বাংলা ধারাবাহিক গল্প · ৬টি পর্ব
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
পর্ব ১ : জমিদারবাড়ির অন্নপ্রাশন
সব পর্ব
পর্ব ১
পড়ুন
পর্ব ২
পড়ুন
পর্ব ৩
পড়ুন
পর্ব ৪
পড়ুন
পর্ব ৫
পড়ুন
পর্ব ৬
শেষ পর্ব
পর্ব ১ : জমিদারবাড়ির অন্নপ্রাশন
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
সেই সময়ের কথা।
নদীর ধারে বিস্তীর্ণ এক অঞ্চলের জমিদার ছিলেন রাজচন্দ্র রায়। তাঁর জমিদারি খুব বড় না হলেও নামডাক ছিল যথেষ্ট। প্রজাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল বেশ ভালো। কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে জমিদারবাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াতে দ্বিধা করত না।
তবে রাজচন্দ্রবাবুর সবচেয়ে বড় আনন্দের কারণ ছিল তাঁর একমাত্র পুত্র—শশাঙ্ক।
শশাঙ্কের বয়স তখন মাত্র ছয় মাস।
আর সেই ছেলের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে জমিদারবাড়িতে যেন উৎসবের বন্যা বয়ে গেল।
সকাল থেকেই বাড়ির সামনে নহবত বসেছে।
ঢং ঢং ঢং...
শানাইয়ের সুরে চারদিক মুখরিত।
বাড়ির সদর দরজায় আমপাতার মালা, ফুলের তোড়া আর কলাগাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে। উঠোনে বিশাল প্যান্ডেল। একদিকে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, অন্যদিকে রান্নার জন্য বিশাল চুল্লি।
রান্নাঘরের অবস্থা তো দেখলে মনে হয়, একটা ছোটখাটো সেনাবাহিনীকে খাওয়ানো হবে!
কড়াইয়ে ঘি ফুটছে। কোথাও লুচি ভাজা হচ্ছে। কোথাও মাছের ঝোল। কোথাও পোলাও।
আর মিষ্টির তো কোনো হিসাবই নেই। সন্দেশ, রসগোল্লা, লাড্ডু, ক্ষীরকদম—সব একসঙ্গে তৈরি হচ্ছে।
রান্নাঘরের প্রধান রাঁধুনি হরিপদ ঠাকুর ঘামতে ঘামতে চিৎকার করে বললেন,
—“ওরে নিতাই! ওই বড় কড়াইটায় আর একটু ঘি দে! আর শোন, মাছগুলো সাবধানে কাটিস। আজ কিন্তু একটা মাছও নষ্ট হওয়া চলবে না!”
নিতাই দূর থেকে বলল,
—“ঠাকুরমশাই, মাছ তো সব ঠিকঠাকই আছে। শুধু ওই একটা মাছ নিয়ে একটু ভয় হচ্ছে।”
—“কেন?”
—“ওটা মাছ নয়, বোধহয় কুমিরের ছোট ভাই!”
হরিপদ ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন। রান্নাঘরের এক কোণে রাখা রয়েছে বিশাল এক কাতলা মাছ। মাছটির ওজন প্রায় আঠারো কিলোগ্রাম!
তার দিকে তাকিয়ে হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“এটা মাছ নয় রে... এটা একটা সংসার!”
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
বিশাল কাতলা
এই কাতলা মাছটি বিশেষভাবে আনা হয়েছিল দূরের এক বড় নদী থেকে। জমিদারবাবুর আদেশ ছিল—
“অন্নপ্রাশনের ভোজে এমন মাছ চাই, যা দেখে অতিথিরা বাড়ি গিয়ে গল্প করবে।”
তাই মাছটিকে সকালেই রান্নাঘরের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। হরিপদ ঠাকুর নিজেই কোমর বেঁধে মাছ কাটতে বসলেন। চারপাশে কয়েকজন সহকারী দাঁড়িয়ে।
হরিপদ ছুরি ধার দিয়ে বললেন,
—“চল, আজ দেখি তোর ভিতরে কী আছে!”
নিতাই মজা করে বলল,
—“ঠাকুরমশাই, এত বড় মাছের ভিতরে যদি আরেকটা মাছ থাকে?”
—“তাহলে সেটাকেও কাটব।”
—“তার ভিতরে যদি আবার একটা মাছ থাকে?”
হরিপদ ছুরি থামিয়ে বললেন,
—“তুই চুপ কর। নইলে তোকে আগে কাটব!”
আবার হাসির শব্দ উঠল।
মাছ কাটার কাজ শুরু হলো। একবার... দুবার... তারপর হঠাৎ—
ঠং!
ছুরির ফলায় অদ্ভুত একটা শব্দ হলো। হরিপদ থেমে গেলেন।
—“কীসের শব্দ হলো?”
নিতাই বলল,
—“হাড়ে লেগেছে?”
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
—“না। হাড়ের শব্দ এমন নয়।”
তিনি মাছের পেটের অংশটি সাবধানে কাটতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ তাঁর চোখ বড় হয়ে গেল।
—“আরে!”
—“কী হয়েছে?”
হরিপদ মাছের পেটের ভিতর থেকে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করলেন। তাঁর হাতের তালুতে ছোট্ট একটি জিনিস। সূর্যের আলো পড়তেই সেটি ঝিকমিক করে উঠল।
একটি হীরের আংটি!
সবাই হতবাক
কিছুক্ষণের জন্য রান্নাঘরে একেবারে নীরবতা। নিতাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
আরেকজন বলল,
—“মাছের পেটের মধ্যে আংটি!”
হরিপদ বললেন,
—“আমি জীবনে অনেক মাছ কেটেছি। কিন্তু মাছের পেট থেকে আজ পর্যন্ত পুঁটি মাছও পেয়েছি, চিংড়িও পেয়েছি... আংটি পাইনি!”
কেউ বলল,
—“এটা নিশ্চয়ই কারও হারানো আংটি।”
আরেকজন বলল,
—“কিন্তু মাছের পেটে গেল কী করে?”
কেউ কোনো উত্তর দিতে পারল না।
খবর মুহূর্তের মধ্যে রান্নাঘর থেকে উঠোনে পৌঁছে গেল। তারপর উঠোন থেকে বারান্দায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই—
“মাছের পেট থেকে হীরের আংটি বেরিয়েছে!”
এই খবর গোটা জমিদারবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। অতিথিরাও ভিড় করতে শুরু করলেন।
জমিদারবাবুর সামনে আংটি
রাজচন্দ্র রায় তখন অতিথিদের সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন। একজন কর্মচারী দৌড়ে এসে বলল,
—“জমিদারবাবু! বড় আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে!”
রাজচন্দ্রবাবু হেসে বললেন,
—“আজ তো আশ্চর্য ঘটনার অভাব নেই। কী হয়েছে?”
—“মাছের পেট থেকে আংটি পাওয়া গেছে।”
—“কী বললে?”
