বাংলা ধারাবাহিক গল্প৬টি পর্ব

যে মেয়েটি হারিয়ে যায়নি

একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া, নতুন পরিচয় আর ভালোবাসার গল্প।

পর্ব ১-৬ সম্পূর্ণ বাংলা কণ্ঠস্বরে শুনুন

পর্ব ১ — পাহাড়ের পথে সেই রাত

পাহাড়ি রাস্তা।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে। চারদিকে ঘন অন্ধকার। আকাশে কালো মেঘ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি। পাহাড়ের গা বেয়ে বৃষ্টির জল নেমে এসে রাস্তা পিচ্ছিল করে তুলেছে।

একটি গাড়ি ধীরে ধীরে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে।

গাড়িতে ছিলেন অভীক, তাঁর স্ত্রী মেঘা এবং তাঁদের তিন বছরের ছোট্ট মেয়ে তিথি।

তিথি মায়ের পাশে বসে ছিল। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ খেয়ালই করেনি।

অভীক সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

— "আর কতদূর?" মেঘা জিজ্ঞেস করলেন।

অভীক হেসে বললেন,

— "আর বেশি নয়। এই রাস্তা পার হলেই হোটেল।"

কিন্তু তাঁরা জানতেন না, সেটিই হতে চলেছে তাঁদের জীবনের শেষ কয়েক মিনিট।

হঠাৎ সামনের বাঁকে একটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁদের গাড়ির দিকে ছুটে এল।

অভীক গাড়ি বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিলেন। কিন্তু ভেজা রাস্তায় গাড়ির নিয়ন্ত্রণ চলে গেল।

এক ঝটকায় গাড়িটি রাস্তার পাশের পাহাড়ি ঢালে ধাক্কা খেয়ে উল্টে গেল।

মেঘার চোখের সামনে সবকিছু ঘুরে গেল। তিথি মায়ের শরীরের ওপর পড়ে গেল।

— "তিথি!"

মেঘা কোনোমতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। গাড়িটি তখনও ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। একসময় একটি বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে গাড়িটি থেমে গেল।

চারদিকে নিস্তব্ধতা। তারপর — আগুন!

গাড়ির সামনের অংশ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

অভীক তখন গুরুতর আহত। তিনি আর ঠিকমতো নড়তে পারছিলেন না।

মেঘা বুঝতে পারলেন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটি আগুনে পুড়ে যাবে। খুব চেষ্টা করলো গাড়ি থেকে বেরোতে। তিনি বুঝতে পারলেন, তারা নিজেরা হয়তো আর বাঁচবে না। কিন্তু তাঁর মেয়েকে বাঁচাতেই হবে।

গাড়ির একটি জানলা দুর্ঘটনায় ভেঙে গিয়েছিল। মেঘা শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তিথিকে তুলে নিলেন। তিথি তখনও পুরোপুরি ঘুমিয়ে।

মেঘা মেয়ের কপালে শেষবারের মতো চুমু খেলেন। চোখের জল মুছে ফিসফিস করে বললেন,

— "মা... বেঁচে থাকিস।"

তারপর ভাঙা জানলা দিয়ে তিথিকে বাইরে ঠেলে দিলেন। তিথি গড়িয়ে পড়ল রাস্তার নিচের নরম ঝোপঝাড়ের মধ্যে।

মেঘা শেষবার মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর — গাড়িটি আগুনে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস হয়ে গেল। অভীক ও মেঘা আর বেরিয়ে আসতে পারলেন না।

🔥

"তিথিও মারা গেছে"

কিছুক্ষণ পর স্থানীয় মানুষ ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাল। আগুন তখন অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা গাড়ির ভিতর থেকে দুজনের দেহ উদ্ধার করলেন। কিন্তু তিথির কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না।

পাহাড়ের ঢাল, খাদ এবং আশপাশের জায়গায় খোঁজ শুরু হলো। কিন্তু রাতের অন্ধকার ও প্রবল বৃষ্টির কারণে তিথিকে খুঁজে পাওয়া গেল না।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা বললেন,

— "গাড়ির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে শিশুটিও হয়তো দুর্ঘটনার সময় বাইরে ছিটকে পড়ে খাদে বা নদীতে পড়েছে।"

পরদিন আত্মীয়স্বজন ঘটনাস্থলে এলেন। তাঁদের সামনে পড়ে ছিল পুড়ে যাওয়া গাড়ি এবং অভীক-মেঘার মৃত্যুর খবর।

তিথির কোনো সন্ধান না পাওয়ায় সবাই শেষ পর্যন্ত ধরে নিল — তিথিও আর বেঁচে নেই। শোকের ভারে পরিবারটি ভেঙে পড়ল।

কেউ জানত না — তিথি নদীতে পড়েনি। সে পড়েছিল রাস্তার অনেক নিচে ঘন ঝোপের মধ্যে। আর সেই কারণেই আগুন থেকে বেঁচে গিয়েছিল।

👴👵

অচেনা দুজন মানুষের আগমন

রাত তখন অনেক গভীর। বৃদ্ধ হরিপদ ও তাঁর স্ত্রী কমলা কাছের গ্রামের বাসিন্দা। তাঁদের নিজেদের কোনো সন্তান ছিল না।

বৃষ্টির মধ্যে হরিপদ পাহাড়ের নিচের পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ তাঁর কানে এল ক্ষীণ কান্নার শব্দ।

— "শুনলে? কোথা থেকে যেন বাচ্চার কান্না আসছে।"

কমলা ভয় পেলেও স্বামীর সঙ্গে এগিয়ে গেলেন। ঝোপের কাছে পৌঁছে তাঁরা দেখলেন — একটি ছোট্ট মেয়ে ভেজা কাপড়ে কাঁদছে।

কমলা দৌড়ে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলেন।

— "ও মা!"

মেয়েটির শরীরে সামান্য আঁচড় ছিল, কিন্তু সে বেঁচে আছে।

হরিপদ দূরে জ্বলতে থাকা গাড়ির আগুনের দিকে তাকালেন। সবকিছু বুঝতে তাঁর বেশি সময় লাগল না।

— "এটাই নিশ্চয় সেই হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা।"

কমলা শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে বললেন,

— "ওকে আমরা ছেড়ে যেতে পারি না।"

হরিপদ বললেন,

— "কিন্তু পুলিশ যদি জানতে পারে?"

দুজনেই চুপ হয়ে গেলেন। তাঁরা জানতেন, শিশুটির বাবা-মা মারা গেছেন। আর আত্মীয়স্বজন ও পুলিশ ইতিমধ্যেই ধরে নিয়েছে যে শিশুটিও মারা গেছে।

কমলা মেয়েটির মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন,

— "আমাদের তো কোনো সন্তান নেই। ঈশ্বর হয়তো ওকেই আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।"

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন — এই শিশুর পরিচয় প্রকাশ পেলে তাকে আবার তাঁদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তাই তাঁরা একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরদিনই তাঁরা পাহাড়ি গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাবেন। কেউ যেন জানতে না পারে, তিথি বেঁচে আছে। একটি নতুন জায়গায়, নতুন পরিচয়ে তারা শিশুটিকে মানুষ করবেন।

সেই রাতেই কমলা শিশুটিকে নিজের বুকের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন —

— "আজ থেকে তুই আমার মেয়ে।"

শিশুটি ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে উঠল। কমলার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

আর পাহাড়ের অন্য প্রান্তে তখনও আগুন জ্বলছিল। সেই আগুনের আলোয় শেষ হয়ে গিয়েছিল তিথির পুরোনো জীবন। কিন্তু শুরু হয়ে গিয়েছিল তার নতুন জীবনের প্রথম অধ্যায়।

পর্ব ২ — নতুন মায়ের কাছে

তিন বছর কেটে গেছে।

শহরের এক সাধারণ পাড়ার মানুষজন এখন ছোট্ট মেয়েটিকে চেনে মিঠি নামে।

বৃদ্ধ হরিপদ এবং তাঁর স্ত্রী কমলা-র সংসারেই বড় হয়ে উঠছিল সে। তাঁদের নিজেদের কোনো সন্তান ছিল না। তাই মিঠিই ধীরে ধীরে তাঁদের সমস্ত পৃথিবী হয়ে উঠেছিল।

মিঠি যখন প্রথম কথা বলতে শিখেছিল, কমলাকে সে বলেছিল—

— "মা!"

