তনয়ের বাড়িতে সেদিন রাতটা আর স্বাভাবিক রইল না।
মিঠি যতবার তনয়ের দিকে তাকাচ্ছিল, ততবারই তার মুখে একই কথা—
— "বাবা, আমাকে কোলে নেবে?"
তনয় কী বলবে বুঝতে পারছিল না। সে বারবার বলছিল,
— "আমি তোমার বাবা নই।"
কিন্তু পাঁচ বছরের মিঠি কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করছিল না।
— "মা বলেছে তুমি আমার বাবা।"
তনয় স্তব্ধ হয়ে গেল। সে নিজের জীবনের সমস্ত হিসাব মনে করার চেষ্টা করল। তন্দ্রার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল—এটা সত্যি। কিন্তু তাদের কখনো বিয়ে হয়নি। তাহলে এই শিশুটি কোথা থেকে এল?
তনয়ের মা এতক্ষণ চুপ করে সবকিছু শুনছিলেন। তিনি মিঠির কাছে গিয়ে স্নেহভরে জিজ্ঞেস করলেন,
— "আচ্ছা মা, তোমার মায়ের নাম কী?"
মিঠি একটুও না ভেবে উত্তর দিল,
— "তন্দ্রা মুখার্জি।"
কথাটা শুনে তনয়ের মা কিছুটা স্বস্তি পেলেন। কারণ তন্দ্রা যখন মিঠিকে এখানে রেখে গিয়েছিল, তখন সে বলেছিল মেয়েটি তার বোনের মেয়ে।
তনয়ের মা বললেন,
— "হ্যাঁ, আমরা তো জানি ও তন্দ্রার বোনের মেয়ে।"
কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
তিনি মিঠির দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন,
— "তাহলে তুমি তোমার বাবার নাম তনয় মুখার্জি বলছ কেন?"
মিঠি সরলভাবে বলল,
— "মা আমাকে বলেছে।"
তনয় এবার আর কিছুতেই বুঝতে পারল না কী হচ্ছে।
— "তন্দ্রা তো মৌকে বলেছিল, মেয়েটা ওর বোনের মেয়ে। তাহলে ও আমাকে বাবা বলছে কেন?"
তনয়ের বাবা রাগে বললেন,
— "তন্দ্রাকে এখনই ডাক। এই ব্যাপারের উত্তর একমাত্র তন্দ্রাই দিতে পারবে।"
তনয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মিঠির দিকে তাকাল। ছোট্ট মেয়েটি তখনও নির্বিকার। তার কাছে কোনো রহস্য নেই—মা তাকে যা শিখিয়েছে, সে শুধু সেটাই বিশ্বাস করে বলছে।
কিন্তু তনয়ের পরিবারের কাছে এই একটি কথাই যেন এক বিশাল ঝড়ের সূচনা করে দিল।
তনয় তার বোন মৌকে বলল,
— "তুই তন্দ্রাকে ফোন কর। ওকে বল, এখনই এখানে আসতে।"
মৌ ফোন করল। কিছুক্ষণ পর তন্দ্রা ফোন ধরল।
— "হ্যালো?"
মৌ বলল,
— "তুই এখনই আমাদের বাড়িতে আয়। এখানে বিরাট সমস্যা হয়েছে।"
তন্দ্রা চুপ।
— "মিঠি বলছে বাবার নাম তনয় মুখার্জি। বাবা-মা সব জানতে চাইছে।"
তন্দ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "আমি এখন আসতে পারব না।"
— "কেন?"
— "ফোনটা তনয়কে দাও।"
তনয় ফোন হাতে নিল।
— "তন্দ্রা, এটা কী?"
ওপাশ থেকে তন্দ্রার কণ্ঠ শোনা গেল,
— "আমি সব বলছি। কিন্তু আমাকে এখন ওখানে যেতে বলো না।"
— "মিঠি কে?"
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর তন্দ্রা ধীরে ধীরে সবকিছু জানাল। রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে ওর গাড়িতে ওঠা, মা বলে ডাকা, বান্ধবী উকিলের কাছে যাওয়া — সব।
তনয় নির্বাক হয়ে শুনছিল। শেষে সে বলল,
— "তুমি একটা শিশুর জন্য এতো বিপদে পড়েছিলে ?"
তন্দ্রা উত্তরে কিছু বলল না।
তনয় আবার বলল,
— "ওকে এখন কী করব?"
— "আমি জানি না।"
— "তাহলে এখানে পাঠালে কেন?"
তন্দ্রা ফোন কেটে দিল।
🚗
গভীর রাত
তনয়ের বাড়িতে অশান্তি বাড়তেই থাকল। মিঠি কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে শুধু মাঝে মাঝে বলছিল,
— "আমি কি খারাপ কিছু করেছি?"