—“হীরের আংটি।”
রাজচন্দ্রবাবু এবার উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর সামনে আংটিটি এনে রাখা হলো। তিনি আংটিটি হাতে তুলে নিলেন।
অসাধারণ সুন্দর আংটি। মাঝখানে বড় একটি স্বচ্ছ হীরা। চারপাশে সূক্ষ্ম নকশা।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—আংটির ভিতরের দিকে খুব ছোট করে কয়েকটি অক্ষর খোদাই করা। রাজচন্দ্রবাবু চোখ কুঁচকে সেগুলো পড়ার চেষ্টা করলেন। কিছু বোঝা গেল না।
তিনি রানী হেমাঙ্গিনীর দিকে তাকালেন। রানীও আংটিটি দেখে অবাক। বললেন,
—“এ আংটি নিশ্চয়ই কোনো সাধারণ মানুষের নয়।”
রাজচন্দ্রবাবু বললেন,
—“তা তো মনে হচ্ছে না।”
একজন বৃদ্ধ আত্মীয় বললেন,
—“হয়তো বহু বছর আগে কোনো ধনী ব্যক্তির আংটি নদীতে পড়ে গিয়েছিল। মাছ সেটি গিলে ফেলেছিল।”
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—“তাহলে এতদিন মাছটির পেটে ছিল?”
বৃদ্ধ বললেন,
—“তা তো...”
তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। কারণ সেই ব্যাখ্যাটি কারও কাছেই খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।
আংটিটি কার?
জমিদারবাবু আংটিটি আবার হাতে নিয়ে দেখলেন। হীরেটি অদ্ভুতভাবে ঝলমল করছে। কোনো দামি পাথর তিনি আগে দেখেছেন, কিন্তু এই হীরের আলো যেন একটু অন্যরকম।
তিনি বললেন,
—“আংটিটি আপাতত আমার কাছেই থাকবে।”
রানী মৃদু হেসে বললেন,
—“কিন্তু এত লোকের সামনে পাওয়া জিনিস। পরে এর আসল মালিককে খুঁজে পাওয়া গেলে?”
—“তখন অবশ্যই ফিরিয়ে দেব।”
তিনি আংটিটি নিজের পকেটে রেখে দিলেন। তারপর যেন কিছুই ঘটেনি, আবার অতিথিদের দিকে ফিরে গেলেন। কারণ আজ তাঁর ছেলের অন্নপ্রাশন। এমন আনন্দের দিনে একটি রহস্যময় আংটির চিন্তায় তিনি উৎসবের আনন্দ নষ্ট করতে চান না।
সন্ধ্যা নামল। অন্নপ্রাশনের সমস্ত অনুষ্ঠান শেষ হলো। অতিথিরা একে একে বিদায় নিলেন। নহবতের শব্দ থেমে গেল। আলো কমে এল। সারাদিনের ব্যস্ততার পর জমিদারবাড়ি ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শশাঙ্ক ঘুমিয়ে পড়েছে। রানীও নিজের ঘরে চলে গেছেন। রাজচন্দ্রবাবু একা বসে আছেন তাঁর ঘরে। টেবিলের ওপর একটি প্রদীপ জ্বলছে।
তিনি পকেট থেকে সেই আংটিটি বের করলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিজের মনেই বললেন,
—“মাছের পেট থেকে আংটি... এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে।”
আংটিটি তিনি আঙুলের কাছে নিয়ে এলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে হালকা বাতাস এসে প্রদীপের শিখাটিকে দুলিয়ে দিল। হীরেটি একবার ঝলসে উঠল। রাজচন্দ্রবাবু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি জানতেন না—
এই ছোট্ট আংটিটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায়ের দরজা খুলে দিতে চলেছে।
আর সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে এমন এক রহস্য, যার কথা তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি।
চলবে...
পর্ব ২ : আংটির অদ্ভুত ক্ষমতা
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
রাত অনেক হয়েছে।
জমিদারবাড়ির চারদিক নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। অন্নপ্রাশনের সারাদিনের কোলাহল যেন হঠাৎ করেই বহু দূরের কোনো স্মৃতি হয়ে গেছে।
রাজচন্দ্র রায় তাঁর ঘরে একা বসে আছেন। সামনে প্রদীপের আলো। আর তাঁর হাতে সেই রহস্যময় হীরের আংটি।
মাছের পেট থেকে পাওয়া সেই আংটির কথা তাঁর মন থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না। তিনি আবার আংটির ভিতরের দিকটা দেখলেন। ক্ষুদ্র কিছু অক্ষর খোদাই করা আছে, কিন্তু প্রদীপের আলোয় সেগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় না।
রাজচন্দ্রবাবু নিজের মনেই বললেন,
—“এত সুন্দর আংটি... অথচ এল কোথা থেকে?”
কৌতূহল তাঁকে আর স্থির থাকতে দিল না। তিনি আংটিটি ডান হাতের তর্জনীতে পরলেন।
হঠাৎ এক অদ্ভুত ঘটনা
প্রথমে কিছুই হলো না। রাজচন্দ্রবাবু আংটির দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন।
—“হরিপদ ঠাকুরের কথাই ঠিক। মাছের পেট থেকে বেরোলেই কোনো জাদুর জিনিস হয়ে যায় না!”
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে গেলেন। তারপর—
এক মুহূর্তে তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
আয়নায় তাঁর মুখ নেই!
তিনি নিজের বুকের দিকে তাকালেন। হাত নেই। পা নেই। পুরো শরীর যেন উধাও! শুধু তাঁর পরনের পোশাকটি বাতাসে ভাসছে।
রাজচন্দ্রবাবু ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
—“এ কী!”
তিনি নিজের মুখে হাত দিতে গেলেন। হাত দিয়ে মুখ অনুভব করতে পারছেন, কিন্তু চোখে দেখতে পাচ্ছেন না।
তিনি দ্রুত আংটিটি খুলে ফেললেন।
হঠাৎ তাঁর শরীর আবার দেখা গেল।
তিনি কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর আবার আংটিটি পরলেন। আবার অদৃশ্য। খুললেন। আবার দৃশ্যমান।
এবার আর কোনো সন্দেহ রইল না।
আংটিটি মানুষকে অদৃশ্য করতে পারে!
রাজচন্দ্রের প্রথম পরীক্ষা
রাজচন্দ্রবাবু দরজার কাছে গেলেন। আংটি পরে দরজা খুললেন। বাইরে পাহারায় থাকা দুজন প্রহরী তাঁকে দেখতে পেল না।
একজন আরেকজনকে বলল,
—“জমিদারবাবু কি ঘরে আছেন?”
অন্যজন বলল,
—“আছেন তো! একটু আগেই ঢুকলেন।”
রাজচন্দ্রবাবু তাদের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে ফেললেন। তিনি হাত নাড়লেন। প্রহরীরা কিছুই দেখতে পেল না।
তখন তাঁর মনে হলো—
এই আংটির ক্ষমতা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
তিনি দ্রুত ঘরে ফিরে এলেন এবং আংটিটি খুলে ফেললেন। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। এমন ক্ষমতা কোনো মানুষের হাতে থাকা উচিত কি না—সেটা নিয়েই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল।
রানীর আগমন
ঠিক তখন দরজায় মৃদু শব্দ হলো।
—“রাজচন্দ্র?”
রানীর কণ্ঠ।
রাজচন্দ্রবাবু তাড়াতাড়ি আংটিটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
—“এসো।”
রানী ঘরে ঢুকলেন। তিনি স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“এত রাতে এখনও জেগে আছ? কী হয়েছে?”
রাজচন্দ্রবাবু কিছুক্ষণ দ্বিধা করে বললেন,
—“আজ যে আংটিটা পেয়েছিলাম...”
রানী টেবিলের দিকে তাকালেন।
—“ওটা?”
—“হ্যাঁ। আমি একটু পরীক্ষা করছিলাম।”
—“কী দেখলে?”