সেই একটি শব্দে কমলার চোখে জল এসে গিয়েছিল। হরিপদও মেয়েটিকে নিজের নাতনি নয়, নিজের মেয়ে হিসেবেই ভালোবাসতেন।

মিঠি খুব বুদ্ধিমান ছিল। পাঁচ বছর বয়সেই বই-খাতা নিয়ে বসে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের স্কুলের শিক্ষক একদিন হরিপদকে বলেছিলেন,

— "মেয়েটার পড়াশোনার খুব আগ্রহ। সুযোগ পেলে অনেক দূর যেতে পারবে।"

কথাটা শুনে হরিপদের বুকটা আনন্দে ভরে উঠেছিল। কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালেই ছিল একটা গভীর ভয়।

হরিপদ তখন প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। কমলারও শরীর ভেঙে পড়েছে। হাঁটতে গেলেই হাঁপিয়ে যান।

এক রাতে মিঠি ঘুমিয়ে পড়ার পর দুজন বারান্দায় বসেছিলেন।

কমলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— "ওকে আমরা কতদিন রাখতে পারব?"

হরিপদ চুপ করে রইলেন।

— "আজ আমরা আছি। কিন্তু কাল যদি আমরা না থাকি? তখন এই মেয়েটার কী হবে?"

কমলার চোখ ভিজে উঠল।

— "আমি ওকে ছেড়ে দিতে পারব না।"

— "আমিও পারি না," হরিপদ ধীরে বললেন, "কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে তো সবসময় জীবন চলে না। ওর ভবিষ্যৎও তো ভাবতে হবে।"

অনেক ভেবে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, মিঠিকে এমন একজন মানুষের কাছে তুলে দেবেন, যে তাকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারবে এবং তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে পারবে।

কিন্তু কে সেই মানুষ? কোথায় এমন একজনকে পাওয়া যাবে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তখনও তাঁদের জানা ছিল না।

হরিপদ শুধু বললেন,

— "আমাদের আগে শহরে যেতে হবে। তারপর খোঁজ নিয়ে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে, যে মিঠিকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসবে।"

কমলা মিঠির মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,

— "হ্যাঁ। মানুষটা কে হবে, সেটা এখনই আমরা জানি না। কিন্তু মেয়েটার ভবিষ্যৎ যেন নষ্ট না হয়, সেটাই আমাদের দেখতে হবে।"

কয়েকদিন পর তাঁরা মিঠিকে নিয়ে শহরে চলে এলেন। শহরে এসে তাঁরা পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে এমন একজন স্বচ্ছল ও শিক্ষিত মানুষের খোঁজ করতে লাগলেন, যিনি মিঠির দায়িত্ব নিতে পারবেন।

কিন্তু কারও কথাই তাঁদের মনঃপূত হলো না। কেউ শিশুটিকে দয়া করে নিতে চাইছিল, কেউ আবার নিজের স্বার্থের কথা ভাবছিল। হরিপদ ও কমলা বুঝতে পারলেন, শুধু অর্থবান হলেই হবে না—মিঠির দরকার এমন একজন মানুষ, যে সত্যিই তাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসবে।

একদিন শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তায় তাঁরা তন্দ্রাকে দেখতে পেলেন। নিজের গাড়ি চালিয়ে এসে সে একটি বড় রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামাল।

হরিপদ ও কমলা দূর থেকে তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তন্দ্রার আচরণ, আত্মবিশ্বাস এবং স্বচ্ছল জীবনযাপন তাঁদের নজর কেড়ে নিল। কিন্তু তাঁরা তখনও জানতেন না, এই মেয়েটিই একদিন মিঠির নতুন মা হয়ে উঠবে।

কমলা ধীরে বললেন,

— "মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে ভালো পরিবারের।"

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— "শুধু ভালো পরিবার হলেই হবে না। ওর মনটাও ভালো হতে হবে।"

তাঁরা তন্দ্রাকে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করতে থাকলেন। তারপর দুজনের মনে একই চিন্তা জন্ম নিল—

হয়তো এই মেয়েটিই মিঠির জন্য সেই মানুষ হতে পারে, যাকে তাঁরা এতদিন ধরে খুঁজছিলেন।

কিন্তু তাঁরা তখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

সিদ্ধান্তটা তাঁরা নেবেন খুব শিগগিরই—তন্দ্রাকে আরও কাছ থেকে দেখার পর।

সেদিন রাতে কমলা মিঠিকে কাছে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

— "মা, তুমি একটা নতুন বাড়িতে যাবে।"

মিঠি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "তুমি যাবে না?"

কমলা চোখের জল লুকিয়ে বললেন,

— "না মা... আমরা বুড়ো হয়ে গেছি। কিন্তু তোমার জন্য একটা খুব ভালো মানুষ খুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছি।"

মিঠি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "আমার আরেকটা মা হবে?"

কমলা মৃদু হেসে বললেন,

— "হয়তো হবে মা। আমরা এমন একজনকেই খুঁজছি, যে তোমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসবে।"

মিঠি সরল মনে জিজ্ঞেস করল,

— "সে কি আমাকে ভালোবাসবে?"

কমলা এবার আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না।

— "যে তোমাকে নেবে, সে যেন তোমাকে খুব ভালোবাসে—এই প্রার্থনাই করছি।"

হরিপদ পাশে বসে বললেন,

— "আর যখন তোমার নতুন মা হবে, তুমি তাঁকে সবসময় মা বলে ডাকবে। বুঝেছ?"

মিঠি মাথা নাড়ল।

— "হ্যাঁ।"

— "আর একটা কথা," হরিপদ বললেন, "তাঁকে কখনো ছেড়ে আমাদের কাছে ফিরে আসবে না। তুমি তাঁর কাছেই থাকবে, মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, বড় হবে।"

মিঠি সরল মনে জিজ্ঞেস করল,

— "কিন্তু তোমরা?"

হরিপদ মুখ ঘুরিয়ে চোখ মুছলেন।

— "আমরা তো তোমার ভালো থাকাটাই চাই মা..."

কথাটা বললেও দুজনেই জানতেন, মিঠিকে নতুন জীবনে পাঠানোর পর তাকে আর নিজের কাছে ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব হবে না।

পরদিন সকালে মিঠিকে নতুন দামী পোশাক পরিয়ে দেওয়া হলো। কমলা তার চুল আঁচড়ে দিলেন।

তার হাতে কমলার দেওয়া ছোট্ট একটি পুতুল দিলেন।

তারা যাত্রা শুরু করল, মিঠি হাত নাড়তে নাড়তে বলল—

— "মা... আমি আবার আসব!"

কমলা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি মাটিতে বসে পড়লেন।

দূরে চলে যেতে যেতে মিঠি শেষবারের মতো পিছনে তাকাল। তার ছোট্ট মনে তখনও একটাই বিশ্বাস — সে নতুন মায়ের কাছে যাচ্ছে।

কিন্তু সে জানত না... যে মানুষটিকে সে আজ থেকে "মা" বলে ডাকবে, তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরই শুরু হবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য। আর সেই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে — তার বাকি জীবন।

পর্ব ৩ — "মা আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে!"

হরিপদ ও মিঠি একটি বড় দামী রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল।

তাঁরা চারপাশে তাকিয়ে এমন কোনো মহিলাকে খুঁজতে লাগলেন, যিনি একা এসেছেন এবং মিঠিকে নিজের সন্তানের মতো করে মানুষ করতে পারবেন।

একজন-দুজন করে কয়েকজন মহিলাকে দেখা গেল। কিন্তু তাঁদের কাউকে দেখে হরিপদ বাবুর মনে ভরসা হলো না। কারও মুখে কঠোরতা, কারও আচরণে ব্যস্ততা—কাউকেই মিঠির জন্য উপযুক্ত বলে মনে হলো না।

হঠাৎ একটি সুন্দর ও দামী গাড়ি এসে রেস্টুরেন্টের সামনে থামল। গাড়ি থেকে এক তরুণী নামল। তার চলাফেরায় আত্মবিশ্বাস, পোশাকে আভিজাত্য, আর মুখে ছিল স্বাভাবিক কোমলতা।

মিঠি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হরিপদের হাত ধরে আস্তে করে বলল,

— "দাদু, ওই যে মেয়েটা... ওটাই কি আমার নতুন মা?"

হরিপদ অবাক হয়ে মিঠির মুখের দিকে তাকালেন।

— "তুমি চিনতে পেরেছো?"

