পনেরো বন্ধুর জীবন, পনেরোটি পথ, আর হারিয়ে যাওয়া কিছু চাবির গল্প
তখন তারা সবাই দশ-এগারো বছরের, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রী। একই প্রাথমিক বিদ্যালয়, একই মাঠ, একই শিক্ষক, একই লম্বা কাঠের বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসা — অরুণ, বিপ্লব, সুমন, হরিপদ, গৌতম, রতন, সঞ্জয়, দেবাশিস, তন্ময়, মামনি, রূপা, অনির্বাণ, বিকাশ, ঝুমা, কার্তিক। পনেরো জন।
টিফিনের ফাঁকে অরুণ বেঞ্চে খড়ি দিয়ে ফুলের নকশা আঁকত, বাবার শেখানো দাগ। বিপ্লব ক্লাসের দেয়ালে হাত বুলিয়ে কাঠের গায়ের নকশা খুঁজত। সুমন দুপুরবেলা বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজে যাওয়ার গল্প করত, তারপর লজ্জা পেয়ে থেমে যেত। হরিপদর জামায় সবসময় মাটির গন্ধ লেগে থাকত। গৌতম টিফিনবক্সে করে ছোট্ট চারাগাছ আনত স্কুলের বাগানে বসাবে বলে। রতন গাছের পাতা চিনিয়ে দিত বন্ধুদের, কোনটা ওষুধ, কোনটা বিষ। সঞ্জয়ের কাছে সবসময় দোকানের টফি থাকত, বাবার দোকান থেকে আনা। দেবাশিস আইনের বই ঘাঁটত বাবার চেম্বার থেকে চুরি করে আনা পুরোনো পত্রিকায়। তন্ময় সবচেয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করত, কারণ তার আর কিছুই ছিল না ভরসা করার মতো। মামনি টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই গুনগুন করত। রূপা স্লেটে ফুল-লতা আঁকত, ঠিক তার মায়ের নকশিকাঁথার মতো। অনির্বাণ মুখে বাঁশির সুর নকল করত। বিকাশ মাঠের কাদামাটি দিয়ে ছোট ছোট মূর্তি বানাত। ঝুমা টিফিনের ঘণ্টিতেও পায়ে তাল রাখত। তখন কেউ জানত না, কুড়ি বছর পর তাদের জীবন কতটা আলাদা হয়ে যাবে।
কুড়ি বছর পর, তারা সবাই জীবনের তিরিশের দোরগোড়া পেরিয়ে এসেছে, সেই একই স্কুলের মাঠে পুনর্মিলনী উৎসব। মঞ্চ বাঁধা হয়েছে, পুরোনো ছাত্রছাত্রীদের চিঠি পাঠিয়ে ডাকা হয়েছে। গেট দিয়ে একে একে ঢোকে সবাই — কারও চুলে পাক ধরেছে, কারও কোলে বাচ্চা, কারও হাতে এখনও পুরোনো ব্যাগের মতো একটা কিছু।
"তুই অরুণ না?"
"চিনতে পারলি! তুই তো একদম বদলে গেছিস, বিপ্লব।"
"সুমন! তুই এত মোটা হয়ে গেছিস কবে?"
"আর তুই যে রোগা হয়ে গেছিস, তন্ময়! খাওয়াদাওয়া করিস তো?"
"মামনি, তুই তো এখনও গান করিস শুনলাম?"
হাসি, আলিঙ্গন, পুরোনো স্মৃতি হুড়মুড়িয়ে ফিরে আসে। কেউ একজন হেসে বিপ্লবকে বলে, "তোর বাবা তো কাঠের কাজ করতেন, না? সেই যে ঠাকুরঘরের দরজায় পাখি খোদাই করে দিয়েছিলেন?"
"হ্যাঁ। তখন বুঝিনি ওটা কতটা কাজের ছিল," বিপ্লব হাসে।
এই একটা বাক্য যেন বাঁধ খুলে দিল। ধীরে ধীরে সবাই বুঝতে শুরু করে — একই বেঞ্চে বসা পনেরোটা শিশুর জীবন এখন পনেরোটা সম্পূর্ণ আলাদা গল্প।
একে একে সবার খবর আসতে থাকে। অরুণ পাথরকল-এ কাজ করে, বিপ্লবের নিজের একটা ছোট্ট কাঠের ওয়ার্কশপ, সুমন এখনও নির্মাণক্ষেত্রে শ্রমিক, হরিপদ নতুন কৃষি-উদ্যোগ নিয়ে ব্যস্ত, গৌতম চাকরির পাশাপাশি নার্সারি চালায়, রতন বাবার ভেষজ খাতাটা যত্ন করে রেখে দিয়েছে, সঞ্জয় এখন বাবার দোকানটাকে নতুন করে বুঝতে শিখছে, দেবাশিস বাবার চেম্বারে ফিরেছে, মামনি পাড়ার বাচ্চাদের গান শেখায়, রূপার নিজের একটা ছোট্ট বুটিক হয়েছে, অনির্বাণ দাদুর বাঁশিটা মেরামত করিয়েছে, বিকাশ স্কুলে ছবি আঁকা শেখায় আর সপ্তাহান্তে মাটি নিয়ে বসে, ঝুমা মেয়ের স্কুলে লোকনৃত্য শেখায়, কার্তিক আবার তাঁতের সামনে বসতে শিখছে। আর তন্ময় — এখনও চাকরির খোঁজে, তবু হাসিমুখে সবার গল্প শোনে। কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ বেসরকারি, কেউ ব্যবসায়, কেউ এখনও সংগ্রাম করছে — কোনো একটা পথকেই গল্প "ঠিক পথ" বলে না।