রাজচন্দ্রবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে একজন কর্মচারী এসে দরজায় দাঁড়াল। রাজচন্দ্রবাবু স্বাভাবিকভাবে আংটিটি হাতে নিলেন।
কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হলো—
আংটিটির রহস্য কাউকে জানানো উচিত নয়।
তিনি বললেন,
—“কিছুই না। অদ্ভুত একটা আংটি, তাই দেখছিলাম।”
রানী আর কিছু বললেন না। তিনি স্বামীকে ভালো করেই চিনতেন। তবে তাঁর মনে হলো, রাজচন্দ্রবাবু যেন কিছু একটা লুকোচ্ছেন।
পরদিন রাত
পরের রাতে রাজচন্দ্রবাবু আবার আংটিটি নিয়ে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এইবার তিনি দরজা বন্ধ করে আংটি পরলেন। আবার অদৃশ্য।
তিনি ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে হাঁটলেন। নিজের শরীর দেখতে পাচ্ছেন না, কিন্তু সবকিছু স্পষ্ট অনুভব করতে পারছেন।
তিনি জানালার কাছে গেলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল দরজার দিকে। দরজায় বসানো একটি পুরোনো নীল রঙের কাঁচ। সেটি জমিদারবাড়ির পুরোনো নকশার অংশ। বাইরে থেকে আলো ঢোকার জন্য দরজার উপরের অংশে সেই নীল কাঁচ লাগানো ছিল।
রাজচন্দ্রবাবু কৌতূহলবশত সেই কাঁচের সামনে দাঁড়ালেন। আর তখনই ঘটল আশ্চর্য ঘটনা।
কাঁচের ওপারে তাঁর অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যাচ্ছে!
তিনি হতভম্ব। তিনি একটু ডান দিকে গেলেন। অবয়বটিও ডান দিকে গেল। বাঁ দিকে গেলেন। অবয়বটিও বাঁ দিকে গেল।
রাজচন্দ্রবাবু ফিসফিস করে বললেন,
—“অদ্ভুত!”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন—
সাধারণ আলোয় তিনি অদৃশ্য, কিন্তু এই নীল কাঁচের মধ্য দিয়ে তাঁকে দেখা যাচ্ছে!
রানী এবার সত্যিই তাঁকে দেখলেন
ঠিক সেই সময় রানী আবার তাঁর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
—“রাজচন্দ্র?”
কোনো উত্তর নেই। তিনি দরজা খুলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ নীল কাঁচের মধ্য দিয়ে ভিতরে তাকিয়ে থমকে গেলেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন—ঘরের মধ্যে রাজচন্দ্রবাবু দাঁড়িয়ে আছেন!
রানী অবাক হয়ে বললেন,
—“তুমি ভিতরে দাঁড়িয়ে আছ, অথচ দরজা খুললে তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?”
রাজচন্দ্রবাবু তখন বুঝলেন, রানী তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন। তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।
রানী দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন।
—“রাজচন্দ্র?”
কেউ নেই।
রানী চারদিকে তাকালেন।
—“এ কী কাণ্ড!”
তিনি আবার দরজার বাইরে বেরিয়ে নীল কাঁচের দিকে তাকালেন। আবার রাজচন্দ্রবাবুকে দেখা গেল!
রানী এবার একটু ভয় পেয়ে বললেন,
—“আমি তো তোমাকে এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি!”
অদৃশ্য রাজচন্দ্রবাবু এবার হেসে ফেললেন।
—“কারণ তুমি নীল কাঁচের মধ্য দিয়ে দেখছ।”
রানী চমকে উঠলেন।
—“তুমি সত্যিই এখানে আছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“কিন্তু আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না!”
—“এই আংটির কারণেই।”
রানী বুঝতে পারলেন, মাছের পেট থেকে পাওয়া আংটির মধ্যেই রহস্য লুকিয়ে আছে।
নীল আলো
রানী বললেন,
—“আর কোনোভাবে তোমাকে দেখা যায়?”
রাজচন্দ্রবাবু ভাবলেন। তারপর ঘরের একটি পুরোনো নীল কাচের বাতি জ্বালালেন। ঘরটি নীল আলোয় ভরে গেল।
আর আশ্চর্য! রানী এবার ঘরের ভিতর থেকেই তাঁর স্বামীকে দেখতে পেলেন।
রাজচন্দ্রবাবু বললেন,
—“তাহলে নিয়মটা বুঝলাম।”
রানী ধীরে ধীরে বললেন,
—“সাধারণ আলোয় তুমি অদৃশ্য। কিন্তু নীল কাঁচের মধ্য দিয়ে বা নীল আলোয় তোমাকে দেখা যায়।”
রাজচন্দ্রবাবু মাথা নাড়লেন।
—“হ্যাঁ। আর এই কথাটা আমাদের দুজনের মধ্যেই থাকবে।”
রানী বললেন,
—“কাউকে বলব না।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইলেন। তারপর রানী মৃদু হেসে বললেন,
—“তবে একটা কথা বলি?”
—“কী?”
—“এতদিন জমিদারবাড়ির সব চোরকে খুঁজে বেড়াতে লোক লাগত। এখন থেকে তোমাকেই কাজে লাগানো যাবে!”
রাজচন্দ্রবাবু হেসে ফেললেন।
—“তুমি তো দেখছি আমাকে জমিদার থেকে গুপ্তচর বানিয়ে দিলে!”
রানী বললেন,
—“গুপ্তচর নয়। নিজের রাজ্যের সত্য জানার মানুষ।”
রানীর কথায় রাজচন্দ্রবাবু আর হাসলেন না। তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন,
—“ঠিক বলেছ।”
তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। দূরে তাঁর জমিদারির অসংখ্য গ্রাম। কোথাও কৃষকের ঘর। কোথাও বাজার। কোথাও তাঁর কর্মচারীদের কুঠি।
তিনি এতদিন দরবারে বসে যে খবর পেয়েছেন, তার সবটাই কি সত্য? হয়তো নয়।
রাজচন্দ্রবাবু আংটির দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—“কাল রাত থেকে আমি নিজেই দেখব—আমার রাজ্যে সত্যিই কী ঘটছে।”
রানী তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“সাবধানে যেও।”
রাজচন্দ্রবাবু মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
—“আমাকে তো কেউ দেখতেই পাবে না।”
রানী বললেন,
—“তবু মনে রেখো—অদৃশ্য হওয়া সহজ, কিন্তু অদৃশ্য থেকে সত্যের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়।”
রাজচন্দ্রবাবু কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু আংটিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি জানতেন না—
এই আংটি তাঁকে খুব শিগগির এমন সব সত্য দেখাবে, যা জানার পর তাঁর নিজের জমিদারির অনেক পরিচিত মুখই আর আগের মতো পরিচিত থাকবে না।
চলবে...
পর্ব ৩ : অদৃশ্য জমিদার
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
পরদিন রাত।
জমিদারবাড়ির সব আলো একে একে নিভে গেছে। প্রহরীরা নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে গভীর নীরবতা।
রাজচন্দ্র রায় তাঁর ঘরে বসে আছেন। টেবিলের ওপর সেই হীরের আংটি। পাশে একটি ছোট লণ্ঠন।
রানী হেমাঙ্গিনী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন,
—“সব কথা মনে আছে তো?”