মিঠি মাথা নাড়ল।

— "হ্যাঁ। আমার মনে হচ্ছে উনিই আমার মা।"

হরিপদ কিছুক্ষণ তরুণীটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

— "ঠিক আছে মা। আজ থেকে উনিই তোমার নতুন মা।"

তারপর হরিপদ মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন,

— "এক কাজ করি, তুমি এই বেঞ্চে বসে থাকো। আমি একটু দেখে আসছি।"

মিঠি বেঞ্চে বসে রইল। হরিপদ ধীরে ধীরে সেই তরুণীর দিকে এগিয়ে গেলেন।

তখন তরুণীটি তার গাড়ির পার্কিং ফি দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিল। পার্কিংয়ের কর্মী রসিদ তৈরি করতে করতে জিজ্ঞেস করল,

— "ম্যাডাম, আপনার নামটা বলবেন?"

তরুণীটি স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল,

— "তন্দ্রা মুখার্জী।"

হরিপদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথাটি শুনলেন।

পার্কিং ফি মিটিয়ে তন্দ্রা রেস্টুরেন্টের ভিতরে চলে গেল। তাড়াহুড়োর মধ্যে সে গাড়ির দরজা লক করতে ভুলে গেল।

হরিপদ দ্রুত মিঠির কাছে ফিরে এলেন। মিঠি তখনও বেঞ্চে বসে তন্দ্রার গাড়িটির দিকে তাকিয়ে ছিল।

হরিপদ তার পাশে বসে নিচু গলায় বললেন,

— "শোনো মা, এখন থেকে তোমাকে কয়েকটা কথা মনে রাখতে হবে।"

মিঠি মন দিয়ে শুনতে লাগল।

— "আজ থেকে তোমার নাম মিঠি মুখার্জী।"

মিঠি ধীরে ধীরে বলল,

— "মিঠি মুখার্জী।"

— "আর তোমার মায়ের নাম তন্দ্রা মুখার্জী।"

মিঠি আবার বলল,

— "তন্দ্রা মুখার্জী।"

হরিপদ বললেন,

— "কেউ তোমার নাম জিজ্ঞেস করলে বলবে মিঠি মুখার্জী। আর তোমার মায়ের নাম জিজ্ঞেস করলে বলবে তন্দ্রা মুখার্জী।"

মিঠি মাথা নাড়ল।

— "বুঝেছি।"

হরিপদ আরও বললেন,

— "আর মনে রাখবে, তন্দ্রাই তোমার মা। তুমি তাঁকে মা বলে ডাকবে। কোনো অবস্থাতেই তাঁকে ছেড়ে চলে আসবে না। তাঁর কাছেই থাকবে, মন দিয়ে পড়াশোনা করবে এবং ভালো মানুষ হবে।"

মিঠি সরল মনে জিজ্ঞেস করল,

— "তোমরা আর আমার সঙ্গে থাকবে না?"

হরিপদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন,

— "না মা। এবার তোমাকে নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করতে হবে।"

মিঠির চোখে জল এসে গেল।

— "তাহলে তুমি কোথায় যাবে?"

হরিপদ মুখ ঘুরিয়ে চোখের জল মুছে বললেন,

— "আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানেই থাকব। তুমি শুধু ভালো থেকো।"

কিন্তু হরিপদ জানতেন, এটা তাঁদের শেষ দেখা।

তিনি মিঠির হাত ধরে তন্দ্রার গাড়ির কাছে নিয়ে গেলেন। চারপাশে একবার ভালো করে তাকিয়ে গোপনে মিঠিকে গাড়ির পিছনের সিটে বসিয়ে দিলেন।

মিঠি জানলার পাশে বসে হরিপদের দিকে তাকিয়ে রইল।

— "তুমি যাবে না?"

হরিপদ আর কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু হাত তুলে মিঠিকে আশীর্বাদ করলেন।

তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে সরে গেলেন।

একবার পিছনে ফিরে তাকালেন। গাড়ির ভিতরে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটিকে শেষবারের মতো দেখলেন।

তারপর মুখ ফিরিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন।

হরিপদ জানতেন না, মিঠির ভাগ্যে কী লেখা আছে। তিনি শুধু বিশ্বাস করতে চাইলেন, যে মেয়েটিকে তিনি এতদিন নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন, তার জন্য তন্দ্রাই হয়তো ভালো ভবিষ্যৎ নিয়ে আসবে।

আর সেই বিশ্বাসের ওপর ভরসা করেই হরিপদ মিঠিকে তার ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে চিরদিনের মতো চলে গেলেন।

তন্দ্রা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়ির কাছে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।

গাড়ির ভেতরে একটি ছোট্ট মেয়ে বসে আছে!

তন্দ্রার চোখ বড় হয়ে গেল।

— "এই মেয়ে কে?"

তন্দ্রা দরজা খুলে মেয়েটিকে নামিয়ে দিল।

— "নামো! কে তোমাকে এখানে বসিয়েছে?"

মিঠি ভয়ে ভয়ে গাড়ি থেকে নামল।

— "আমি... আমি তোমার মেয়ে।"

তন্দ্রা অবাক হয়ে বলল,

— "কি?!"

— "তুমি আমার মা।"

— "আমি তোমার মা নই!"

তন্দ্রা বিরক্ত হয়ে মেয়েটিকে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে দিল।

— "আমি তোমাকে চিনি না। তুমি এখানে কীভাবে এলে?"

মিঠি কিছু বুঝতে পারল না। সে শুধু তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে রইল।

তন্দ্রা তখন পরিস্থিতি সামলানোর জন্য মেয়েটিকে বোঝাতে চেষ্টা করল।

— "শোনো, আমি তোমার মা। ঠিক আছে?"

মিঠির চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।

— "সত্যি?"

— "হ্যাঁ। তুমি যদি আমার সঙ্গে চুপচাপ থাকো, তোমাকে চকলেট কিনে দেব।"

মিঠি হাসল।

— "অনেক চকলেট?"

— "হ্যাঁ।"

— "নাগরদোলায় চড়াবে?"

তন্দ্রা একটু বিরক্ত হলেও বলল,

— "হ্যাঁ, নাগরদোলায়ও চড়াব।"

কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ কথাগুলো শুনে ফেলেছিল।

তন্দ্রা এবার মেয়েটিকে আবার নামিয়ে দিয়ে বলল,

— "এইবার তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি যাচ্ছি।"

সে গাড়ির দরজা বন্ধ করে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই মিঠি হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল—

— "মা! মা! আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে!"

চারপাশের লোকজন সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল।

একজন মহিলা মিঠির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

— "কী হয়েছে মা?"

মিঠি কান্নার মধ্যে বলল,

— "আমার মা আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে!"

— "তোমার নাম কী?"

— "মিঠি।"

— "পুরো নাম?"

মিঠি এক মুহূর্তও না ভেবে বলল,

— "মিঠি মুখার্জি।"

— "তোমার মায়ের নাম?"

— "তন্দ্রা মুখার্জি।"

সবাই তন্দ্রার দিকে তাকাল।

একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন,

— "আপনার মেয়ে?"

তন্দ্রা হতভম্ব হয়ে বলল,

— "না! আমি ওর মা নই।"

আরেকজন বললেন,

— "তাহলে মেয়েটা আপনার নাম জানল কীভাবে?"

তন্দ্রা বলল,

— "আমি... আমি বিয়েই করিনি।"

কথাটা শুনে কয়েকজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

একজন মহিলা মজা করে বললেন,

— "বিয়ে করেননি, অথচ মেয়ে হয়ে গেল?"

আরেকজন বললেন,

— "এ আবার কেমন কথা!"

পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

একজন মিঠিকে জিজ্ঞেস করলেন,

— "তোমার বাড়ি কোথায়?"

মিঠি কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— "আমার মা জানে।"

— "তুমি জানো না?"

মিঠি মাথা নাড়ল।

কেউ একজন বললেন,

— "ওই টুকু ছোটো মেয়ে, ও আর কী করে জানবে!"

কয়েকজন মহিলা তন্দ্রার দিকে এগিয়ে এলেন।

— "আপনি যদি ওর মা না হন, তাহলে বাচ্চাটাকে এখানে রেখে যাচ্ছেন কেন? কার কাছে রেখে যাচ্ছেন?"

তন্দ্রা কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই চারদিক থেকে আরও কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়ে গেলেন।

— "বাচ্চাটাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে পালিয়ে যাচ্ছিলেন?"

— "নিজের মেয়ে না হলে এতক্ষণ ধরে ওকে নিয়ে নাটক করছেন কেন?"