অরুণের বাবা পাথরে ফুল-লতা, মন্দিরের অলংকরণ, দরজার ফ্রেম খোদাই করতেন হাত দিয়ে। ছোট্ট অরুণ পাশে বসে দেখত বাবার হাতুড়ি-ছেনির শব্দ, দেখত কীভাবে একটা সাদামাটা পাথরের চাঁই আস্তে আস্তে ফুল হয়ে উঠত। মা রান্নাঘর থেকে মাঝেমধ্যে ডাক দিতেন, "ওকে ধুলোর মধ্যে বসিয়ে রেখো না, সারাদিন কাশছে।" বাবা হাসতেন, বলতেন না কিছু, শুধু অরুণের হাতে ছোট্ট একটা ছেনি ধরিয়ে দিতেন।
"এই দাগটা ভুল হলে পুরো নকশাটা নষ্ট হয়ে যাবে," বাবা বলতেন। অরুণ উত্তর দিত, "আমি এসব করব না বাবা। আমি চাকরি করব।"
বাবা আর জোর করেননি। শুধু একদিন মাকে বলতে শুনেছিল অরুণ, "ছেলে অন্য পথে যাক, ক্ষতি নেই। কিন্তু হাতের এই কাজটা ওর ভেতরে থেকে যাক, এটুকু চাই।" অরুণ তখন কথাটার মানে বোঝেনি। পড়াশোনা করল, একের পর এক চাকরির পরীক্ষা দিল, কোনোটাই হলো না। শেষে একটা পাথরের কারখানায় সাধারণ শ্রমিক হিসেবে ঢুকতে হলো — প্রথম দিন হাতে গ্লাভস পরে পাথর তোলার সময় তার মনে পড়ল বাবার হাতে কোনোদিন গ্লাভস দেখেনি, খালি হাতেই পাথরকে ফুল বানাতেন।
সেখানে একদিন দেখল, আরেকজন শ্রমিক মেশিনে ঠিক সেই নকশাই কাটছে, যা তার বাবা হাতে কাটতেন। ততদিনে বাবা বৃদ্ধ, চোখে ভালো দেখেন না, ছেনি ধরার হাতও কাঁপে। অরুণ সেদিন বাড়ি ফিরে বাবার পুরোনো ছেনি-বাটালিগুলো বের করে দেখেছিল — মরচে ধরেছে, কিন্তু ধারটা এখনও চেনা যায়। শিল্পটা হারায়নি। হারিয়ে গেছে শুধু তার পরিবার থেকে। সে এখনও পাথরকলের শ্রমিক, কিন্তু এখন মাঝে মাঝে বাবার পাশে বসে পুরোনো নকশা আঁকার চেষ্টা করে।
মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলি ভালো লাগছিল বিপ্লবের, নিজের ছেলেবেলার একটা টুকরো যেন ফিরে এল তার চোখেও।
বিপ্লবের বাবা কাঠে ফুল, পাখি, পৌরাণিক চরিত্র খোদাই করতেন। ঠাকুরঘরের দরজায় যে পাখি দুটো, ওটা বিপ্লবের ঠাকুমার জন্মদিনে বাবার উপহার ছিল। বিপ্লবের কাছে এটা মনে হতো পুরোনো, সেকেলে একটা কাজ। বন্ধুরা যখন নতুন নতুন যন্ত্রের কথা বলত, বিপ্লব লজ্জা পেত বলতে যে তার বাবা এখনও হাতে ছেনি দিয়ে কাঠ কাটেন।
সে পড়াশোনা করে চাকরির চেষ্টা করল, হলো না, শেষে একটা ফার্নিচার কারখানায় সাধারণ কর্মচারী হয়ে ঢুকল — শুধু কাঠ তোলা-নামানোর কাজ, নকশার ধারেকাছেও না।
একদিন কারখানার সিএনসি মেশিনে যে নকশাটা কাটা হচ্ছিল, সেটা দেখে সে থমকে দাঁড়াল — এই নকশাটাই তার বাবার পুরোনো খাতায় আঁকা ছিল। বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সেদিন রাতে বাড়ি গিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার খাতাগুলো এখনও আছে?" বাবা অবাক হয়ে তাকালেন, তারপর হেসে বললেন, "আছে। ভাবলাম তুই আর কোনোদিন চাইবি না।"
"বাবার হাতের কাজটা শিখলে আজ আমি মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে শুধু কাজ করতাম না — মেশিনটাকেও কাজে লাগাতে পারতাম।"
সে রাতে বাড়ি গিয়ে বাবার কাছ থেকে আবার ছেনি ধরা শেখে। প্রথম কয়েকটি কাজ খারাপ হয়। তারপর কারখানার CNC-র ডিজিটাল নকশার সঙ্গে হাতের নকশা মিলিয়ে নতুন কাজ শুরু করে। এই উপলব্ধি থেকেই বিপ্লব ছুটির দিনগুলোয় বাবার পুরোনো খাতাগুলো নতুন করে ঘাঁটতে শুরু করে, রাতে অফিসের পর একটু একটু করে কাঠের কাজ শেখে। স্ত্রী প্রথমে চিন্তিত ছিলেন, পরে নিজেই বাজারে ছোট ছোট নকশার জিনিস বিক্রি করতে সাহায্য করেন। কয়েক বছর পর, চাকরি না পেলেও, বিপ্লব নিজের একটা ছোট্ট ওয়ার্কশপ দাঁড় করায় — যেখানে বাবার হাতের নকশা আর মেশিনের গতি, দুটোই একসঙ্গে কাজ করে।
বিপ্লবের ওয়ার্কশপের কথা শুনে সুমন একটু হাসল — তার নিজের পথটা অতটা মসৃণ হয়নি।
সুমনের বাবা এলাকার সবচেয়ে দক্ষ রাজমিস্ত্রি। মানুষ দূর-দূর থেকে তাঁকে ডাকত দেওয়াল তুলতে, কারণ তাঁর তোলা দেওয়াল নাকি কখনও ফাটে না। কিন্তু সুমন বাবার সঙ্গে কাজ করতে লজ্জা পেত — একবার স্কুলের বন্ধুরা দেখে ফেলেছিল বাবার সঙ্গে ইট বওয়া অবস্থায়, তারপর থেকে সে আর কখনও দিনের বেলায় কাজে যায়নি। বাবা কিছু বলেননি, শুধু সেদিন সন্ধ্যায় চুপচাপ হাত ধুয়ে বসেছিলেন অনেকক্ষণ।