রাজচন্দ্র হেসে বললেন,
—“আংটি পরে বেরোব, কাউকে জানাব না আমি কোথায় যাচ্ছি, আর বিপদ দেখলে নায়ক হওয়ার চেষ্টা করব না।”
রানী বললেন,
—“শেষ কথাটাই সবচেয়ে জরুরি।”
রাজচন্দ্র আংটিটি আঙুলে পরলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর শরীর অদৃশ্য হয়ে গেল।
রানী নীল আলো জ্বেলে শেষবারের মতো তাঁকে দেখে নিলেন।
—“ফিরে এসো।”
অদৃশ্য রাজচন্দ্রের কণ্ঠ শোনা গেল,
—“অবশ্যই।”
দরজা খুলল। তারপর বন্ধ হয়ে গেল। কেউ বুঝল না, জমিদারবাবু কখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
প্রথম গন্তব্য
সেদিন রাজচন্দ্রবাবু ঠিক করলেন, প্রথমে যাবেন তাঁর জমিদারির সবচেয়ে দূরের গ্রাম শালবনপুরে।
দিনের বেলায় সেখানে যাওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন। জমিদারবাবু গেলেই লোকজন ভিড় করে, সবাই নিজের নিজের সমস্যার কথা বলতে শুরু করে।
কিন্তু আজ তিনি অদৃশ্য।
ঘোড়ায় চড়ে কিছুটা পথ যাওয়ার পর ঘোড়াটি গ্রামের কাছে পৌঁছতেই রাজচন্দ্র নেমে পড়লেন।
তিনি ভাবলেন,
“ঘোড়াটাকে নিয়ে গেলে মানুষ না দেখলেও ঘোড়াটাকে তো দেখবে!”
তাই ঘোড়াটিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে তিনি পায়ে হেঁটে গ্রামের দিকে গেলেন।
কৃষকের উঠোনে
একটি কুঁড়েঘরের সামনে কয়েকজন কৃষক বসে কথা বলছিল।
একজন বলল,
—“এ বছর ধান ভালো হয়েছে। কিন্তু খাজনা দিতে গিয়ে ঘরে চাল থাকবে তো?”
অন্যজন বলল,
—“জমিদারবাবু নাকি খাজনা কমানোর কথা বলেছেন।”
প্রথমজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“জমিদারবাবু বলেছেন ঠিকই। কিন্তু কুঠির গোমস্তা শুনছে কোথায়?”
রাজচন্দ্র থমকে গেলেন।
গোমস্তা?
তিনি এতদিন ভেবেছিলেন, তাঁর আদেশ ঠিকমতোই পালন হচ্ছে।
কৃষকটি আবার বলল,
—“আমাদের কাছ থেকে গতবারও বাড়তি টাকা নিয়েছে।”
রাজচন্দ্রের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি কিছু বললেন না। মনে মনে শুধু বললেন,
—“কালই হিসাব দেখতে হবে।”
একেবারে উল্টো ছবিও আছে
সেই গ্রামেরই অন্য প্রান্তে তিনি দেখলেন এক বৃদ্ধ কৃষক অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন। তার ঘরে খাবার নেই।
কিছুক্ষণ পর জমিদারবাড়ির এক কর্মচারী সেখানে এসে চালের বস্তা রেখে বলল,
—“জমিদারবাবু বলেছেন, যতদিন না তুমি সুস্থ হচ্ছ, তোমার খাজনা নিয়ে কেউ কিছু বলবে না।”
বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন,
—“বাবাকে আমার আশীর্বাদ দিও।”
কর্মচারী চলে গেল। রাজচন্দ্র চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তিনি বুঝলেন, সব কর্মচারী খারাপ নয়। কেউ তাঁর আদেশ পালন করছে। কেউ আবার নিজের স্বার্থে তাঁর নাম ব্যবহার করছে।
মানুষের আসল চেহারা বুঝতে হলে সামনে থেকে নয়, পিছন থেকে দেখতে হয়।
বাজারের মজার ঘটনা
রাত আরও একটু বাড়লে রাজচন্দ্র বাজারের দিকে গেলেন।
এক দোকানের সামনে দুজন লোক ঝগড়া করছে।
একজন বলছে,
—“তুই আমার কাছ থেকে এক টাকা বেশি নিয়েছিস!”
দোকানি বলল,
—“আমি নেব কেন?”
—“কারণ আমি দিয়েছি দুই টাকা!”
—“তুই দিয়েছিস এক টাকা!”
—“দুই টাকা!”
রাজচন্দ্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছেন।
শেষে দোকানি রাগ করে বলল,
—“ঠিক আছে, তুই যদি দুই টাকা দিয়ে থাকিস, তাহলে আরেক টাকা কোথায়?”
লোকটি পকেট হাতড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“ওটা... সেটা আমি এখনও দিইনি!”
দোকানি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
অদৃশ্য রাজচন্দ্র এত জোরে হেসে ফেললেন যে দুজনেই চমকে চারদিকে তাকাল।
—“কে হাসল?”
কেউ উত্তর দিল না। দুজনেই ভয় পেয়ে দোকান বন্ধ করে চলে গেল।
রাজচন্দ্র হাসতে হাসতে বললেন,
—“অদৃশ্য হওয়ারও কিছু সুবিধা আছে!”
কিন্তু রাতের শেষে এল অস্বস্তিকর খবর
ফেরার পথে রাজচন্দ্র একটি পুরোনো কুঠির কাছে থামলেন। ভিতরে কয়েকজন লোক বসে নিচু গলায় কথা বলছে।
তিনি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
একজন বলল,
—“জমিদারবাবু নাকি সবকিছু জানতে শুরু করেছেন।”
আরেকজন বলল,
—“অসম্ভব। কে তাঁকে খবর দেবে?”
প্রথমজন বলল,
—“খবর কোথা থেকে আসছে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, গত মাসের হিসাব নিয়ে তিনি যে প্রশ্ন করেছেন, সেটা সাধারণ প্রশ্ন নয়।”
তৃতীয় একজন বলল,
—“তাহলে সাবধান হও। কেউ হয়তো আমাদের ওপর নজর রাখছে।”
রাজচন্দ্রের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
কেউ কি তাঁর অদৃশ্য হওয়ার ব্যাপার বুঝতে পেরেছে?
তিনি আরও কাছে গেলেন। কিন্তু তার আগেই ভিতরের একজন জানালা বন্ধ করে দিল। রাজচন্দ্র আর কিছু শুনতে পেলেন না।
অদৃশ্য অতিথির ছায়া
পরদিনও তিনি বেরোলেন। এইভাবে কয়েক রাত ধরে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে লাগলেন।
কোথাও প্রজাদের দুঃখ দেখলেন। কোথাও কর্মচারীদের সততা দেখলেন। কোথাও চোরাচালানের খবর পেলেন। আবার কোথাও দেখলেন, তাঁর নামে মিথ্যা আদেশ দেখিয়ে গরিব মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে।
প্রতিদিন ফিরে এসে তিনি রানীকে সব বলতেন। তবে রানী ছাড়া আর কেউ কিছু জানত না।
এক রাতে রানী বললেন,
—“তুমি যেসব কথা জানতে পারছ, সেগুলো তো জমিদারবাড়ির কারও জানার কথা নয়।”
রাজচন্দ্র বললেন,
—“সেটাই তো সমস্যা।”
—“কেন?”