তন্দ্রা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করল,

— "আমি সত্যিই এই মেয়েটিকে চিনি না। ও আমার গাড়িতে কীভাবে এসেছে, আমি নিজেই জানি না।"

কিন্তু উত্তেজিত জনতা তার কথা বিশ্বাস করল না।

একজন মহিলা রাগে বললেন,

— "মিথ্যে কথা বলছেন! নিজের মেয়ে না হলে বাচ্চাটা আপনাকে মা বলছে কেন?"

আরেকজন মহিলা তন্দ্রার দিকে আঙুল তুলে বললেন,

— "বাচ্চাটাকে এখানে ফেলে রেখে চলে যাবেন, আবার বলছেন নিজের মেয়ে নয়!"

কথা কাটাকাটি ক্রমশ বাড়তে লাগল। কয়েকজন মহিলা তন্দ্রাকে ঘিরে ধরে তাকে হেনস্তা করতে শুরু করলেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে দু-একজন রাগের মাথায় তন্দ্রার দিকে হাত তুলতে এগিয়ে গেলেন।

তন্দ্রা ভয়ে পিছিয়ে গেল।

— "দয়া করে! আমাকে মারবেন না! আমি সত্যিই কিছু জানি না!"

ঠিক তখনই মিঠি ছুটে এসে তন্দ্রার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে তন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে মিঠি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলল,

— "না! তোমরা আমার মাকে মারবে না! আমার মাকে ছেড়ে দাও!"

হঠাৎ চারপাশের সবাই থমকে গেল।

মিঠি তন্দ্রাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

— "আমার মাকে কেউ মারবে না। মা আমাকে ছেড়ে যাবে না।"

একজন মহিলা অবাক হয়ে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— "দেখলে? মায়ের জন্য কী টান!"

আরেকজন বললেন,

— "নিজের মা না হলে একটা শিশু কি এভাবে মাকে বাঁচাতে ছুটে আসে?"

তৃতীয় একজন মহিলা মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন,

— "মেয়েটার মায়ের প্রতি কত দয়া! নিজের মা না হলে কেউ এমন করে?"

তন্দ্রা নির্বাক হয়ে মিঠির দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটিকে সে চিনত না, সেই মেয়েটিই এখন তাকে নিজের মা বলে আঁকড়ে ধরে আছে।

তন্দ্রার মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—এই ছোট্ট মেয়েটি কে? আর কেনই বা সে তাকে এত আপন করে নিয়েছে?

— "পুলিশে খবর দিন!"

— "বাচ্চাটাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত।"

কথাটা ছড়িয়ে পড়তেই চারপাশের লোকজন আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল।

— "হ্যাঁ, পুলিশকে খবর দিন। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাপারটা মিটবে না।"

— "বাচ্চাটার বাড়ি কোথায়, সেটাও তো জানতে হবে!"

পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে তন্দ্রা ভয় পেয়ে গেল। তার মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরতে লাগল।

বাড়িতে এমনিতেই তার বিয়ে নিয়ে সমস্যা চলছে। এই অবস্থায় যদি এখন থানায় যেতে হয়, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়, তাহলে বাড়িতে বিষয়টি জানাজানি হতে বেশি সময় লাগবে না।

তন্দ্রা দ্রুত পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করল। সে হঠাৎ মিঠির দিকে তাকিয়ে একটু বিরক্তির ভান করে বলল,

— "আরে না না! ও আমারই মেয়ে।"

সবাই অবাক।

তন্দ্রা এবার বলল,

— "আসলে ও খুব জেদি। পড়াশোনা করতে চায় না। তাই একটু ভয় দেখাচ্ছিলাম। ওকে বলছিলাম, কথা না শুনলে রেখে চলে যাব।"

একজন মহিলা বললেন,

— "তাহলে এতক্ষণ বলছিলেন আপনার মেয়ে নয় কেন?"

তন্দ্রা একটু থেমে বলল,

— "রাগের মাথায় বলেছিলাম।"

মিঠি তখনও কাঁদছে।

তন্দ্রা তার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,

— "চলো মা। আর কাঁদবে না।"

মিঠি চোখ মুছে তন্দ্রার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

— "তুমি আমাকে ফেলে যাবে না তো?"

তন্দ্রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

— "না। যাব না।"

একজন মহিলা মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন,

— "দেখলেন? নিজের মা না হলে এত টান হয়?"

আরেকজন বললেন,

— "বাচ্চাটাকে আর কাঁদাবেন না।"

তন্দ্রা মাথা নাড়ল।

— "ঠিক আছে।"

তারপর মিঠিকে কোলে তুলে গাড়িতে বসিয়ে দিল। মিঠি জানালার পাশে বসে হাত নাড়ল। তন্দ্রা গাড়ি স্টার্ট করল। গাড়িটি ধীরে ধীরে ভিড় থেকে দূরে চলে গেল।

কিন্তু গাড়ির ভেতরে বসে তন্দ্রার মুখে কোনো হাসি ছিল না। সে বারবার রিয়ারভিউ মিররে মিঠির দিকে তাকাচ্ছিল। মিঠি তখন নির্ভয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ মিঠি মিষ্টি করে বলল,

— "মা... আমরা বাড়ি যাচ্ছি?"

তন্দ্রা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "হ্যাঁ।"

— "তুমি আমাকে চকলেট কিনে দেবে?"

তন্দ্রা এবারও কোনো উত্তর দিল না। শুধু গাড়ির গতি একটু বাড়িয়ে দিল।

কারণ সে জানত — আজ সে একজন অচেনা শিশুকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। কিন্তু সেই শিশুটি এখন সবার সামনে তার মেয়ে।

আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় — মিঠি তন্দ্রাকে মা বলে এমনভাবে বিশ্বাস করছে, যেন সে তন্দ্রাকে বহু বছর ধরেই চেনে। তন্দ্রার মনে প্রথমবারের মতো প্রশ্ন জাগল — "এই মেয়েটা আসলে কে?"

পর্ব ৪ — "তুমি নিয়ে এসো, মা"

গাড়ি তখন শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে।

তন্দ্রার মাথায় একটাই চিন্তা — কীভাবে এই মেয়েটিকে তার জীবন থেকে সরানো যায়?

কিন্তু যতবারই সে মিঠিকে কোথাও নামিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে, ততবারই মিঠি এমনভাবে তার হাত ধরে ফেলছে যে তন্দ্রা কিছুতেই নিজেকে শক্ত করতে পারছে না।

একসময় তন্দ্রা গাড়ি থামিয়ে বলল,

— "মিঠি, তুমি এখানে নেমে যাও।"

মিঠি অবাক হয়ে তাকাল।

— "কেন?"

— "তুমি তো বলেছিলে ফুচকা খাবে। এই দোকানটা থেকে খেয়ে নাও। তারপর তুমি..."

কথা শেষ করার আগেই মিঠি মিষ্টি করে বলল,

— "তুমি নিয়ে এসো।"

তন্দ্রা থমকে গেল।

— "কী?"

— "আমি গাড়িতেই থাকব। তুমি ফুচকা নিয়ে এসো।"

তন্দ্রা কিছুক্ষণ মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

মিঠি আবার বলল,

— "অনেক ঝাল দিও না, মা।"

তন্দ্রার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

সে গাড়ি থেকে নামল। দোকানের দিকে কয়েক পা এগিয়ে আবার পিছনে তাকাল। মিঠি জানালার ভেতর থেকে হাত নাড়ছে। তন্দ্রা চোখ ফিরিয়ে নিল।

ফুচকার দোকানে গিয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু ফুচকা অর্ডার করার বদলে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। এই মেয়েটাকে নিয়ে এখন সে কী করবে?

কিছুক্ষণ পর সে গাড়িতে ফিরে এল।

মিঠি আনন্দ করে বলল,

— "দাও মা!"

তন্দ্রা ফুচকার প্লেটটা হাতে দিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করল।

তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল একজনের কথা। তার বান্ধবী ঈশিতা একজন আইনজীবী। আইন সম্পর্কে ঈশিতা অনেক কিছু জানে। তন্দ্রা ঠিক করল, তার কাছেই যাবে।

⚖️

উকিল বান্ধবীর কাছে

ঈশিতার চেম্বারে পৌঁছে তন্দ্রা মিঠিকে নিয়ে ভিতরে ঢুকল। ঈশিতা মিঠির দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হলো।

— "এই মেয়েটা কে?"