সুমন পড়াশোনাতেই মন দিল। চাকরি হলো না, শেষে নির্মাণক্ষেত্রেই কাজ নিতে হলো তাকে — ঠিক সেই কাজ, যেটা করতে সে একদিন লজ্জা পেয়েছিল। সে বাবার সঙ্গে কাজে যেত, কিন্তু শেখার জন্য নয়। বালতি ধরত, ইট এগিয়ে দিত, বালি টানত—বাবা কীভাবে মাপ নেন, সুতো টানেন, দেওয়াল সোজা রাখেন, সেদিকে তাকাত না।
কিন্তু সে রাজমিস্ত্রি নয়, লেবার। কারণ যে বয়সে দক্ষতাটা শেখার কথা ছিল, সে শেখেনি। তার বাবা এখনও জানেন দেওয়াল কোথায় কতটা চাপ নেবে, কোন ইঁটে ফাঁক রাখলে দেওয়াল বসবে না। সুমন শুধু জানে, "বাবু, বালি কোথায় নামাব?" একদিন কাজের ফাঁকে বাবা এসে দেওয়ালের একটা কোণ দেখিয়ে বলেছিলেন, "এখানে একটু বাঁকা হয়ে গেছে," আর সুমনের মনে হয়েছিল, এই একটা লাইনের মধ্যে যে জ্ঞান আছে, তার শেখার জন্য একটা গোটা ছেলেবেলা লাগত।
সুমনের কথাগুলো শুনে হরিপদ ভাবলো — মাটির সঙ্গে তারও একরকম সম্পর্ক ছিঁড়ে গিয়েছিল একসময়।
হরিপদের বাবা মাটি দেখেই বুঝতে পারতেন কখন বীজ ফেলতে হবে — ক্যালেন্ডার লাগত না তাঁর। মাটির রং দেখে, হাতে চেপে বলে দিতেন এবার বৃষ্টি কতদিনে আসবে। ছেলে কৃষিকে ছোট পেশা ভেবে দূরে সরে গেল, শহরে গিয়ে অন্য কাজ খুঁজল।
বছর কয়েক পর, যখন জলবায়ু বদলে যাচ্ছে, বাজারও বদলে যাচ্ছে, তখন মাটির পরীক্ষা, আবহাওয়ার তথ্য, উন্নত বীজ এবং সরাসরি বাজারজাতকরণ মিলিয়ে ছোট কৃষি-উদ্যোগ শুরু করার সুযোগ আসে তার সামনে। এক বর্ষার সকালে হরিপদ ফিরে জমিতে দাঁড়ায়। পাশের জমির চাষিরা এবার কোন জাতের ধান বুনবে তা নিয়ে দ্বিধায়। হরিপদ মাটি হাতে তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
"মাটির ওপর শুধু তাকাবি না, মাটির গন্ধটাও চিনবি," বাবার পুরোনো কথাটা হঠাৎ মনে পড়ল।
সেদিন হরিপদ প্রথমবার বুঝল, বাবা কোনো বই পড়ে এই জ্ঞান পাননি — বছরের পর বছর জমির সঙ্গে কথা বলতে বলতে শিখেছিলেন। হরিপদ নিজের মোবাইলে মাটি পরীক্ষার রিপোর্ট, আবহাওয়ার তথ্য আর বাজারদর মিলিয়ে নতুন পরিকল্পনা করে — বাবার পুরোনো অভিজ্ঞতা আর আধুনিক প্রযুক্তি এবার তার কাছে আলাদা দুটো জগৎ নয়, একসঙ্গে কাজ করা দুটো হাতিয়ার।
হরিপদের কৃষি-উদ্যোগের কথা শুনে গৌতম বলল, তার নিজের নার্সারির গল্পটাও অনেকটা একই রকম — ফিরে আসার গল্প।
গৌতমের বাবার নার্সারিতে শুধু গাছ বিক্রি হতো না — বাবা জানতেন কোন ডাল থেকে কলম বসিয়ে নতুন গাছ তৈরি হবে, কোন গাছে কখন কলম বসাতে হয়, মাটির মিশ্রণ কীভাবে বানাতে হয়, দেশি-বিদেশি ফুলের পরিচর্যা কীভাবে করতে হয়। ছোট গৌতম শুরুতে বাবার পাশে পাশেই কাজ শিখেছিল, কিন্তু পড়াশোনা আর চাকরির চাপে ধীরে ধীরে সরে যায়।
গৌতম চাকরিও পায়, শহরে চলে যায়। বহু বছর পর যখন ফেরে, বাবা আর নেই। নার্সারির এক কোণে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া পুরোনো গোলাপগাছটা দেখে সে থেমে যায়:
"গাছকে বড় করতে শুধু জল দিলেই হয় না। তাকে বুঝতে হয়।"
গৌতম চাকরি ছাড়েনি, কিন্তু ছুটির দিনে নার্সারিটা আবার চালু করে, নতুন করে শেখে যা ছোটবেলায় অর্ধেক শেখা ছিল, আর অনলাইনে গাছ বিক্রি শুরু করে বাবার ব্যবসাকে আধুনিক চেহারা দেয়।
নার্সারির প্রসঙ্গ থেকেই রতনের কথা ওঠে — গাছ তো সেও চিনত, শুধু অন্যভাবে।
রতনের বাবা রোজ ভোরে মাঠের আল ধরে হাঁটতেন, চোখ রাখতেন ঝোপঝাড়ে — কোন পাতা কেটে গেলে রক্ত বন্ধ করে, কোন শিকড় বেটে দিলে জ্বর নামে, কোনটা ছোঁয়াও উচিত না। ছোট্ট রতন বাবার পিছু পিছু হাঁটত, একটা থলেতে পাতা কুড়াত। স্কুলের বন্ধুরা মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে ডাকত "বনৌষধিওয়ালা", রতন লজ্জা পেয়ে থলেটা লুকিয়ে ফেলত।