—“আমি যত বেশি জানতে পারছি, তত বেশি মানুষকে সন্দেহ করতে হচ্ছে।”
রানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“তাহলে সাবধানে থেকো। কারণ তুমি অদৃশ্য হতে পারো, কিন্তু তোমার শত্রুরা অদৃশ্য নয়।”
রাজচন্দ্র মৃদু হেসে বললেন,
—“তুমি আবার চিন্তা করছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমার তো আংটি আছে।”
রানী বললেন,
—“আংটি তোমাকে চোখের আড়াল করতে পারে। কিন্তু বিপদকে নয়।”
রাজচন্দ্র এবার আর হাসলেন না।
ভিন রাজ্যের নজর
কয়েকদিন পর, জমিদারির সীমান্তের একটি সরাইখানায় দুই অপরিচিত লোক এসে উঠল।
তাদের পোশাক সাধারণ ব্যবসায়ীর মতো। কিন্তু তাদের চোখে ব্যবসায়ীর স্বাভাবিক কৌতূহল ছিল না।
রাতে তারা দরজা বন্ধ করে কথা বলছিল।
একজন বলল,
—“খবরগুলো মিলছে।”
অন্যজন জিজ্ঞেস করল,
—“নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ। জমিদার এমন কিছু ঘটনা জানছেন, যা তাঁর কাছে পৌঁছানোর কোনো পথ নেই।”
—“তাহলে?”
প্রথম লোকটি ধীরে ধীরে বলল,
—“আমার ধারণা, তাঁর কাছে এমন কোনো বস্তু আছে, যার সাহায্যে তিনি অদৃশ্য হয়ে সবকিছু দেখতে পান।”
দ্বিতীয় লোকটি চমকে উঠল।
—“অদৃশ্য?”
প্রথম লোকটি বলল,
—“এখনও নিশ্চিত নই। কিন্তু যদি সত্যি হয়...”
সে বাক্য শেষ করল না। দুজনেই চুপ করে গেল।
জানালার বাইরে তখন অন্ধকার রাত।
আর সেই অন্ধকারের মধ্যেই, বহু দূরে, অদৃশ্য রাজচন্দ্র দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি তাদের কথা শুনতে পাননি।
তিনি জানতেনও না—
তাঁর গোপন আংটির খবর এবার তাঁর নিজের রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে অন্য রাজ্যে পৌঁছে গেছে।
আর এই খবরের পরেই শুরু হবে এক নতুন বিপদ।
চলবে...
পর্ব ৪ : গুপ্তচরদের ছায়া
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
সেই রাতের পর থেকে জমিদারবাড়ির চারপাশে যেন অদৃশ্য কোনো ছায়া ঘুরে বেড়াতে লাগল।
রাজচন্দ্র রায় অবশ্য কিছুই বুঝতে পারলেন না।
আগের মতোই তিনি রাতে আংটি পরে বেরোতেন। কখনো গ্রামের হাটে, কখনো নদীর ঘাটে, কখনো জমিদারির দূরের কুঠিতে।
কিন্তু তিনি জানতেন না—কেউ একজন তাঁকে অনুসরণ করছে।
সন্দেহের শুরু
ভিন রাজ্য থেকে আসা সেই দুই গুপ্তচর নিজেদের নাম দিয়েছিল মাধব ও কেশব।
তারা ব্যবসায়ীর বেশে কয়েকদিন ধরে জমিদারির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—
জমিদারবাবু কীভাবে এমন সব খবর জানতে পারছেন?
এক সন্ধ্যায় তারা একটি চায়ের দোকানে বসে ছিল।
মাধব বলল,
—“আজ আবার জমিদারবাবু এমন একটা আদেশ দিয়েছেন, যা গত রাতের ঘটনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।”
কেশব বলল,
—“কিন্তু খবরটা তাঁকে কে দিল?”
—“কেউ না।”
—“তাহলে?”
মাধব চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
—“আমার ধারণা, তিনি নিজেই সব দেখেছেন।”
কেশব হেসে বলল,
—“একজন জমিদার কি রাতের অন্ধকারে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে পারেন?”
মাধব বলল,
—“মানুষ হলে পারেন না।”
কেশবের হাসি থেমে গেল।
—“তুমি বলতে চাইছ...”
—“হ্যাঁ। আমি মনে করি, আমাদের খুঁজে বের করতে হবে তিনি কীভাবে অদৃশ্য হন।”
একটি ভুল
সেই রাতে রাজচন্দ্রবাবু একটি গ্রামের গুদামে গিয়েছিলেন। তিনি শুনেছিলেন, সেখানে গোপনে প্রজাদের ধান কম দামে কিনে নেওয়া হচ্ছে।
অদৃশ্য অবস্থায় তিনি সব শুনলেন। দুজন কর্মচারী হিসাব নিয়ে কথা বলছিল।
একজন বলল,
—“জমিদারবাবু সব জানতে পারছেন কী করে?”
অন্যজন বলল,
—“জানি না। তবে সাবধান থাকতে হবে।”
ঠিক তখন রাজচন্দ্রের পায়ের নিচে একটি শুকনো বাঁশ ভেঙে গেল।
মট্!
দুজন লোক চমকে উঠল।
—“কে?”
কেউ উত্তর দিল না। একজন লণ্ঠন নিয়ে চারদিকে তাকাল।
রাজচন্দ্র নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। লোকটি কিছু দেখতে পেল না।
—“বিড়াল হবে।”
সে চলে গেল। রাজচন্দ্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
কিন্তু তিনি জানতেন না, গুদামের বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মানুষ সবকিছু লক্ষ্য করেছে। সে মাধব।
গুপ্তচরের নতুন সূত্র
মাধব পরদিন কেশবকে বলল,
—“আমি দেখেছি।”
—“কী?”
—“গুদামের দরজা বন্ধ ছিল। ভিতরে কেউ ছিল না। তারপরও বাঁশ ভাঙার শব্দ হলো।”
কেশব বলল,
—“তুমি কি কাউকে দেখেছ?”
—“না।”
—“তাহলে?”
মাধব ধীরে ধীরে বলল,
—“কাউকে দেখা যায়নি—এইটাই তো সমস্যা।”
কেশব এবার আর হাসল না।
আংটির খবর
কয়েকদিনের অনুসন্ধানের পর তারা জানতে পারল, অন্নপ্রাশনের দিন বিশাল এক কাতলা মাছের পেট থেকে একটি হীরের আংটি পাওয়া গিয়েছিল।
মাধবের চোখ চকচক করে উঠল।
—“আংটিটি এখন কোথায়?”
কেশব বলল,
—“জমিদারবাবুর কাছে।”
—“তাহলে সব মিলছে।”
—“কীভাবে?”
মাধব বলল,
—“আংটি পাওয়ার পর থেকেই তাঁর আচরণ বদলেছে। আর তারপর থেকেই তিনি এমন সব ঘটনা জানতে শুরু করেছেন, যা তাঁর জানার কথা নয়।”
কেশব বলল,
—“কিন্তু আংটি মানুষকে অদৃশ্য করে—এটা আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব?”