মৌয়ের বুকটা কেঁপে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল, মেয়েটির কোনো দোষ নেই।
শেষ পর্যন্ত রাত অনেক গভীর হলে মৌ একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে কাউকে কিছু না জানিয়ে মিঠিকে গাড়িতে বসাল।
— "পিসি, আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
— "তোমার মায়ের কাছে।"
মিঠি খুশি হয়ে বলল,
— "মা আমাকে দেখে খুব খুশি হবে!"
মৌ কোনো উত্তর দিল না। রাতের প্রায় নিস্তব্ধ শহর পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল।
অনেকক্ষণ পর তারা তন্দ্রাদের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। বাড়ির প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
মৌ খুব সাবধানে চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, কেউ তাদের দেখতে পাচ্ছে না। তারপর মিঠিকে সঙ্গে নিয়ে নিঃশব্দে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল।
তন্দ্রার ঘরের কাছে এসে মৌ জানলার কাছে গিয়ে আস্তে করে ডাকল,
— "তন্দ্রা... তন্দ্রা..."
কিছুক্ষণ পর তন্দ্রা ঘুম জড়ানো চোখে উঠে জানলার কাছে এল। মৌকে দেখে সে অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "এত রাতে? মিঠিকে নিয়ে এসেছিস?"
মৌ মাথা নাড়ল।
তন্দ্রা দ্রুত দরজা খুলে দিল। মৌ চারদিকে তাকিয়ে মিঠিকে নিঃশব্দে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দিল।
তন্দ্রা নিচু গলায় বললো, যা কথা হবার পরে হবে, এখন
— মা-বাবা ঘুমাচ্ছে।
মৌ আস্তে করে বলল,
— "হ্যাঁ, জানি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন আমাকে যেতে হবে। বেশি রাত হয়ে গেছে।"
তন্দ্রা মাথা নাড়ল।
— "ঠিক আছে। তুই যা। আমি মিঠিকে সামলে নিচ্ছি।"
মৌ মিঠির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— "ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে, কেমন?"
মিঠি চুপচাপ মাথা নাড়ল।
মৌ আর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ করে তন্দ্রা মিঠির কাছে এসে বসে পড়ল।
মিঠি ক্লান্ত চোখে তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "মা, তুমি আমাকে আর কোথাও পাঠাবে না তো?"
তন্দ্রার বুকটা কেঁপে উঠল। সে মিঠিকে কাছে টেনে নিয়ে আস্তে করে বলল,
— "না মা। এখন তুমি আমার কাছেই থাকবে।"
তারপর তন্দ্রা মিঠিকে নিজের পাশে শুইয়ে দিল।
— "চুপচাপ আমার পাশে ঘুমিয়ে পড়ো। কাউকে যেন জাগিয়ে দিও না।"
মিঠি মায়ের গায়ে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।
তন্দ্রা ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
বাইরে তখন গভীর রাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। আর তন্দ্রার ঘরের ভিতরে, অজান্তেই এমন এক গোপন সত্য ঘুমিয়ে পড়ল—যে সত্য খুব শিগগিরই পুরো পরিবারকে নাড়িয়ে দেবে।
🛏️
তন্দ্রার ঘরে
তন্দ্রা ও মিঠি পাশাপাশি শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনেই ঘুমিয়ে গেল।
গভীর রাতে ঘুমের মধ্যেই তন্দ্রার মনে হলো, কেউ যেন তার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে।
চোখ না খুলেই সে হাতটা সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে মিঠির ছোট্ট হাতটাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল।
ঘুমের মধ্যেই তন্দ্রা অস্পষ্ট গলায় বলল,
— "সারাদিন খুব ক্লান্তি গেছে... এখন নিশ্চিন্ত।"
মিঠি মায়ের বুকের কাছে মাথা রেখে তন্দ্রার স্নেহের উষ্ণতা অনুভব করল। তার ছোট্ট মুখে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি।
তন্দ্রার নিজেরও যেন অজান্তেই মনে হচ্ছিল—মেয়েটা তার পাশে থাকায় আজ সে অদ্ভুত এক শান্তি পেয়েছে।
ক্লান্ত শরীর আর মনের সমস্ত দ্বিধা ভুলে তন্দ্রাও গভীর ঘুমে ডুবে গেল।
কিন্তু তন্দ্রা তখনও জানত না—একটি ছোট্ট ভুল সে করে ফেলেছে। ঘরের দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আর সেই সামান্য ফাঁকই ভোরের আগে এমন এক সত্যকে প্রকাশ করে দিতে চলেছে, যা সে এতক্ষণ সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।
🌅
ভোরের আগে
রাত পেরিয়ে ভোর হতে চলেছে। আগের রাতের মানসিক চাপ ও ক্লান্তির কারণে তন্দ্রা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
সাধারণত এই সময় তন্দ্রার মা ঘুম থেকে উঠে পড়েন। সেদিনও তিনি ঘুম থেকে উঠে দৈনন্দিন কাজের জন্য মেয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঘরের দরজা একটু খোলা দেখে তিনি মনে করলেন, তন্দ্রা হয়তো রাতে দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে।
তিনি নিঃশব্দে দরজাটা একটু ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন।
তারপরই হঠাৎ তাঁর চোখ থেমে গেল।
মেয়ের বিছানায় তন্দ্রার পাশে একটি ছোট্ট মেয়ে গভীর ঘুমে শুয়ে আছে!