"এসব পুরোনো দিনের কথা," বলে রতন দূরে সরে গিয়েছিল। পড়াশোনায় মন দিল, চাকরির পরীক্ষা দিতে লাগল বছরের পর বছর। শেষে একটা কীটনাশক কোম্পানিতে সেলসম্যানের কাজ জুটল — গ্রামে গ্রামে ঘুরে যে রাসায়নিক বিক্রি করত, তা ছিল বাবার শেখানো গাছপালার ঠিক উল্টো জগৎ।
বাবার মৃত্যুর কয়েক বছর পর এক বৃদ্ধ একদিন রতনের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার বাবা যে গাছটার পাতা দিতেন, সেটা এখন কোথায় পাব?" রতন থমকে গেল — গাছটার নামই সে জানে না। বৃদ্ধ বললেন, "তোমার বাবা তো বলতেন, তোমাকে একদিন সব শেখাবেন।"
"বাবার সঙ্গে থাকা এই জ্ঞানটা কি বাবার সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল?"
রতন বোঝে, এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তার একার নয় — হারিয়ে যাওয়া এই জ্ঞান শুধু বাবার ছিল না, আরও অনেক মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। সেদিন থেকেই সে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কাছে গিয়ে গাছের নাম, স্থানীয় ব্যবহার লিখে রাখা শুরু করে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক ডাক্তারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে কোনগুলো সত্যিই কাজ করে, কোনগুলো নিছক বিশ্বাস। চাকরি ছাড়েনি রতন, কিন্তু ছুটির দিনে গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বসে, ধীরে ধীরে জড়ো-করা জ্ঞানটুকু নতুন করে শেখায়।
রতনের সংরক্ষণের গল্পটি সঞ্জয়কে চুপ করিয়ে রাখলো — তার লড়াইটা সংরক্ষণের নয়, ফিরে পাওয়ার।
সঞ্জয়ের বাবার একটা ছোট মুদির দোকান ছিল গ্রামের মোড়ে — চাল, ডাল, সাবান, বিস্কুট, আর পাড়ার সবার নাম-ঠিকানা মুখস্থ থাকা এক পুরোনো খাতা, যাতে কে কত ধারে জিনিস নিয়েছে তার হিসেব। বাবা কখনো ক্যালকুলেটর ছোঁননি, মুখে মুখেই যোগ-বিয়োগ করতেন। সঞ্জয় ছোটবেলায় বিকেলে দোকানে বসত, কিন্তু স্কুলের বন্ধুরা সাইকেলে করে যাওয়ার সময় দেখে ফেললে চাল মাপা থামিয়ে খাতার আড়ালে মুখ লুকাত।
"আমি দোকান চালাব না, চাকরি করব," বলেছিল সঞ্জয় বহুবার। পড়াশোনা শেষ করে শহরে গিয়ে চাকরির পরীক্ষা দিতে থাকে বছরের পর বছর। এদিকে বাবার বয়স বাড়ে, চোখে কম দেখেন, খদ্দেররাও আস্তে আস্তে বড় দোকানে চলে যায় যেখানে দরদাম হয় না, সব দামেই বাঁধা লেখা থাকে।
চাকরি হয়নি। দোকানও আগের মতো নেই। এখন সঞ্জয় দোকানটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে—কিন্তু সে জানে না শেষ পর্যন্ত পারবে কি না। দোকানে বসে দেখে, খাতার হিসেব সে কিছুই বোঝে না, কে বিশ্বস্ত খদ্দের কে নয় তাও জানে না, বাবার মতো মুখে মুখে যোগ করতেও পারে না। "বাবা, এই নামটা কার?" জিজ্ঞেস করলে বাবা হেসে বলেন, "ওটা তো সেই বৌদি, বিয়াল্লিশ টাকা ধার আছে পাঁচ বছর ধরে। কোনোদিন চাইনি, চাইবও না।"
"দোকানটা শুধু জিনিস বেচাকেনার জায়গা না বাবা, মানুষ চেনারও জায়গা, তাই না?" সঞ্জয় বলে, প্রথমবার বুঝতে পেরে।
দুটো জগতের মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে, কোনোটাতেই পুরোপুরি নেই — কিন্তু এখন অন্তত খাতাটা হাতে তুলে নিয়েছে, ধীরে ধীরে শিখছে বাবার পাশে বসে, যদিও জানে না শেষ পর্যন্ত দোকানটা বাঁচবে কিনা।
সঞ্জয়ের দ্বিধার কথা শুনে দেবাশিস মাথা নাড়ে — তার নিজের ফেরাটাও অতটা সহজ ছিল না।
দেবাশিসের বাবা বহু বছর ওকালতি করেছেন মহকুমা কোর্টে। ছোটবেলায় দেবাশিস বাবার চেম্বারে বসে দেখত মক্কেলরা কীভাবে আসতেন উদ্বিগ্ন মুখে, আর ফিরে যেতেন একটু হালকা হয়ে। একবার এক বৃদ্ধ কৃষক জমির মামলা নিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন, বাবা তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন, "চিন্তা করবেন না, দেখছি।" দৃশ্যটা দেবাশিসের মনে গেঁথে গিয়েছিল।