মাধব উত্তর দিল,
—“নিশ্চিত হব।”
নীল কাঁচের কথা
গুপ্তচররা জমিদারবাড়ির নকশা সংগ্রহ করতে শুরু করল। তারা জানতে পারল, জমিদারবাবুর ঘরের দরজায় পুরোনো নীল কাঁচ বসানো রয়েছে।
মাধব বলল,
—“এটারও কোনো কারণ আছে নিশ্চয়ই।”
কেশব বলল,
—“একটা পুরোনো বাড়িতে নীল কাঁচ থাকতেই পারে।”
মাধব মাথা নাড়ল।
—“হয়তো। কিন্তু কাকতালীয় ঘটনা যত বাড়ে, সন্দেহও তত বাড়ে।”
রানীর দিকে নজর
গুপ্তচররা বুঝল, জমিদারবাবুকে সরাসরি অনুসরণ করে আংটির রহস্য জানা কঠিন। কারণ তিনি কখন কোথায় যান, কেউ জানে না।
তাই তারা অন্য পথ বেছে নিল।
রানী হেমাঙ্গিনী।
তাঁর ওপর নজর রাখা শুরু হলো।
একদিন সন্ধ্যায় রানী বাগানে হাঁটছিলেন। দূরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে মাধব তাঁকে দেখছিল।
রানী হঠাৎ থেমে গেলেন। কেন যেন তাঁর মনে হলো, কেউ তাঁকে দেখছে। তিনি চারদিকে তাকালেন। কেউ নেই।
কিন্তু তাঁর চোখ গিয়ে থামল বাগানের শেষ প্রান্তের একটি গাছের দিকে। মাধব তখন গাছের আড়ালে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে।
রানী কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন।
মাধব ফিসফিস করে বলল,
—“সন্দেহ করছে।”
রাজচন্দ্রের ভুল ধারণা
সেদিন রাতে রাজচন্দ্রবাবু আংটি পরে বাড়ির বাইরে বেরোতে যাচ্ছিলেন।
রানী তাঁকে বললেন,
—“আজ যেও না।”
—“কেন?”
—“কিছু একটা ঠিক মনে হচ্ছে না।”
রাজচন্দ্র হেসে বললেন,
—“তুমি অকারণে চিন্তা করছ।”
—“আমি জানি না কেন, কিন্তু মনে হচ্ছে কেউ আমাদের ওপর নজর রাখছে।”
রাজচন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
—“আমি অদৃশ্য থাকি। আমাকে কেউ দেখতে পাবে না।”
রানী বললেন,
—“তোমাকে না পেলেও, তোমার রহস্যকে তো খুঁজে পেতে পারে।”
কথাটি রাজচন্দ্রের মনে দাগ কাটল। তবু তিনি সেদিন বেরিয়ে গেলেন।
ভয়ংকর পরিকল্পনা
পরদিন গভীর রাতে মাধব ও কেশব একটি নির্জন ঘরে বসে ছিল।
কেশব বলল,
—“আংটিটি যদি সত্যিই জমিদারবাবুর কাছে থাকে, তাহলে সেটা পাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মাধব বলল,
—“জমিদারকে ধরে আংটি নেওয়া সহজ হবে না।”
—“তাহলে?”
মাধব ধীরে ধীরে বলল,
—“যাকে তিনি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন, তাকে ধরতে হবে।”
কেশব বুঝে গেল।
—“রানী?”
মাধব মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
কেশব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“তাহলে জমিদার নিজেই আংটি নিয়ে আমাদের কাছে আসবেন।”
মাধবের ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটল।
—“ঠিক তাই।”
সেই রাতেই জমিদারবাড়ির বাইরে অন্ধকারে কয়েকটি ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে এগিয়ে এল।
কেউ জানত না তারা কারা। প্রহরীরা কিছুই টের পেল না।
আর জমিদারবাবু তখন তাঁর ঘরে বসে আংটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। রানী পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছেন।
রাজচন্দ্র আংটিটি হাতে নিয়ে ভাবলেন—
—“এই আংটির সাহায্যে আমি এত সত্য জেনেছি। কিন্তু এই সত্যের জন্য কি আমার নিজের পরিবার বিপদে পড়ছে?”
তিনি জানতেন না—
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সংবাদটি অপেক্ষা করছে।
রানী নেই।
চলবে...
পর্ব ৫ : রানী বন্দি
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
ভোরের আলো তখন সবে জমিদারবাড়ির জানালায় এসে পড়েছে।
রাজচন্দ্র রায়ের ঘুম ভাঙল প্রাসাদের বাইরে অস্বাভাবিক কোলাহলে। তিনি উঠে বসতেই দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হলো।
—“জমিদারবাবু!”
বাইরে প্রহরীর কাঁপা গলা।
রাজচন্দ্র দরজা খুলে দিলেন। প্রহরী হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—“বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে!”
—“কী হয়েছে?”
প্রহরী মাথা নিচু করে বলল,
—“রানীমা... রানীমাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।”
রাজচন্দ্রের মুখ মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল।
—“কী বলছ?”
—“ভোরে তাঁর দাসী ঘরে গিয়ে দেখে দরজা খোলা। বিছানা খালি। জানালার পাশে একটা কাপড় পড়ে ছিল।”
রাজচন্দ্র ছুটে রানীর ঘরে গেলেন। ঘরটি এলোমেলো নয়। কোনো জোর করে ঢোকার চিহ্ন নেই। শুধু জানালার কাছে পড়ে আছে রানীর ওড়নার এক টুকরো।
রাজচন্দ্র সেটি হাতে তুলে নিলেন। তাঁর বুকের মধ্যে অজানা আশঙ্কা জমে উঠল।
একটি চিঠি
ঠিক তখনই তাঁর নজরে পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটি ছোট্ট কাগজ। তিনি কাগজটি খুললেন। মাত্র কয়েকটি লাইন লেখা—
—“রানী আমাদের কাছে নিরাপদে আছেন। তাঁকে জীবিত ফিরে পেতে চাইলে আজ সূর্য ডোবার আগে হীরের আংটি নিয়ে নদীর পুরোনো ঘাটে আসুন। কাউকে সঙ্গে আনবেন না।”
নিচে কোনো নাম নেই।
রাজচন্দ্র কাগজটি মুঠো করে চেপে ধরলেন।
—“গুপ্তচররা...”
এবার তাঁর আগের সব সন্দেহ একসঙ্গে পরিষ্কার হয়ে গেল। তারা আংটির কথা জেনে গেছে।
রানীর জন্য বার্তা
অন্যদিকে, নদীর ওপারের একটি পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়িতে রানী হেমাঙ্গিনী বন্দি। তাঁর হাত বাঁধা নয়। কিন্তু দরজার বাইরে দুজন পাহারাদার।
রানী শান্তভাবে বসে আছেন।
একজন গুপ্তচর এসে বলল,
—“আপনার স্বামী নিশ্চয়ই আংটি নিয়ে আসবেন।”
রানী বললেন,
—“তোমরা আংটিটা নিয়ে কী করবে?”
—“সেটা আপনার জানার দরকার নেই।”
—“তোমরা কি জানো, এই আংটি যার হাতে থাকবে, সে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে?”
গুপ্তচর একটু থমকে গেল। রানী বুঝলেন, তারা আংটির ক্ষমতা পুরোপুরি জানে না।
তিনি বললেন,
—“তাহলে আংটি পেয়ে কী করবে?”