তন্দ্রা বিরক্ত হয়ে বলল,

— "এই নিয়েই তোর সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।"

তন্দ্রা একটু থেমে গভীর শ্বাস নিয়ে ঈশিতার দিকে তাকাল।

— "আমি আজ একটা রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। গাড়ি পার্ক করে ভিতরে ঢুকেছিলাম। কিছুক্ষণ পর বাইরে এসে দেখি, আমার গাড়ির পিছনের সিটে একটা ছোট্ট মেয়ে বসে আছে।"

ঈশিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "তোমার গাড়িতে? কী করে?"

তন্দ্রা মাথা নাড়ল।

— "সেটাই তো আমি জানি না। আমি তো ওকে আগে কখনো দেখিনি। আমি ওকে গাড়ি থেকে নামতে বললাম। কিন্তু মেয়েটা নামার পরই আমাকে মা বলে ডাকতে শুরু করল।"

ঈশিতা অবাক হয়ে বলল,

— "মা?"

— "হ্যাঁ। বারবার বলছিল, 'তুমি আমার মা।' আমি যতই বলেছি যে আমি ওর মা নই, ও কিছুতেই আমার কথা শুনছিল না।"

তন্দ্রা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "আমি ওকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছি, ও যেন অন্য কোথাও চলে যায়। কিন্তু মেয়েটা আমাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরল যে আমি কিছুতেই ওকে সরাতে পারলাম না।"

ঈশিতা মিঠির দিকে তাকিয়ে রইল।

— "তারপর?"

তন্দ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— "তারপর লোকজন জড়ো হয়ে গেল। সবাই ভাবতে শুরু করল, আমি বুঝি নিজের মেয়েকে অস্বীকার করছি। পরিস্থিতি এমন হয়ে গেল যে পুলিশে খবর দেওয়ার কথাও উঠল।"

তন্দ্রা তখনও বুঝতে পারছিল না—একটি সম্পূর্ণ অচেনা শিশু কীভাবে তার জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেল।

ঈশিতা মিঠিকে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর তন্দ্রাকে আলাদা করে বসিয়ে বলল,

— "এবার পুরো সত্যিটা বল।"

তন্দ্রা চুপ করে রইল।

— "কোথা থেকে পেয়েছিস?"

তন্দ্রা কোনো উত্তর দিল না।

— "কে দিয়েছে?"

তন্দ্রা এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

— "সেসব এখন বলার দরকার নেই।"

ঈশিতা কঠিন গলায় বলল,

— "দরকার আছে।"

তন্দ্রা চুপ করে ঈশিতার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঈশিতা এবার সরাসরি প্রশ্ন করল,

— "ওর বাবা কে?"

তন্দ্রা মুখ ফিরিয়ে নিল।

ঈশিতা আরও বলল,

— "আমার কাছে কেন এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলি?"

তন্দ্রা এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

— "সব কথা কি সবাইকে বলা যায়?"

ঈশিতার চোখে অভিমান ফুটে উঠল।

— "আমি কি তোর পর মানুষ? আমরা এতদিনের বন্ধু। তোর জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটল, অথচ তুই আমার কাছেও সবকিছু গোপন করে রাখলি?"

তন্দ্রা চুপ করে রইল।

ঈশিতা ধীরে ধীরে বলল,

— "আমাদের সমাজে এসব নিয়ে নানা কথা হয়, সেটা আমি জানি। কিন্তু তাই বলে আমার কাছেও লুকিয়ে রাখবি? অন্তত আমাকে তো বিশ্বাস করতে পারতিস।"

তন্দ্রা এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

— "আমি তোকে পরামর্শ চাইতে এসেছি, জেরা হতে আসিনি!"

ঈশিতা শান্তভাবে বলল,

— "আমি তোকে জেরা করছি না। তোকে বিপদ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি।"

তারপর মিঠির দিকে তাকিয়ে আবার বলল,

— "আর সবচেয়ে বড় কথা—মেয়েটার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাও ভাবতে হবে। তুই ওকে নিজের কাছে রাখতে চাইলে আইনগতভাবে কী করতে হবে, সেটা আগে বুঝতে হবে।"

তন্দ্রার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

ঈশিতা শেষবারের মতো বলল,

— "আমাকে সত্যিটা বল। কোথা থেকে পেয়েছিস, কীভাবে পেয়েছিস, ওর বাবা কে? এখন কোথায়? কেন তোকে ছেড়ে গেল?—সবকিছু জানার অধিকার আমার না থাকলেও, অন্তত মেয়েটার ভবিষ্যতের জন্য সত্যিটা জানা দরকার।"

এই কথাটাই যেন তন্দ্রার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল।

সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— "আমার মেয়ের ব্যবস্থা আমি নিজেই করতে পারব!"

ঈশিতা অবাক হয়ে বলল,

— "তন্দ্রা, রাগ করিস না। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়।"

— "আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না!"

তন্দ্রা মিঠির হাত শক্ত করে ধরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

মিঠি পিছন ফিরে ঈশিতার দিকে তাকাল। তারপর মায়ের হাত আরও শক্ত করে ধরে বলল,

— "মা, আমরা বাড়ি যাব?"

তন্দ্রা কিছু না বলে মিঠিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

ঈশিতা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—

— "এই শিশুটিকে তন্দ্রা সত্যিই কোথা থেকে পেল?"

আর অন্যদিকে, গাড়ির ভিতরে বসে মিঠি জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসছিল। সে জানত না, তার জন্য একজন মানুষ রেগে আগুন হয়ে গেছে। সে শুধু জানত—তার একজন মা আছে। আর সেই মাকে সে কোনোভাবেই হারাতে চায় না।

পর্ব ৫ — তনয়ের বাড়িতে মিঠি

ঈশিতার চেম্বার থেকে বেরিয়ে তন্দ্রা অনেকক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চালাল।

তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা — মিঠিকে কোথায় রাখা যায়?

শেষ পর্যন্ত তার মনে পড়ল তনয়ের কথা। তনয় মুখার্জি — তার একসময়ের ভালোবাসার মানুষ।

একসময় দুজনেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু দুই পরিবারের আপত্তি ছিল। একই গোত্রের মধ্যে বিয়ে দিতে দুই পরিবারই রাজি ছিল না। ধীরে ধীরে সম্পর্ক ভেঙে যায়।

তবুও তন্দ্রা জানত, তনয় খারাপ মানুষ নয়। তনয়ের সঙ্গে তার বাবা-মা এবং ছোট বোনও থাকত।

তন্দ্রা মনে মনে ভাবল,

— "ওরা মিঠিকে নিশ্চয়ই ভালোবাসবে। আর তনয় হয়তো আমাকে ভুল বুঝবে না।"

গাড়িতে বসেই সে মিঠির দিকে তাকাল।

— "মিঠি, একটা কথা মনে রাখবে।"

— "কী মা?"

— "কেউ যদি তোমার বাবার নাম জিজ্ঞেস করে, বলবে — তনয় মুখার্জি।"

মিঠি নিষ্পাপ চোখে তাকাল।

— "তনয় মুখার্জি?"

— "হ্যাঁ।"

— "উনি কি আমার বাবা?"

তন্দ্রা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

— "হ্যাঁ... তুমি সবাইকে তাই বলবে।"

মিঠি মাথা নাড়ল।

— "ঠিক আছে, মা।"

🏠

তনয়ের বাড়ি

সেদিন বিকেলে তন্দ্রা মিঠিকে নিয়ে তনয়ের বাড়িতে পৌঁছাল। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় তখন তনয়ের বাবা-মা কেউ বাড়িতে ছিলেন না। বাড়িতে ছিল তনয়ের ছোট বোন মৌ।

তন্দ্রা তাকে বলল,

— "মৌ, তোমার কাছে একটা অনুরোধ আছে।"

মৌ মিঠির দিকে তাকিয়ে বলল,

— "এই মেয়েটা কে?"

তন্দ্রা একটু ইতস্তত করে বলল,

— "ও আমার বোনের মেয়ে। ওর মা কিছুদিনের জন্য খুব সমস্যায় পড়েছে। আমাকে কয়েকদিনের জন্য বাইরে থাকতে হবে। তাই ভাবলাম, তুই কি ওকে একটু দেখাশোনা করতে পারবি?"

মৌ মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া পেল। মিঠিও চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

— "অবশ্যই পারব। কিন্তু কতদিনের জন্য?"