কিন্তু বাবা নিজেই বলতেন, "তুই আমার মতো উকিল হবি না। এই পেশায় বছরের পর বছর টাকা আসে না, সম্মান আসে দেরিতে। তুই অন্য কিছু কর, নিরাপদ কিছু।" ছেলেও বাবার কথা মেনে অন্য পথ বেছে নিল — ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ল, চাকরির চেষ্টা করল বছরের পর বছর।
চাকরি হলো না। শেষ পর্যন্ত দেবাশিস বাবার চেম্বারে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু ফিরে গিয়ে সে বুঝল, শুধু বাবার চেম্বারে বসে থাকলেই হবে না—নিজেকেও নতুন করে তৈরি করতে হবে। সে প্রয়োজনীয় আইন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শুরু করল এবং ধীরে ধীরে পেশায় ঢোকার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
একদিন বাবার চেম্বারে গিয়ে দেখল, বাবা অবসর নিয়েছেন। দরজার তালায় মরচে ধরেছে। অথচ পুরোনো মক্কেলদের কেউ কেউ এখনও খোঁজ করেন। একদিন সেই কৃষকের ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল, “উকিলবাবু কোথায়? আমার একটা মামলা আছে।”
“পেশা শুধু জ্ঞান নয়, এটা বিশ্বাসেরও উত্তরাধিকার,” দেবাশিস বুঝল সেদিন।
তারপর সে বাবার পুরোনো বইগুলোর ধুলো ঝেড়ে নতুন করে পড়তে শুরু করল। বাবা মাঝে মাঝে চেম্বারে এসে বসেন। কিছু বলেন না, শুধু দেখেন ছেলে কোন ধারাটা বইয়ে মার্ক করছে।
দেবাশিসের বাবার চেম্বারের গল্প শুনতে শুনতে তন্ময় চুপ করে বসেছিল—তার এমন কোনো চেম্বার, কোনো ফিরে যাওয়ার জায়গা ছিল না।
তন্ময়ের বাবা রিকশা চালাতেন, সংসার চলত দিন আনি দিন খাই করে। ছোটবেলায় ক্লাসের বন্ধুরা যখন বলত "আমার বাবা এটা শেখাবে, ওটা শেখাবে", তন্ময় চুপ করে থাকত। তার বাড়িতে হাতে তুলে দেওয়ার মতো কোনো দক্ষতা ছিল না, কোনো ওয়ার্কশপ, কোনো দোকান, কোনো জমি। শুধু ছিল বাবার একটা কথা — "পড়াশোনাটাই তোর একমাত্র রাস্তা। আমি যা পারিনি, তুই সেটা কর।"
তন্ময়ের পরিবারে কোনো পারিবারিক দক্ষতা বা ব্যবসা কিছুই ছিল না। তার একমাত্র পথ ছিল পড়াশোনা আর চাকরি খোঁজা। বহু বছর ধরে সে চেষ্টা করে চলেছে, এখনও বেকার। পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে মাঝে মাঝে বাবার রিকশাই চালিয়েছে কয়েক ঘণ্টা, লজ্জা লুকিয়ে।
তন্ময়ের গল্প বন্ধুদের মনে করিয়ে দেয় — সবার হাতে পারিবারিক উত্তরাধিকার থাকে না। যাদের আছে, তারাই কেবল সেই সুযোগটা হারিয়েছে; তন্ময়ের সংগ্রাম সম্পূর্ণ আলাদা, এবং সমান গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের ভিড়ে হাসতে হাসতে সে একবার বলেও ফেলে, "তোদের সবার বাবার কাছ থেকে কিছু না কিছু শেখার সুযোগ ছিল। আমার ছিল না। তাই আমি শুধু চাকরির পরীক্ষার পিছনেই ছুটেছিলাম।"
"কিন্তু জানিস কী শিখেছি? হাল না ছাড়া। এটাও তো একটা দক্ষতা, তাই না?" তন্ময় হাসে, আর কেউ হাসে না তার কথায় — সবাই চুপ করে যায়, কারণ কথাটা সত্যি।
তন্ময়ের কথায় সবাই একটু চুপ হয়ে যায়, তারপর মামনি আস্তে করে গুনগুন শুরু করে, পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টায়।
মামনির মা রবীন্দ্রসংগীত, লোকগান, ভাটিয়ালি — সবই জানতেন, নিজের গলায়। সন্ধেবেলা রেওয়াজে বসতেন, আর মেয়েকে ডাকতেন, "তুই আমার সঙ্গে একটু বসে শিখে নে।"
"গান শিখে কী হবে মা? আগে পড়াশোনা করি," মামনি বলত।
পরে সে চাকরির পরীক্ষার পিছনে ছুটল, বছরের পর বছর। চাকরি হলো না। একদিন পাড়ার এক অনুষ্ঠানে এক বৃদ্ধা পুরোনো একটা লোকগান গাইতে শুরু করলেন। মামনি হঠাৎ থমকে গেল — গানের দ্বিতীয় লাইনটা সে ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছিল, কিন্তু তৃতীয় লাইনটা কিছুতেই মনে পড়ল না। বাড়ি ফিরে মাকে ফোন করতে গিয়ে মনে পড়ল, মা আর নেই।
"যে গান মুখে মুখে শেখানো হয়, তা লিখে না রাখলে একদিন হারিয়ে যায়," মায়ের সেই পুরোনো কথাটা সেদিন প্রথম সত্যি মনে হলো।