লোকটি বিরক্ত হয়ে বলল,
—“চুপ করুন।”
রানী মৃদু হেসে বললেন,
—“তোমরা এমন একটা জিনিসের পেছনে ছুটছ, যার আসল রহস্যই তোমরা জানো না।”
গুপ্তচর আর কথা বাড়াল না।
জমিদারবাড়িতে প্রস্তুতি
রাজচন্দ্র একা নিজের ঘরে বসে আংটিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। রানী সবসময় তাঁকে বলতেন—
“অদৃশ্য হওয়া সহজ, কিন্তু অদৃশ্য শক্তির দায়িত্ব বহন করা কঠিন।”
আজ সেই কথাটাই বারবার মনে পড়ছে।
তিনি আংটি নিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন। ঠিক তখন তাঁর মনে পড়ল—
নীল কাঁচ।
যদি তিনি আংটি পরে অদৃশ্য হন, সাধারণ মানুষ তাঁকে দেখতে পাবে না। কিন্তু নীল কাঁচের মাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি ধরা পড়তে পারে।
তাহলে গুপ্তচররা যদি কোনোভাবে এই নিয়ম জেনে থাকে? রাজচন্দ্রের মনে সন্দেহ জাগল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।
একটি ছোট্ট কৌশল
রাজচন্দ্র তাঁর বিশ্বস্ত বৃদ্ধ কর্মচারী গদাধরকে ডেকে বললেন,
—“আমি আজ কিছুক্ষণ বাইরে যাব। কেউ যদি জানতে চায়, বলবে আমি জমিদারির উত্তর দিকের কুঠিতে গেছি।”
গদাধর অবাক হয়ে বলল,
—“কিন্তু আপনি তো—”
রাজচন্দ্র হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।
—“আর কিছু জিজ্ঞাসা করবে না।”
গদাধর বুঝতে পারল, বড় কোনো বিপদ ঘটেছে। কিন্তু সে আর প্রশ্ন করল না।
নদীর পুরোনো ঘাট
সন্ধ্যার আগে আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। নদীর পুরোনো ঘাটটি বহুদিন ব্যবহার হয় না। চারদিকে বড় বড় গাছ। ভাঙা সিঁড়ি নেমে গেছে নদীর জলে।
জায়গাটি যেন বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছে কোনো গোপন ঘটনার জন্য।
রাজচন্দ্র দূর থেকে ঘাটটি দেখলেন। তারপর আংটিটি আঙুলে পরলেন। মুহূর্তেই তিনি অদৃশ্য।
ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু আশ্চর্য! ঘাটে কেউ নেই।
তিনি চারদিকে তাকালেন। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল—
—“আপনি সময়মতোই এসেছেন, জমিদারবাবু।”
রাজচন্দ্র থেমে গেলেন। কণ্ঠটি নদীর ওপারের গাছের আড়াল থেকে আসছে।
—“রানী কোথায়?”
—“তিনি ভালো আছেন।”
—“তাঁকে আমার সামনে আনো।”
—“আগে আংটি।”
রাজচন্দ্র চুপ করে রইলেন।
গাছের আড়াল থেকে লোকটি বেরিয়ে এল। তার হাতে একটি ছোট্ট নীল কাপড়। সে বলল,
—“আপনি অদৃশ্য, আমরা জানি। কিন্তু আমরা এটাও জানি, আপনার স্ত্রীকে আপনি কখনো বিপদে ফেলবেন না।”
রাজচন্দ্রের মুঠো শক্ত হয়ে গেল।
লোকটি বলল,
—“আংটিটি দিন। তারপর রানীকে নিয়ে যান।”
—“আর যদি না দিই?”
লোকটি নদীর ওপারের দিকে ইশারা করল। দূরে একটি ছোট নৌকা দেখা গেল। নৌকার মধ্যে বসে আছেন রানী।
রাজচন্দ্রের বুক কেঁপে উঠল। রানীও তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন না। তবু যেন বুঝতে পারলেন, তাঁর স্বামী কাছেই আছেন।
তিনি মাথা উঁচু করে বললেন,
—“রাজচন্দ্র, সাবধানে!”
রাজচন্দ্র কিছু বলতে গেলেন। কিন্তু নিজেকে থামালেন। এখন কোনো আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
শেষ পরীক্ষা
গুপ্তচর বলল,
—“আগামী এক মুহূর্তের মধ্যে আংটি না দিলে নৌকাটি নদীর মাঝখানে চলে যাবে।”
রাজচন্দ্র নদীর দিকে তাকালেন। তারপর নিজের আঙুলের দিকে। হীরের আংটিটি অন্ধকারেও ঝিকমিক করছে।
একদিকে তাঁর বহুদিনের গোপন শক্তি। অন্যদিকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।
তিনি ধীরে ধীরে আংটিটি আঙুল থেকে খুললেন।
গুপ্তচরের চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
—“এবার সেটা আমার হাতে দিন।”
রাজচন্দ্র আংটিটি মুঠোর মধ্যে রাখলেন। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন—
—“তোমরা আংটিটা চেয়েছ।”
—“হ্যাঁ।”
—“কিন্তু তোমরা জানো না, আংটির মালিক হওয়া আর আংটির দাস হওয়ার মধ্যে কতটা পার্থক্য।”
গুপ্তচর ভ্রু কুঁচকাল।
রাজচন্দ্র এক পা নদীর দিকে এগোলেন।
আগামী মুহূর্তে তিনি কী করবেন?
গুপ্তচররা জানে না। রানী জানেন না। শুধু রাজচন্দ্র জানেন—
এই রাতেই হীরের আংটির ভাগ্য চিরদিনের জন্য বদলে যেতে চলেছে।
চলবে...
পর্ব ৬ : নদীর জলে হীরের আংটি
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
নদীর ধারে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
আকাশের শেষ আলোটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমে কালো মেঘ জমেছে। নদীর জল অন্ধকারে আরও গভীর ও রহস্যময় দেখাচ্ছে।
রাজচন্দ্র রায় নদীর ধারে দাঁড়িয়ে। তিনি অদৃশ্য। তাঁর মুঠোর মধ্যে সেই হীরের আংটি। আর নদীর ওপারে একটি নৌকায় বন্দি রানী হেমাঙ্গিনী।
গুপ্তচরদের নেতা আবার চিৎকার করে বলল,
—“আংটিটা আমাদের হাতে দিন!”
রাজচন্দ্র কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এই আংটির জন্যই তিনি গত কয়েক সপ্তাহে অদৃশ্য হয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন। মানুষের আসল চেহারা দেখেছেন। অন্যায় দেখেছেন, ভালোবাসা দেখেছেন, বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছেন।
আবার এই আংটির কারণেই আজ তাঁর রানী বন্দি।
তাঁর মনে পড়ল রানীর কথা—
“অদৃশ্য হওয়া সহজ, কিন্তু অদৃশ্য শক্তির দায়িত্ব বহন করা কঠিন।”
হঠাৎ নৌকা থেকে রানীর কণ্ঠ ভেসে এল,
—“রাজচন্দ্র!”
তিনি চমকে উঠলেন। রানী তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন না, তবু যেন বুঝতে পেরেছেন তাঁর স্বামী কাছেই।
—“আমার জন্য আংটিটা দিও না!”
গুপ্তচর রেগে বলল,
—“চুপ!”
রানী এবার শান্ত গলায় বললেন,
—“তুমি যদি আংটিটা দিয়ে দাও, ওরা তোমাকে আর আমাকে দুজনকেই বিপদে ফেলতে পারে। তুমি যা ঠিক মনে করো, তাই করো।”
রাজচন্দ্রের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি বুঝলেন, রানী তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা করছেন।
গুপ্তচরদের শেষ সতর্কতা
গুপ্তচর নেতা নদীর ধারে এগিয়ে এসে বলল,
—“শেষবার বলছি। আংটিটি দিন।”
রাজচন্দ্র ধীরে ধীরে তাঁর মুঠো খুললেন। চাঁদের আলোয় হীরেটি ঝলমল করে উঠল।
গুপ্তচরদের চোখ সেই আংটির ওপর স্থির হয়ে গেল।
—“হ্যাঁ... এবার কাছে আসুন।”
রাজচন্দ্র আংটিটি হাতে নিয়ে এক পা এগোলেন। তারপর আরেক পা।
গুপ্তচর নেতা হাত বাড়িয়ে দিল।
—“দিন।”
রাজচন্দ্র এবার হেসে বললেন,
—“তোমরা সত্যিই ভেবেছ, আমি এটা তোমাদের হাতে তুলে দেব?”