তন্দ্রা একটু থেমে বলল,

— "বেশিদিন নয়। কয়েকদিনের মধ্যেই আমি ফিরে আসব।"

মৌ মিঠির হাত ধরে তাকে ভিতরে নিয়ে যেতে চাইলে তন্দ্রা মিঠিকে কাছে টেনে নিল।

— "মা, তুমি এখানে ভালো করে থাকবে। মৌ পিসির কথা শুনবে, কোনো দুষ্টুমি করবে না।"

মিঠি তন্দ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,

— "তুমি কখন আসবে?"

তন্দ্রা মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলল,

— "খুব তাড়াতাড়ি।"

মিঠি তন্দ্রার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

— "আমাকে ফেলে যাবে না তো?"

প্রশ্নটা শুনে তন্দ্রার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। সে কিছুক্ষণ মিঠির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,

— "না। আমি তোমাকে ফেলে যাব না।"

মিঠি বিশ্বাস করে মাথা নাড়ল।

তন্দ্রা তার কপালে চুমু দিল। তারপর নিজেকে শক্ত করে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

মিঠি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মায়ের চলে যাওয়া দেখতে লাগল।

— "মৌ মিঠিকে নিয়ে ভিতরে চলে গেল।"

তন্দ্রা আর পিছনে ফিরে তাকাল না।

গাড়িতে উঠে সে কিছুক্ষণ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে স্থির হয়ে বসে রইল। মিঠির সেই প্রশ্ন—"আমাকে ফেলে যাবে না তো?"—বারবার তার কানে বাজতে লাগল।

অন্যদিকে, ছোট্ট মিঠি তখনও জানত না—তন্দ্রা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, কেনই বা তাকে রেখে চলে গেল। সে শুধু জানত, তন্দ্রা তার মা। আর সেই মায়ের ফিরে আসার অপেক্ষাতেই সে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

❤️

অচেনা বাড়িতে আপন হয়ে গেল মিঠি

প্রথমে মৌ একটু অস্বস্তিতে থাকলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিঠির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। মিঠির মিষ্টি কথা, হাসি আর সরল আচরণে বাড়ির পরিবেশই বদলে গেল।

সন্ধ্যায় তনয়ের বাবা-মা বাড়ি ফিরলেন। ছোট্ট মেয়েটিকে দেখে তাঁরা অবাক।

— "এ কে রে?"

মৌ হাসতে হাসতে বলল,

— "দাদা, এটা তন্দ্রার বোনের মেয়ে। কিছুদিন আমাদের কাছে থাকবে।"

তনয়ের মা মিঠিকে কোলে তুলে নিলেন।

— "আহা! কী মিষ্টি মেয়ে!"

মিঠি একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

— "ঠাকুমা..."

একটি শব্দেই বৃদ্ধার চোখ ভিজে গেল।

— "আবার বল তো?"

— "ঠাকুমা।"

তিনি মিঠিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

তনয়ের বাবা হাসতে হাসতে বললেন,

— "তাহলে আমি কে?"

মিঠি একটু ভেবে বলল,

— "দাদু!"

বৃদ্ধ হেসে উঠলেন।

— "বেশ! তাহলে আজ থেকে আমি তোর দাদু।"

সেই রাতেই মিঠি বাড়ির সবার প্রিয় হয়ে গেল। কেউ তাকে খাবার খাওয়াচ্ছে, কেউ গল্প করছে, কেউ খেলছে।

তনয়ের বাবা মিঠিকে পাশে বসিয়ে আদর করে জিজ্ঞেস করলেন,

— "দিদিভাই, তোমার নাম কী?"

মিঠি গর্ব করে বলল,

— "মিঠি মুখার্জি।"

— "বাহ! খুব সুন্দর নাম। তোমার বাবার নাম কী?"

মিঠি এক মুহূর্তও না ভেবে বলল,

— "তনয় মুখার্জি।"

ঘরের মধ্যে যেন হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।

তনয়ের মা মিঠির দিকে তাকালেন। মৌয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

তনয়ের বাবা ধীরে ধীরে বললেন,

— "কী বললে?"

মিঠি আবার বলল,

— "আমার বাবার নাম তনয় মুখার্জি।"

— "তনয় মুখার্জি?"

মৌয়ের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। সে প্রায় চিৎকার করে বলল,

— "কিন্তু তনয় তো...!"

কথাটা শেষ করার আগেই দরজা খুলে তনয় ঘরে ঢুকল।

— "কী হয়েছে? এত চিৎকার-চেঁচামেচি কেন? আর এই মেয়েটি কে?"

ঘরের সবাই হঠাৎ চুপ করে গেল।

তনয় একবার মৌয়ের দিকে, তারপর মিঠির দিকে তাকাল।

তনয়ের বাবা ধীরে ধীরে বললেন,

— "তুই কি কিছুই জানিস না?"

তনয় অবাক হয়ে বলল,

— "কী জানব?"

মৌ মিঠির দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,

— "ও বলছে, ওর বাবার নাম তনয় মুখার্জি।"

তনয় যেন আচমকাই পাথর হয়ে গেল। তার চোখ স্থির হয়ে রইল মিঠির মুখের দিকে।

— "কী বললে?"

মিঠি নিষ্পাপ চোখে তনয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। তারপর জিজ্ঞেস করল,

— "তুমি আমার বাবা?"

তনয়ের মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না।

ঘরের সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কারণ তন্দ্রা যখন মিঠিকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, তখন তনয় কিংবা তার বাবা-মা কেউই বাড়িতে ছিলেন না। ফলে তন্দ্রা মিঠিকে কী পরিচয়ে এখানে রেখে গেছে, সে সম্পর্কে বাড়ির কেউই কিছু জানত না।

আর এখন পাঁচ বছরের একটি শিশু সরল বিশ্বাসে দাবি করছে—তনয় মুখার্জিই তার বাবা।

তনয়ের মা উদ্বিগ্ন হয়ে মিঠির দিকে তাকালেন। আর তনয়ের বাবা এবার ছেলের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

— "তনয়, তন্দ্রার সঙ্গে তোমার আবার কী সম্পর্ক?"

তনয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

— "তন্দ্রা... আমার পরিচিত।"

তনয়ের বাবা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন,

— "শুধু পরিচিত? তাহলে এই মেয়েটা তোকে বাবা বলছে কেন?"

তনয় কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।

তার চোখ তখনও মিঠির মুখে আটকে ছিল।

মিঠি ধীরে ধীরে তনয়ের কাছে এগিয়ে এসে দুহাত বাড়িয়ে দিল।

— "বাবা, আমাকে কোলে নেবে?"

তনয়ের বুকের ভেতর যেন প্রচণ্ড একটা ধাক্কা লাগল। সে জানত—এই মুহূর্তের পর তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।

পর্ব ৬ — মাঝরাতের গোপন প্রত্যাবর্তন

তনয়ের বাড়িতে সেদিন রাতটা আর স্বাভাবিক রইল না।

মিঠি যতবার তনয়ের দিকে তাকাচ্ছিল, ততবারই তার মুখে একই কথা—

— "বাবা, আমাকে কোলে নেবে?"

তনয় কী বলবে বুঝতে পারছিল না। সে বারবার বলছিল,

— "আমি তোমার বাবা নই।"

কিন্তু পাঁচ বছরের মিঠি কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করছিল না।

— "মা বলেছে তুমি আমার বাবা।"

তনয় স্তব্ধ হয়ে গেল। সে নিজের জীবনের সমস্ত হিসাব মনে করার চেষ্টা করল। তন্দ্রার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল—এটা সত্যি। কিন্তু তাদের কখনো বিয়ে হয়নি। তাহলে এই শিশুটি কোথা থেকে এল?

তনয়ের মা এতক্ষণ চুপ করে সবকিছু শুনছিলেন। তিনি মিঠির কাছে গিয়ে স্নেহভরে জিজ্ঞেস করলেন,

— "আচ্ছা মা, তোমার মায়ের নাম কী?"

মিঠি একটুও না ভেবে উত্তর দিল,

— "তন্দ্রা মুখার্জি।"

কথাটা শুনে তনয়ের মা কিছুটা স্বস্তি পেলেন। কারণ তন্দ্রা যখন মিঠিকে এখানে রেখে গিয়েছিল, তখন সে বলেছিল মেয়েটি তার বোনের মেয়ে।

তনয়ের মা বললেন,

— "হ্যাঁ, আমরা তো জানি ও তন্দ্রার বোনের মেয়ে।"

কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।

তিনি মিঠির দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন,

— "তাহলে তুমি তোমার বাবার নাম তনয় মুখার্জি বলছ কেন?"