পরদিন থেকে মামনি পাড়ার বৃদ্ধাদের কাছে গিয়ে গানটার বাকি অংশ খুঁজতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহ পরে বোঝে, গানটা শুধু তার মায়ের স্মৃতি নয় — গ্রামের আরও অনেক মায়ের কণ্ঠে বেঁচে ছিল। সেদিন থেকেই সে পাড়ার বাচ্চাদের গান শেখানো শুরু করে — পেশা হিসেবে নয়, ফিরে পাওয়া সুরটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
মামনির গানের কথায় রূপা হেসে বলে, তার হাতেও এমনই একটা ফিরে পাওয়া সুতো আছে।
রূপার মা সন্ধেবেলা জানালার আলোয় বসে সূচ চালাতেন — নকশিকাঁথায় ফুল, পাখি, লতাপাতা ফুটিয়ে তুলতেন সুতোয়। রূপা পাশে বসে দেখত, মাঝে মাঝে মা তার হাতে সুচ-সুতো ধরিয়ে দিতেন, "এই ফোঁড়টা দে দেখি।" রূপার ফোঁড় বাঁকা হতো, মা হেসে ঠিক করে দিতেন। "এসব শিখে রাখ, কখন কোন কাজে লাগে বলা যায় না," মা বলতেন। রূপা তখন ভাবত, এসব তো মা-ঠাকুমাদের কাজ, সে অন্য কিছু করবে — আর্ট কলেজে পড়বে, বড় শহরে চাকরি করবে।
পড়াশোনা করল, আর্ট কলেজেও ভর্তি হলো, আর্ট কলেজে সে ছবি আঁকা শিখেছিল, কিন্তু মায়ের সূচের কাজকে তখনও আলাদা কোনো শিল্প হিসেবে ভাবেনি। পরে নিজের ডিজাইনের সঙ্গে মায়ের কাজ মিলিয়ে দেখতেই তার ভাবনাটা বদলে যায়। কিন্তু চাকরির বাজারে ডিজাইনের কদর কম দেখে হতাশ হলো। বছরের পর বছর ছোট ছোট ফ্রিল্যান্স কাজ করে সংসার চালাতে হলো, নিজের আঁকা ছবি বিক্রি হতো না বললেই চলে।
একদিন মায়ের একটা পুরোনো শাড়ি পরে বেরোতে যাচ্ছিল রূপা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আঁচলের নকশাটা চোখে পড়ল — প্রতিটা ফুলের রেখা আলাদা, কোনোটাই অন্যটার হুবহু নকল নয়। পাশের বাড়ির পুরোনো দর্জিকে জিজ্ঞেস করল, "এই নকশাটা কে করেছিল?" দর্জি অবাক হয়ে বললেন, "তোর মা। নিজের হাতে।"
"মা, তুমি তো আসলে যা করতে, আমিও তাই করার চেষ্টা করছিলাম, শুধু অন্য ভাষায়," রূপা বোঝে সেদিন।
শাড়িটা বিছিয়ে প্রথমবার সে মায়ের কাজকে শুধু সেলাই হিসেবে দেখল না — বুঝল, এটা ছিল ডিজাইন। সেই দক্ষতাকে হুবহু ফিরিয়ে না এনে, নিজের আঁকা আর আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে মিলিয়ে সে ছোট্ট একটা হাতের-কাজের ব্র্যান্ড দাঁড় করাতে শুরু করে — মায়ের নকশাকে নতুন কাপড়ে, নতুন রঙে বাঁচিয়ে রাখে।
রূপার বুটিকের গল্পের পর অনির্বাণ বাঁশিটা আরেকবার হাতে তুলে নেয়, ভাবে তার সুরটাও কি কোনোদিন এভাবে ফিরবে।
অনির্বাণের দাদু বাঁশি বাজাতেন। গ্রামের পুজো, বিয়ে, এমনকি শ্মশানযাত্রাতেও ডাক পড়ত তাঁর। সন্ধ্যা নামলেই দাদু উঠোনের কোণে বসতেন, ছোট্ট অনির্বাণ কোলের কাছে বসে শুনত। "শ্বাসটা ধরে রাখতে হয়, তবেই সুর বাঁচে," দাদু বলতেন, অনির্বাণের হাতে বাঁশিটা ধরিয়ে দিয়ে। ফুঁ দিলে শুধু বাতাসের শব্দ বেরোত, সুর আসত না। দাদু হাসতেন, "সময় লাগবে।"
একদিন স্কুলের এক শিক্ষক রসিকতা করে বলেছিলেন, "বাঁশি বাজিয়ে তো আর চাকরি হবে না।" কথাটা কানে বিঁধে রয়ে গেল। "এসব করে সংসার চলে?" — এই একটা প্রশ্নই অনির্বাণকে যন্ত্রটার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিল। পড়াশোনায় ডুবে গেল সে।
পুনর্মিলনীর আগের রাতে এক বন্ধুর বাড়িতে অনির্বাণ হঠাৎ বাঁশির সুর শুনল — কেউ একজন উঠোনে বসে বাজাচ্ছিল। বহু বছর পর সেই সুর কানে আসতেই তার মনে হলো, সে বাঁশি বাজানো ভুলে যায়নি, শুধু বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল।
"যন্ত্রটা হারাইনি। শুধু বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিলাম," অনির্বাণ বোঝে সেদিন।
পরদিন সে নিজের পুরোনো বাঁশিটা তাকের কোণ থেকে বের করে ঠোঁটে তোলে। কোনো সুর বেরোয় না প্রথমে — শুধু বাতাসের শব্দ, ঠিক ছোটবেলার মতো। যন্ত্রটা মেরামত করা যায়, কিন্তু দাদু যে তাল, যে সুর জানতেন, তার কোনো লিখিত রূপ নেই — সেটা ফিরে পাওয়া অত সহজ নয়।