গুপ্তচর হতভম্ব।
—“কী বললেন?”
—“তোমরা আমাকে অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারো। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত কেড়ে নিতে পারবে না।”
গুপ্তচর চিৎকার করে উঠল,
—“আংটি দিন!”
রাজচন্দ্র এবার নদীর দিকে ফিরে দাঁড়ালেন।
একটি মুহূর্ত
নদীর জল তখন প্রবল স্রোতে বয়ে চলেছে। রাজচন্দ্র আংটিটির দিকে শেষবার তাকালেন।
হীরের ঝিলিক যেন তাঁর চোখে বহু দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনল।
প্রথম দিন— অন্নপ্রাশনের আনন্দ। বিশাল কাতলা মাছ। মাছের পেট থেকে আংটি বেরিয়ে আসা।
তারপর নিজের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। রানীর বিস্মিত মুখ। নীল কাঁচের মধ্য দিয়ে তাঁকে দেখা। নীল আলোয় তাঁর শরীর আবার দৃশ্যমান হওয়া।
তারপর অসংখ্য রাত। অন্ধকার পথে একা একা ঘুরে বেড়ানো। মানুষের সুখ-দুঃখ দেখা।
এই আংটি তাঁকে এমন এক চোখ দিয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের ছিল না।
কিন্তু আজ তিনি বুঝলেন—
সবকিছু দেখতে পাওয়ার ক্ষমতার চেয়েও প্রিয় একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা।
তিনি মৃদু স্বরে বললেন,
—“বিদায়।”
তারপর—
ছুড়ে দিলেন আংটিটি নদীর গভীর জলে।
রাজচন্দ্র নদীর জলে ছুড়ে দিলেন হীরের আংটি — পর্ব ৬
ছপাৎ!
একটি ছোট্ট শব্দ। তারপর আর কিছু নেই। হীরের আংটি অন্ধকার নদীর বুকে হারিয়ে গেল।
গুপ্তচরদের হতাশা
—“না!”
গুপ্তচর নেতা পাগলের মতো নদীর দিকে ছুটে গেল। সে জলে নেমে আংটিটি খুঁজতে লাগল। তার সঙ্গীরাও জলে নামল।
কেউ ডুব দিল। কেউ হাতে করে নদীর তল খুঁজতে লাগল। কিন্তু নদী তখন নিজের গতিতে বয়ে চলেছে। আংটির কোনো চিহ্ন নেই।
গুপ্তচর নেতা রাগে চিৎকার করল,
—“তুমি কী করলে!”
রাজচন্দ্র শান্ত গলায় বললেন,
—“যে জিনিস মানুষের মধ্যে লোভ আর হিংসা বাড়ায়, তার পৃথিবীতে না থাকাই ভালো।”
গুপ্তচর তাঁর দিকে ছুটে আসতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ তখনও রাজচন্দ্র অদৃশ্য। সে জানে না, তিনি কোথায়।
রানীর মুক্তি
আংটি আর নেই বুঝতে পেরে গুপ্তচরদের পরিকল্পনা ভেঙে পড়ল। তাদের কাছে এখন রানীকে বন্দি করে রাখার কোনো অর্থ নেই।
কিছুক্ষণ পর তাঁকে নৌকা থেকে নামিয়ে দেওয়া হলো।
রানী নদীর ঘাটে পা রাখতেই রাজচন্দ্র তাঁর কাছে এগিয়ে গেলেন। তিনি এখনও অদৃশ্য।
রানী চারদিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—“তুমি কি এখনও এখানে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আংটিটা?”
রাজচন্দ্র নদীর দিকে তাকালেন।
—“নেই।”
রানী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
—“তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে?”
রাজচন্দ্র দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“হচ্ছে। মনে হচ্ছে, একটা অদ্ভুত ক্ষমতাকে নিজের হাতে হারিয়ে ফেললাম।”
রানী বললেন,
—“তুমি ক্ষমতা হারাওনি।”
—“তাহলে?”
—“তুমি ক্ষমতার ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রমাণ করেছ।”
রাজচন্দ্র কিছু বললেন না। রানী আবার বললেন,
—“চলো, বাড়ি ফিরি।”
শেষবার নীল আলো
সেই রাতেই তাঁরা জমিদারবাড়িতে ফিরে এলেন।
রাজচন্দ্র তাঁর ঘরে ঢুকে দাঁড়ালেন। আংটি আর নেই। তবু তিনি অদৃশ্যই রয়ে গেছেন।
রানী ঘরের সেই পুরোনো নীল বাতিটি জ্বালালেন। নীল আলোয় ধীরে ধীরে রাজচন্দ্রের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রানী তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—“আজ শেষবার তোমাকে এই নীল আলোয় দেখছি।”
রাজচন্দ্র বললেন,
—“হয়তো এটাই ভালো।”
—“কেন?”
—“কারণ এখন থেকে আমাকে সত্য জানার জন্য অদৃশ্য হতে হবে না।”
রানী অবাক হয়ে তাকালেন।
রাজচন্দ্র বললেন,
—“আমি মানুষের কাছে যাব। তাদের কথা শুনব। নিজের চোখে দেখব। আর যদি আমার কোনো কর্মচারী অন্যায় করে, তাকে শাস্তি দেব।”
রানী বললেন,
—“তাহলে আংটিটা তোমাকে একটা শিক্ষা দিয়েই গেল।”
—“কী শিক্ষা?”
রানী মৃদু হেসে বললেন,
—“মানুষকে দেখতে চোখ লাগে। কিন্তু মানুষকে বুঝতে লাগে মন।”
রাজচন্দ্রও হাসলেন।
বহুদিন পরে... 🌊
বছর কেটে গেল।
জমিদারবাড়ির সেই অন্নপ্রাশনের ঘটনা ধীরে ধীরে লোকের মুখে গল্প হয়ে গেল।
কেউ বলত, মাছের পেট থেকে পাওয়া আংটি নাকি অভিশপ্ত ছিল। কেউ বলত, সেটি কোনো রাজপরিবারের হারানো সম্পদ। আবার কেউ বলত, আংটিটি এখনও নদীর তলায় আছে।
কিন্তু সত্যিটা জানতেন মাত্র দুজন—রাজচন্দ্র রায় এবং রানী হেমাঙ্গিনী।
আর নদী? সে তো সব জানত।
সেই রাতের পর বহু বর্ষা এসেছে, বহুবার নদীর জল বেড়েছে, আবার কমেছে। কিন্তু নদীর গভীরে কোথাও লুকিয়ে রইল সেই রহস্যময় হীরের আংটি।
যে আংটি একজন মানুষকে অদৃশ্য করতে পারত।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আংটিই একজন মানুষকে শিখিয়েছিল—
ক্ষমতা দিয়ে সবাইকে দেখা যায়, কিন্তু ভালোবাসা দিয়েই সত্যিকারের মানুষকে দেখা যায়।
💎 সমাপ্ত 🌊
গল্পটি সম্পূর্ণ — পর্ব ১ থেকে ৬ পর্যন্ত সবটাই এখন পড়া যাবে 💎