তন্দ্রার মা কয়েক সেকেন্ড একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখ যেন বিশ্বাসই করতে চাইছিল না, তিনি যা দেখছেন তা সত্যি।
তারপর বিস্ময় ও আতঙ্ক মেশানো গলায় তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল,
— "তন্দ্রা!"
তন্দ্রার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকাল।
তারপর মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে পাশে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।
মিঠি তখনও তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে।
তন্দ্রার মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সে তাড়াতাড়ি উঠে বসে মায়ের দিকে তাকাল।
তন্দ্রার মা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— "এই মেয়েটা কে?"
তন্দ্রা মুখ খুলল, কিন্তু কোনো কথা বের হলো না।
তন্দ্রার মা আবার জিজ্ঞেস করলেন,
— "তন্দ্রা, আমি তোকে জিজ্ঞেস করছি—এই মেয়েটা কে? রাতে ওকে তোর ঘরে নিয়ে এলি কীভাবে?"
তন্দ্রা এবারও চুপ করে রইল।
ঠিক তখনই মিঠির ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে প্রথমেই তন্দ্রার দিকে তাকাল।
তারপর মিষ্টি করে হেসে বলল,
— "মা... আমি কোথায়?"
তন্দ্রার মা যেন বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তিনি অবিশ্বাসের চোখে তন্দ্রার দিকে তাকালেন।
— "মা? ও তোকে মা বলছে?"
তন্দ্রা এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।
সেই মুহূর্তে তন্দ্রা বুঝতে পারল—যে গোপন কথাটা সে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, তা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
🕊️
সত্যি সামনে আসে
তন্দ্রার মা বারবার প্রশ্ন করতে লাগলেন। শেষে আর লুকিয়ে রাখতে না পেরে তন্দ্রা কাঁদতে কাঁদতে সব বলল — মিঠিকে কীভাবে সে পেয়েছিল, আর ভয়ে-লজ্জায় তিন-তিনটে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে তাকে আড়াল করার চেষ্টার কথা।
খবর পেয়ে তন্দ্রার বাবা ছুটে এলেন। প্রথমে রেগে গেলেও মিঠির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর রাগ ধীরে ধীরে গলে গেল।
তিনি বললেন,
— "এভাবে লুকিয়ে রাখাটা ঠিক হয়নি, মা। একটা বাচ্চার জীবনের প্রশ্ন। আইন মেনে, ঠিকভাবে এর সমাধান করতে হবে।"
তন্দ্রা মাথা নিচু করে বলল,
— "আমি ওকে হারাতে ভয় পেয়েছিলাম, বাবা।"
তন্দ্রার বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— "সত্যি লুকিয়ে ভালোবাসা রক্ষা হয় না। সত্যি বলেই রক্ষা করতে হয়।"
পরদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন — বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে খবর দেওয়া হবে, মিঠি নামে একটি ছোটো মেয়ে পাওয়া গেছে, যার আসল বাবা-মায়ের খোঁজ চাই। ঘোষণায় বলা হলো, আগামী দশ দিনের মধ্যে কেউ দাবি নিয়ে এলে আইনি প্রক্রিয়ায় শিশুটিকে তার আসল পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
খবরটা কয়েকদিন ধরে খবরের কাগজে আর টিভির পর্দায় ঘুরল।
কিন্তু কেউ যোগাযোগ করল না।
কারণ যাঁরা মিঠিকে চিনতেন, তাঁদের কেউই আর বেঁচে নেই। সেই পাহাড়ি রাতেই অভীক আর মেঘা চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর আত্মীয়স্বজন ও পুলিশ ধরে নিয়েছিল, তাঁদের ছোট্ট মেয়েটিও আর বেঁচে নেই।
তাই মিঠি যে বেঁচে আছে, এত বছর ধরে কেউই তা জানতে পারেনি।