অনির্বাণের গল্প বাকিদের থেকে একটু আলাদা: এখানে বস্তুটা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু ভেতরের অভিজ্ঞতাটা আর পুরোপুরি ফেরে না। তবু সে ছাড়ে না — প্রতি সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ বসে ফুঁ দেয়, যদি কোনোদিন শ্বাসটা আবার সুর হয়ে ফেরে।
অনির্বাণের অসমাপ্ত সুর শুনে বিকাশ মৃদু হাসে — তার মাটির কাজটাও তো পুরোপুরি ফেরেনি, তবু হাতটা থামেনি।
বিকাশের বাবা মাটির পুতুল বানাতেন — মাটি সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে প্রস্তুত করা, আকার দেওয়া, শুকানো, পোড়ানো, রং করা, তারপর বাজারে বিক্রি। ছোট্ট বিকাশ একদিন নিজের হাতে একটা ছোট্ট হাতি বানিয়ে বাবাকে দেখিয়েছিল। শুঁড়টা বেঁকে গিয়েছিল। বাবা হেসে বলেছিলেন, “বেঁকা শুঁড়েরও একটা গল্প থাকে। রেখে দে, নষ্ট করিস না।”
কিন্তু বড় হয়ে বিকাশ ভাবল, “এসব করে ভবিষ্যৎ কী?” প্লাস্টিকের পুতুল বাজার ছেয়ে ফেলছিল, বাবার হাতে তৈরি মূর্তির খদ্দেরও কমছিল। কাজটা শেখা শেষ করল না সে, পড়াশোনায় মন দিল। শেষ পর্যন্ত সে স্কুলশিক্ষক হলো। মাটির কাজ তার জীবনে আর পেশা হয়ে উঠল না।
বহু বছর পর একদিন তার নিজের ছেলে মাটি হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, এটা কীভাবে বানাব?”
বিকাশ মাটিটা হাতে নিল। আঙুলগুলো যেন নিজের অজান্তেই পুরোনো ভঙ্গিতে নড়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে ছেলেকে দেখিয়ে দিতে লাগল কীভাবে মাটিকে চেপে, ঘুরিয়ে, একটু একটু করে একটা আকার দিতে হয়।
সম্প্রতি শহরের একটা দোকানে সে দেখে, হাজার টাকায় "হ্যান্ডমেড" পুতুল বিক্রি হচ্ছে — ঠিক যেমনটা তার বাবা নিজের হাতে বানাতেন, দামের কয়েকগুণ কম নিয়ে। বিকাশ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
এক রবিবার বিকাশের ছেলে মাটি নিয়ে বসে বলল, "বাবা, এটা কীভাবে বানাব?" বিকাশ মাটি হাতে নিল, আঙুল নিজে থেকেই পুরোনো ভঙ্গিতে নড়তে শুরু করল। একটা ছোট্ট হাতি বানিয়ে দিল সে, ঠিক নিজের ছোটবেলার মতো একটু বাঁকা শুঁড় নিয়েই।
"তুমি এসব পারো?" ছেলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে। বিকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, "একসময় আমার বাবা শিখিয়েছিলেন। পুরোটা শিখিনি।" ছেলে বলে, "তাহলে আমাকে শেখাও।"
বিকাশ শিল্পী হয়নি, স্কুলে ছবি আঁকা শেখায়। কিন্তু সেদিন থেকে ছেলেকে নিয়ে সপ্তাহান্তে মাটি নিয়ে বসে — বুঝেছে, কিছু উত্তরাধিকার জিনিসের মধ্যে থাকে না, হাতের স্মৃতির মধ্যে থাকে।
বিকাশের ছেলের কথা শুনে ঝুমাও নিজের মেয়ের কথা বলে ওঠে — তার মেয়ের স্কুলেও তো একইভাবে ফিরে এসেছিল পুরোনো একটা নাচ।
ঝুমার ঠাকুমা লোকনৃত্যের দলে নাচতেন, পালা-পার্বণে গ্রামের মণ্ডপে ডাক পড়ত তাঁর। সন্ধেবেলা উঠোনে ঠাকুমা কোমরে আঁচল জড়িয়ে মুদ্রা দেখাতেন, ছোট্ট ঝুমা পায়ে পায়ে নকল করত। "পা মাটিতে জোরে ফেলবি না, মাটিকে সম্মান করে ফেলবি," ঠাকুমা বলতেন।
স্কুলের এক অনুষ্ঠানে ঝুমা লোকনৃত্য পরিবেশন করলে ক্লাসের কয়েকজন হেসে বলেছিল, "এটা তো ঠাকুমাদের নাচ, নতুন গান কর না কেন?" লজ্জা পেয়ে ঝুমা আর কখনও সেই নাচ কারও সামনে করেনি। স্কুল-কলেজের চাপে ধীরে ধীরে সেসব থেমেও যায়। "এখন আর এসব শিখে কী হবে," ভেবেছিল সে। ঠাকুমা একদিন চলে গেলেন, মুদ্রাগুলোও যেন সঙ্গে নিয়ে গেলেন, মনে হয়েছিল ঝুমার।
একদিন মেয়ের স্কুলের অনুষ্ঠানে যখন একজন শিক্ষিকা লোকনৃত্য শেখাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন, ঝুমা নিজের অজান্তেই মুদ্রাগুলো দেখিয়ে দেয় — শরীর ভোলেনি, শুধু মন ভুলে গিয়েছিল। মেয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "মা, তুমি এসব জানো?"