মিঠি সরলভাবে বলল,

— "মা আমাকে বলেছে।"

তনয় এবার আর কিছুতেই বুঝতে পারল না কী হচ্ছে।

— "তন্দ্রা তো মৌকে বলেছিল, মেয়েটা ওর বোনের মেয়ে। তাহলে ও আমাকে বাবা বলছে কেন?"

তনয়ের বাবা রাগে বললেন,

— "তন্দ্রাকে এখনই ডাক। এই ব্যাপারের উত্তর একমাত্র তন্দ্রাই দিতে পারবে।"

তনয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মিঠির দিকে তাকাল। ছোট্ট মেয়েটি তখনও নির্বিকার। তার কাছে কোনো রহস্য নেই—মা তাকে যা শিখিয়েছে, সে শুধু সেটাই বিশ্বাস করে বলছে।

কিন্তু তনয়ের পরিবারের কাছে এই একটি কথাই যেন এক বিশাল ঝড়ের সূচনা করে দিল।

তনয় তার বোন মৌকে বলল,

— "তুই তন্দ্রাকে ফোন কর। ওকে বল, এখনই এখানে আসতে।"

মৌ ফোন করল। কিছুক্ষণ পর তন্দ্রা ফোন ধরল।

— "হ্যালো?"

মৌ বলল,

— "তুই এখনই আমাদের বাড়িতে আয়। এখানে বিরাট সমস্যা হয়েছে।"

তন্দ্রা চুপ।

— "মিঠি বলছে বাবার নাম তনয় মুখার্জি। বাবা-মা সব জানতে চাইছে।"

তন্দ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— "আমি এখন আসতে পারব না।"

— "কেন?"

— "ফোনটা তনয়কে দাও।"

তনয় ফোন হাতে নিল।

— "তন্দ্রা, এটা কী?"

ওপাশ থেকে তন্দ্রার কণ্ঠ শোনা গেল,

— "আমি সব বলছি। কিন্তু আমাকে এখন ওখানে যেতে বলো না।"

— "মিঠি কে?"

কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর তন্দ্রা ধীরে ধীরে সবকিছু জানাল। রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে ওর গাড়িতে ওঠা, মা বলে ডাকা, বান্ধবী উকিলের কাছে যাওয়া — সব।

তনয় নির্বাক হয়ে শুনছিল। শেষে সে বলল,

— "তুমি একটা শিশুর জন্য এতো বিপদে পড়েছিলে ?"

তন্দ্রা উত্তরে কিছু বলল না।

তনয় আবার বলল,

— "ওকে এখন কী করব?"

— "আমি জানি না।"

— "তাহলে এখানে পাঠালে কেন?"

তন্দ্রা ফোন কেটে দিল।

🚗

গভীর রাত

তনয়ের বাড়িতে অশান্তি বাড়তেই থাকল। মিঠি কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে শুধু মাঝে মাঝে বলছিল,

— "আমি কি খারাপ কিছু করেছি?"

মৌয়ের বুকটা কেঁপে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল, মেয়েটির কোনো দোষ নেই।

শেষ পর্যন্ত রাত অনেক গভীর হলে মৌ একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে কাউকে কিছু না জানিয়ে মিঠিকে গাড়িতে বসাল।

— "পিসি, আমরা কোথায় যাচ্ছি?"

— "তোমার মায়ের কাছে।"

মিঠি খুশি হয়ে বলল,

— "মা আমাকে দেখে খুব খুশি হবে!"

মৌ কোনো উত্তর দিল না। রাতের প্রায় নিস্তব্ধ শহর পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল।

অনেকক্ষণ পর তারা তন্দ্রাদের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। বাড়ির প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

মৌ খুব সাবধানে চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, কেউ তাদের দেখতে পাচ্ছে না। তারপর মিঠিকে সঙ্গে নিয়ে নিঃশব্দে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল।

তন্দ্রার ঘরের কাছে এসে মৌ জানলার কাছে গিয়ে আস্তে করে ডাকল,

— "তন্দ্রা... তন্দ্রা..."

কিছুক্ষণ পর তন্দ্রা ঘুম জড়ানো চোখে উঠে জানলার কাছে এল। মৌকে দেখে সে অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল,

— "এত রাতে? মিঠিকে নিয়ে এসেছিস?"

মৌ মাথা নাড়ল।

তন্দ্রা দ্রুত দরজা খুলে দিল। মৌ চারদিকে তাকিয়ে মিঠিকে নিঃশব্দে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দিল।

তন্দ্রা নিচু গলায় বললো, যা কথা হবার পরে হবে, এখন

— মা-বাবা ঘুমাচ্ছে।

মৌ আস্তে করে বলল,

— "হ্যাঁ, জানি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন আমাকে যেতে হবে। বেশি রাত হয়ে গেছে।"

তন্দ্রা মাথা নাড়ল।

— "ঠিক আছে। তুই যা। আমি মিঠিকে সামলে নিচ্ছি।"

মৌ মিঠির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

— "ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে, কেমন?"

মিঠি চুপচাপ মাথা নাড়ল।

মৌ আর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ করে তন্দ্রা মিঠির কাছে এসে বসে পড়ল।

মিঠি ক্লান্ত চোখে তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "মা, তুমি আমাকে আর কোথাও পাঠাবে না তো?"

তন্দ্রার বুকটা কেঁপে উঠল। সে মিঠিকে কাছে টেনে নিয়ে আস্তে করে বলল,

— "না মা। এখন তুমি আমার কাছেই থাকবে।"

তারপর তন্দ্রা মিঠিকে নিজের পাশে শুইয়ে দিল।

— "চুপচাপ আমার পাশে ঘুমিয়ে পড়ো। কাউকে যেন জাগিয়ে দিও না।"

মিঠি মায়ের গায়ে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।

তন্দ্রা ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

বাইরে তখন গভীর রাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। আর তন্দ্রার ঘরের ভিতরে, অজান্তেই এমন এক গোপন সত্য ঘুমিয়ে পড়ল—যে সত্য খুব শিগগিরই পুরো পরিবারকে নাড়িয়ে দেবে।

🛏️

তন্দ্রার ঘরে

তন্দ্রা ও মিঠি পাশাপাশি শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনেই ঘুমিয়ে গেল।

গভীর রাতে ঘুমের মধ্যেই তন্দ্রার মনে হলো, কেউ যেন তার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে।

চোখ না খুলেই সে হাতটা সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে মিঠির ছোট্ট হাতটাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল।

ঘুমের মধ্যেই তন্দ্রা অস্পষ্ট গলায় বলল,

— "সারাদিন খুব ক্লান্তি গেছে... এখন নিশ্চিন্ত।"

মিঠি মায়ের বুকের কাছে মাথা রেখে তন্দ্রার স্নেহের উষ্ণতা অনুভব করল। তার ছোট্ট মুখে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি।

তন্দ্রার নিজেরও যেন অজান্তেই মনে হচ্ছিল—মেয়েটা তার পাশে থাকায় আজ সে অদ্ভুত এক শান্তি পেয়েছে।

ক্লান্ত শরীর আর মনের সমস্ত দ্বিধা ভুলে তন্দ্রাও গভীর ঘুমে ডুবে গেল।

কিন্তু তন্দ্রা তখনও জানত না—একটি ছোট্ট ভুল সে করে ফেলেছে। ঘরের দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

আর সেই সামান্য ফাঁকই ভোরের আগে এমন এক সত্যকে প্রকাশ করে দিতে চলেছে, যা সে এতক্ষণ সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।

🌅

ভোরের আগে

রাত পেরিয়ে ভোর হতে চলেছে। আগের রাতের মানসিক চাপ ও ক্লান্তির কারণে তন্দ্রা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

সাধারণত এই সময় তন্দ্রার মা ঘুম থেকে উঠে পড়েন। সেদিনও তিনি ঘুম থেকে উঠে দৈনন্দিন কাজের জন্য মেয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

ঘরের দরজা একটু খোলা দেখে তিনি মনে করলেন, তন্দ্রা হয়তো রাতে দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে।

তিনি নিঃশব্দে দরজাটা একটু ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন।

তারপরই হঠাৎ তাঁর চোখ থেমে গেল।

মেয়ের বিছানায় তন্দ্রার পাশে একটি ছোট্ট মেয়ে গভীর ঘুমে শুয়ে আছে!