তন্দ্রার বাবা বিভিন্নভাবে খবর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, আগামী দশ দিনের মধ্যে যদি মিঠির প্রকৃত বাবা-মা বা তাদের কোনো আত্মীয় যোগাযোগ করেন, তাহলে শিশুটিকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
দশটা দিন একে একে কেটে গেল। প্রতিদিন তন্দ্রা আর তনয় উদ্বিগ্ন হয়ে খবরের কাগজ খুলতেন, কোনো নতুন খবর এসেছে কি না দেখতেন। ফোনের শব্দ হলেই দুজনের বুক ধড়ফড় করে উঠত।
কিন্তু কোনো ফোন এল না। কোনো অচেনা মানুষও দরজায় এসে মিঠির খোঁজ করল না।
এর মধ্যে মিঠি ধীরে ধীরে তন্দ্রা আর তনয়ের আরও কাছাকাছি চলে এসেছিল। তনয়ের বাবা-মা, মৌ—সবাই তাকে নিজের পরিবারের একজন করে নিয়েছিলেন।
মিঠির হাসি, কথা, ছোট্ট ছোট্ট আবদার—সবকিছুই যেন বাড়ির পরিবেশ বদলে দিয়েছিল।
দশ দিন শেষ হওয়ার সন্ধ্যায় তন্দ্রার বাবা মিঠিকে কাছে ডাকলেন। কিছুক্ষণ তার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— "দিদিভাই, তুমি কার কাছে থাকতে চাও?"
মিঠি এক মুহূর্তও ভাবল না। সে ছুটে গিয়ে তন্দ্রা আর তনয়কে দুহাতে জড়িয়ে ধরল।
— "আমি আমার মা আর বাবার কাছে থাকতে চাই।"
কথাটা শুনে ঘরের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল। কারও চোখে আর জল ধরে রাখা সম্ভব হলো না।
তন্দ্রা মিঠিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। তনয়ও মেয়েটির মাথায় হাত রাখল।
সেই মুহূর্তে তন্দ্রা বুঝতে পারল—মিঠিকে সে প্রথমে হয়তো পরিস্থিতির চাপে নিজের জীবনে এনেছিল, কিন্তু এতদিনে সেই সম্পর্ক আর মিথ্যে পরিচয়ের মধ্যে আটকে নেই। মেয়েটির প্রতি তার যে টান তৈরি হয়েছে, তা সত্যিকারের মায়ায় পরিণত হয়েছে। আর মিঠির ভালোবাসাও তাকে নিজের মা-বাবা হিসেবেই গ্রহণ করেছে।
💍
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর
মিঠিকে ঘিরেই তন্দ্রা আর তনয় আবার একে অপরের কাছাকাছি এলেন। বহু বছর আগে গোত্রের আপত্তিতে যে সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল, আজ সেই সম্পর্কের মাঝে সেতু হয়ে দাঁড়াল একটি ছোট্ট মেয়ের ভালোবাসা।
দুই পরিবারও ধীরে ধীরে সব ভুলে গিয়ে এই সম্পর্ক মেনে নিল। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে তন্দ্রা আর তনয়ের বিয়ে হলো।
বিয়ের আসরে সবার মুখে ছিল আনন্দের হাসি। কিন্তু সেদিন সবচেয়ে বেশি খুশি ছিল পাঁচ বছরের মিঠি। কারণ সে তার জীবনে প্রথমবারের মতো মা আর বাবাকে একসঙ্গে পেয়েছিল।
তন্দ্রা মিঠিকে কোলে তুলে নিল। তনয়ও পাশে এসে দাঁড়াল। মিঠি দুজনের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
— "এবার আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব তো?"
তন্দ্রা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— "হ্যাঁ মা, এবার থেকে আমরা সবাই একসঙ্গেই থাকব।"
তনয় মিঠির মাথায় হাত রেখে বলল,
— "কেউ আর তোমাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারবে না।"
পাহাড়ের সেই ভয়াবহ রাতে যে শিশুটিকে সবাই চিরতরে হারিয়ে গেছে বলে ধরে নিয়েছিল, সে আসলে কখনোই হারিয়ে যায়নি। ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় সে এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারের জীবনে এসে নতুন পরিচয় পেয়েছিল।
তিথি থেকে মিঠি, আর মিঠি থেকে মিঠি মুখার্জি—পরিচয় বদলেছে, নাম বদলেছে, জীবনও বদলে গেছে। কিন্তু একটি জিনিস কখনো বদলায়নি—ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই তাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি।
সে ছিল। সে আছে। আর সে কোনোদিন হারিয়ে যায়নি।