"তোর ঠাকুমার কাছে শিখেছিলাম। ভেবেছিলাম ভুলে গেছি," ঝুমা মেয়ের হাত ধরে বলে।
সেদিন থেকে সে আবার শিখতে শুরু করে, দেরিতে হলেও — এখন সপ্তাহে একদিন স্কুলে গিয়ে মেয়েদের শেখায়, ঠাকুমার শেখানো মুদ্রাগুলো একটা একটা করে ফিরিয়ে আনে।
ঝুমার নাচের গল্পের রেশ কাটতে না কাটতেই কার্তিক বলে ওঠে, তার তাঁতের গল্পটাও অনেকটা এমনই দেরিতে ফেরার গল্প।
কার্তিকের পরিবারে তাঁতে কাপড় বোনার কাজ ছিল বহু পুরুষ ধরে। ভোর হলেই তাঁতের কাঠের শব্দ উঠত — ঠক... ঠক... ঠক... — কার্তিকের কাছে সেই শব্দ ছিল বাড়িরই একটা অংশ, ঘুম ভাঙানোর ঘণ্টার মতো। ছোটবেলায় বাবা তাকে মাকু ধরতে শিখিয়েছিলেন, "সুতোটা টানটান রাখবি, ঢিলে হলে নকশা এলোমেলো হয়ে যাবে।" কার্তিকের প্রথম বোনা কাপড়ের টুকরোয় নকশা বেঁকে গিয়েছিল, বাবা সেটা ফেলে দেননি, আলমারিতে তুলে রেখেছিলেন।
কিন্তু বাজারে হাতে-বোনা কাপড়ের দাম কমছিল, মেশিনে বোনা কাপড় সস্তায় বাজার ভরিয়ে দিচ্ছিল। কার্তিক ভাবত, তাঁতের কাপড়ের বাজার তো কমে যাচ্ছে, তাতে কী লাভ। সে শহরে চাকরি খুঁজতে যায়, পেয়েও যায়।
চাকরি হয়, কিন্তু কয়েক বছর পর কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়। ফিরে এসে কার্তিক দেখে, তাঁতঘর তালাবন্ধ অনেকদিন, মাকুতে ধুলো জমেছে। বাবা এখনও বেঁচে, হাত এখনও চলে, কিন্তু চোখে আগের মতো জোর নেই। কার্তিক একদিন চুপ করে তাঁতের সামনে বসে বলে, "বাবা, আবার শেখাবে?"
"শুরু থেকে নয়। যেখানে ছেড়ে গিয়েছিলি, সেখান থেকেই শুরু কর," বাবা বলেন, ছেলের হাতে মাকুটা তুলে দিয়ে।
কার্তিক ধীরে ধীরে বসতে শুরু করে তাঁতের সামনে — দেরিতে হলেও, শূন্য থেকে নয়, বাবার তত্ত্বাবধানে। পুরোনো নকশা হুবহু ফিরিয়ে আনতে চায় না সে, নতুন রং আর নতুন নকশা মিলিয়ে বাজার খোঁজার চেষ্টা করছে — পথটা এখনও তৈরি হচ্ছে, শেষ হয়নি।
বিকেল গড়িয়ে আসে। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ একজন চেনা মুখ — তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই পুরোনো শিক্ষক, এখনও উৎসবে এসেছেন। তিনি একে একে সবাইকে দেখেন, তারপর বলেন, "তোমাদের তখন বলেছিলাম — নিজেদের শক্তিটা চিনতে শেখো। মনে আছে?" সবাই চুপ করে থাকে; কেউ মনে রেখেছে, কেউ রাখেনি। শিক্ষক হাসেন, "তোমাদের জীবন দেখে আজ বুঝলাম, কথাটা তোমরা প্রত্যেকে নিজের মতো করে বুঝেছ।" কোনো রায় দেন না তিনি, শুধু বোঝেন।
স্কুলের মাঠে তখন কথা ঘুরে যায় নিজেদের সন্তানদের দিকে। "আমার ছেলে ডাক্তার হতে চায়," একজন বলে। "আমার মেয়ে গান শিখছে," মামনি বলে। "আমার ছেলে আমার সঙ্গে নার্সারিতে আসে," গৌতম যোগ করে। ঠিক তখন, মাঠের ধারে একজন বাবা তার বছর বারোর ছেলেকে নিয়ে হেঁটে যায় — ছেলেটা বাবার হাতে ধরা যন্ত্রপাতির বাক্সের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। অরুণ সেদিকে চেয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
"ও কী হবে, সেটা ও ঠিক করুক। আমরা শুধু ওকে যতগুলো সম্ভব চাবি দিতে পারি।"
পেশা উত্তরাধিকার হতে পারে, বাধ্যবাধকতা নয়। কিন্তু দক্ষতা — যদি শেখার সুযোগ থাকে — তাকে হারিয়ে ফেলাও এক ধরনের অপচয়। শেখা থাকলে চাকরি, ব্যবসা, শিল্প, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা প্রয়োজনে পেশা বদলে ফেলা — সব দরজাই কিছুটা খোলা থাকে।
জীবন কখন কোন দরজা বন্ধ করবে, কেউ জানে না। তাই দরজা বেছে নেওয়ার আগে অন্তত কয়েকটি চাবি নিজের কাছে রাখা ভালো।
উৎসব শেষ হয়। স্কুলের গেটে তালা পড়ে। একজন বন্ধু পিছন ফিরে তাকায় — দরজা বন্ধ হওয়া মানেই পথ শেষ নয়। চাবি থাকলে আবার খোলা যায়।