তন্দ্রার মা কয়েক সেকেন্ড একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখ যেন বিশ্বাসই করতে চাইছিল না, তিনি যা দেখছেন তা সত্যি।

তারপর বিস্ময় ও আতঙ্ক মেশানো গলায় তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল,

— "তন্দ্রা!"

তন্দ্রার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকাল।

তারপর মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে পাশে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।

মিঠি তখনও তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে।

তন্দ্রার মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

সে তাড়াতাড়ি উঠে বসে মায়ের দিকে তাকাল।

তন্দ্রার মা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

— "এই মেয়েটা কে?"

তন্দ্রা মুখ খুলল, কিন্তু কোনো কথা বের হলো না।

তন্দ্রার মা আবার জিজ্ঞেস করলেন,

— "তন্দ্রা, আমি তোকে জিজ্ঞেস করছি—এই মেয়েটা কে? রাতে ওকে তোর ঘরে নিয়ে এলি কীভাবে?"

তন্দ্রা এবারও চুপ করে রইল।

ঠিক তখনই মিঠির ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে প্রথমেই তন্দ্রার দিকে তাকাল।

তারপর মিষ্টি করে হেসে বলল,

— "মা... আমি কোথায়?"

তন্দ্রার মা যেন বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তিনি অবিশ্বাসের চোখে তন্দ্রার দিকে তাকালেন।

— "মা? ও তোকে মা বলছে?"

তন্দ্রা এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।

সেই মুহূর্তে তন্দ্রা বুঝতে পারল—যে গোপন কথাটা সে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, তা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

🕊️

সত্যি সামনে আসে

তন্দ্রার মা বারবার প্রশ্ন করতে লাগলেন। শেষে আর লুকিয়ে রাখতে না পেরে তন্দ্রা কাঁদতে কাঁদতে সব বলল — মিঠিকে কীভাবে সে পেয়েছিল, আর ভয়ে-লজ্জায় তিন-তিনটে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে তাকে আড়াল করার চেষ্টার কথা।

খবর পেয়ে তন্দ্রার বাবা ছুটে এলেন। প্রথমে রেগে গেলেও মিঠির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর রাগ ধীরে ধীরে গলে গেল।

তিনি বললেন,

— "এভাবে লুকিয়ে রাখাটা ঠিক হয়নি, মা। একটা বাচ্চার জীবনের প্রশ্ন। আইন মেনে, ঠিকভাবে এর সমাধান করতে হবে।"

তন্দ্রা মাথা নিচু করে বলল,

— "আমি ওকে হারাতে ভয় পেয়েছিলাম, বাবা।"

তন্দ্রার বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

— "সত্যি লুকিয়ে ভালোবাসা রক্ষা হয় না। সত্যি বলেই রক্ষা করতে হয়।"

পরদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন — বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে খবর দেওয়া হবে, মিঠি নামে একটি ছোটো মেয়ে পাওয়া গেছে, যার আসল বাবা-মায়ের খোঁজ চাই। ঘোষণায় বলা হলো, আগামী দশ দিনের মধ্যে কেউ দাবি নিয়ে এলে আইনি প্রক্রিয়ায় শিশুটিকে তার আসল পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

খবরটা কয়েকদিন ধরে খবরের কাগজে আর টিভির পর্দায় ঘুরল।

কিন্তু কেউ যোগাযোগ করল না।

কারণ যাঁরা মিঠিকে চিনতেন, তাঁদের কেউই আর বেঁচে নেই। সেই পাহাড়ি রাতেই অভীক আর মেঘা চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর আত্মীয়স্বজন ও পুলিশ ধরে নিয়েছিল, তাঁদের ছোট্ট মেয়েটিও আর বেঁচে নেই।

তাই মিঠি যে বেঁচে আছে, এত বছর ধরে কেউই তা জানতে পারেনি।

তন্দ্রার বাবা বিভিন্নভাবে খবর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, আগামী দশ দিনের মধ্যে যদি মিঠির প্রকৃত বাবা-মা বা তাদের কোনো আত্মীয় যোগাযোগ করেন, তাহলে শিশুটিকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

দশটা দিন একে একে কেটে গেল। প্রতিদিন তন্দ্রা আর তনয় উদ্বিগ্ন হয়ে খবরের কাগজ খুলতেন, কোনো নতুন খবর এসেছে কি না দেখতেন। ফোনের শব্দ হলেই দুজনের বুক ধড়ফড় করে উঠত।

কিন্তু কোনো ফোন এল না। কোনো অচেনা মানুষও দরজায় এসে মিঠির খোঁজ করল না।

এর মধ্যে মিঠি ধীরে ধীরে তন্দ্রা আর তনয়ের আরও কাছাকাছি চলে এসেছিল। তনয়ের বাবা-মা, মৌ—সবাই তাকে নিজের পরিবারের একজন করে নিয়েছিলেন।

মিঠির হাসি, কথা, ছোট্ট ছোট্ট আবদার—সবকিছুই যেন বাড়ির পরিবেশ বদলে দিয়েছিল।

দশ দিন শেষ হওয়ার সন্ধ্যায় তন্দ্রার বাবা মিঠিকে কাছে ডাকলেন। কিছুক্ষণ তার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

— "দিদিভাই, তুমি কার কাছে থাকতে চাও?"

মিঠি এক মুহূর্তও ভাবল না। সে ছুটে গিয়ে তন্দ্রা আর তনয়কে দুহাতে জড়িয়ে ধরল।

— "আমি আমার মা আর বাবার কাছে থাকতে চাই।"

কথাটা শুনে ঘরের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল। কারও চোখে আর জল ধরে রাখা সম্ভব হলো না।

তন্দ্রা মিঠিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। তনয়ও মেয়েটির মাথায় হাত রাখল।

সেই মুহূর্তে তন্দ্রা বুঝতে পারল—মিঠিকে সে প্রথমে হয়তো পরিস্থিতির চাপে নিজের জীবনে এনেছিল, কিন্তু এতদিনে সেই সম্পর্ক আর মিথ্যে পরিচয়ের মধ্যে আটকে নেই। মেয়েটির প্রতি তার যে টান তৈরি হয়েছে, তা সত্যিকারের মায়ায় পরিণত হয়েছে। আর মিঠির ভালোবাসাও তাকে নিজের মা-বাবা হিসেবেই গ্রহণ করেছে।

💍

দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর

মিঠিকে ঘিরেই তন্দ্রা আর তনয় আবার একে অপরের কাছাকাছি এলেন। বহু বছর আগে গোত্রের আপত্তিতে যে সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল, আজ সেই সম্পর্কের মাঝে সেতু হয়ে দাঁড়াল একটি ছোট্ট মেয়ের ভালোবাসা।

দুই পরিবারও ধীরে ধীরে সব ভুলে গিয়ে এই সম্পর্ক মেনে নিল। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে তন্দ্রা আর তনয়ের বিয়ে হলো।

বিয়ের আসরে সবার মুখে ছিল আনন্দের হাসি। কিন্তু সেদিন সবচেয়ে বেশি খুশি ছিল পাঁচ বছরের মিঠি। কারণ সে তার জীবনে প্রথমবারের মতো মা আর বাবাকে একসঙ্গে পেয়েছিল।

তন্দ্রা মিঠিকে কোলে তুলে নিল। তনয়ও পাশে এসে দাঁড়াল। মিঠি দুজনের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।

— "এবার আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব তো?"

তন্দ্রা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

— "হ্যাঁ মা, এবার থেকে আমরা সবাই একসঙ্গেই থাকব।"

তনয় মিঠির মাথায় হাত রেখে বলল,

— "কেউ আর তোমাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারবে না।"

পাহাড়ের সেই ভয়াবহ রাতে যে শিশুটিকে সবাই চিরতরে হারিয়ে গেছে বলে ধরে নিয়েছিল, সে আসলে কখনোই হারিয়ে যায়নি। ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় সে এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারের জীবনে এসে নতুন পরিচয় পেয়েছিল।

তিথি থেকে মিঠি, আর মিঠি থেকে মিঠি মুখার্জি—পরিচয় বদলেছে, নাম বদলেছে, জীবনও বদলে গেছে। কিন্তু একটি জিনিস কখনো বদলায়নি—ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই তাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি।

সে ছিল। সে আছে। আর সে কোনোদিন হারিয়ে যায়নি।

যে মেয়েটি হারিয়ে যায়নি · পর্ব ৬/৬ · সমাপ্ত
শুনতে চাইলে প্লে করুন
পর্ব ১ — পাহাড়ের পথে সেই রাত