেন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে বললেন—
— "কী রে রামু? নিজের শোরুমটা আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবি না?"
রামুর দু'চোখ খুশিতে জলে ভরে উঠল। সে একে একে পুরো দোকান ঘুরিয়ে দেখাল।
ঠিক তখনই দোকানে এক নতুন ক্রেতা ঢুকলেন। তিনি অরিন্দম সেনকে চিনতে না পেরে সরাসরি রামুকে বললেন—
— "রামু ভাই, একটা ভালো ফ্রিজ দেখান তো! তবে আমার বাজেট কিন্তু খুব কম।"
রামু তাঁকে সবচেয়ে দামি বা মাঝারি মডেলের দিকে না নিয়ে, সবচেয়ে টেকসই ও সাশ্রয়ী মডেলের দিকে নিয়ে গিয়ে বলল—
— "স্যার, আপনার পরিবারের জন্য এই মডেলটাই একদম যথোপযুক্ত। অহেতুক বেশি টাকা খরচ করার কোনো দরকার নেই।"
গ্রাহক অত্যন্ত খুশি হয়ে ফ্রিজটি বুক করে নিলেন।
অরিন্দম সেন চুপচাপ পুরো দৃশ্যটি উপভোগ করছিলেন। ক্রেতা চলে যেতেই তিনি আলতো হেসে বললেন—
— "তুই তো চাইলে ওনাকে আরও বেশি দামি ফ্রিজটা বুঝিয়ে বিক্রি করে বেশি কমিশন লাভ করতে পারতিস রামু!"
রামু পরম শান্তিতে উত্তর দিল—
— "আজ হয়তো সাময়িক কয়েকটা টাকা বেশি লাভ হতো স্যার... কিন্তু কাল ওই মানুষটি যখন বুঝতে পারতেন, তখন তিনি আর কোনোদিন আমার এই বিশ্বাসে গড়ে ওঠা দোকানে পা রাখতেন না!"
অরিন্দম সেনের চোখে তৃপ্তির ঝিলিক ফুটে উঠল। তিনি নিজের পকেট থেকে মখমলে মোড়ানো একটি ছোট্ট বাক্স বের করে রামুর হাতে দিলেন—
— "এটা কোনো কোম্পানির মালিকের পক্ষ থেকে নয় রামু... এটা তোর দোকানের এক সন্তুষ্ট গ্রাহকের পক্ষ থেকে উপহার।"
বাক্সটি খুলতেই রামুর হাত কাঁপতে লাগল!
ভেতরে সাজানো কারখানার সেই পুরোনো 'নিরাপত্তারক্ষীর ব্যাজটি'—যেটি রামু চাকরি ছাড়ার দিন চোখের জলে জমা দিয়ে এসেছিল! সেই ব্যাজের পেছনে অরিন্দম সেন নতুন করে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে লিখেছেন—
"সততা ও কর্তব্যবোধের কোনো অবসর হয় না।"
রামু আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে বসে সেই ব্যাজটি বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
দোকান থেকে বের হওয়ার আগে অরিন্দম সেন রামুর দিকে তাকিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে বললেন—
— "আমি একদিন তোকে সামান্য এক নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে চাকরি দিয়েছিলাম রামু... আর আজ দেখছি, তুই এই শহরের হাজার হাজার মানুষের আস্থার পরম রক্ষক হয়ে উঠেছিস!"
গাড়িতে ওঠার আগে সুচিত্রা দেবী একবার ফিরে তাকালেন।
দেখলেন—রামু আবার একজন সাধারণ ক্রেতাকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিনীত হাসিমুখে স্বাগত জানাচ্ছে... ঠিক যেমনটি সে একদিন 'নবজাগরণ ইলেকট্রনিক্স'-এর প্রধান গেটে দাঁড়িয়ে করত!
সুচিত্রা দেবী আলতো হেসে বললেন—
— "ও সেদিন চাকরি হারায়নি অরিন্দম... ও আসলে নিজের জীবন আর সততার সঠিক ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিল।"
অরিন্দম সেন গাড়ির কাচ নামিয়ে শেষবারের মতো সাইনবোর্ডটির দিকে তাকালেন—"রামু ইলেকট্রনিক্স"।
গাড়িটি ধীরে ধীরে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে গেল। আর রামুর দোকানের দরজার ঘণ্টাটি আবার বেজে উঠল। এক নতুন গ্রাহক ভেতরে ঢুকলেন।
রামু তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে দুই হাত জোড় করে আগের মতোই নিষ্পাপ হাসিমুখে বলল—
— "স্বাগতম স্যার! বলুন, আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?"
সেই অকৃত্রিম ও মহৎ হাসির মধ্য দিয়েই সমাপ্ত হলো এক সাধারণ নিরাপত্তারক্ষীর অসাধারণ ও অমর জীবনসংগ্রামের গল্প।
(সমাপ্ত)