কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি
বাংলা ধারাবাহিক গল্প · ৬টি পর্ব

কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি

পর্ব ১ : জমিদারবাড়ির অন্নপ্রাশন

সব পর্ব

পর্ব ১ পড়ুন
পর্ব ২ পড়ুন
পর্ব ৩ পড়ুন
পর্ব ৪ পড়ুন
পর্ব ৫ পড়ুন
পর্ব ৬ শেষ পর্ব

পর্ব ১ : জমিদারবাড়ির অন্নপ্রাশন

কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি

সেই সময়ের কথা।

নদীর ধারে বিস্তীর্ণ এক অঞ্চলের জমিদার ছিলেন রাজচন্দ্র রায়। তাঁর জমিদারি খুব বড় না হলেও নামডাক ছিল যথেষ্ট। প্রজাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল বেশ ভালো। কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে জমিদারবাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াতে দ্বিধা করত না।

তবে রাজচন্দ্রবাবুর সবচেয়ে বড় আনন্দের কারণ ছিল তাঁর একমাত্র পুত্র—শশাঙ্ক।

শশাঙ্কের বয়স তখন মাত্র ছয় মাস।

আর সেই ছেলের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে জমিদারবাড়িতে যেন উৎসবের বন্যা বয়ে গেল।

সকাল থেকেই বাড়ির সামনে নহবত বসেছে।

ঢং ঢং ঢং...

শানাইয়ের সুরে চারদিক মুখরিত।

বাড়ির সদর দরজায় আমপাতার মালা, ফুলের তোড়া আর কলাগাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে। উঠোনে বিশাল প্যান্ডেল। একদিকে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, অন্যদিকে রান্নার জন্য বিশাল চুল্লি।

রান্নাঘরের অবস্থা তো দেখলে মনে হয়, একটা ছোটখাটো সেনাবাহিনীকে খাওয়ানো হবে!

কড়াইয়ে ঘি ফুটছে। কোথাও লুচি ভাজা হচ্ছে। কোথাও মাছের ঝোল। কোথাও পোলাও।

আর মিষ্টির তো কোনো হিসাবই নেই। সন্দেশ, রসগোল্লা, লাড্ডু, ক্ষীরকদম—সব একসঙ্গে তৈরি হচ্ছে।

রান্নাঘরের প্রধান রাঁধুনি হরিপদ ঠাকুর ঘামতে ঘামতে চিৎকার করে বললেন,

—“ওরে নিতাই! ওই বড় কড়াইটায় আর একটু ঘি দে! আর শোন, মাছগুলো সাবধানে কাটিস। আজ কিন্তু একটা মাছও নষ্ট হওয়া চলবে না!”

নিতাই দূর থেকে বলল,

—“ঠাকুরমশাই, মাছ তো সব ঠিকঠাকই আছে। শুধু ওই একটা মাছ নিয়ে একটু ভয় হচ্ছে।”

—“কেন?”

—“ওটা মাছ নয়, বোধহয় কুমিরের ছোট ভাই!”

হরিপদ ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন। রান্নাঘরের এক কোণে রাখা রয়েছে বিশাল এক কাতলা মাছ। মাছটির ওজন প্রায় আঠারো কিলোগ্রাম!

তার দিকে তাকিয়ে হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“এটা মাছ নয় রে... এটা একটা সংসার!”

চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।


বিশাল কাতলা

এই কাতলা মাছটি বিশেষভাবে আনা হয়েছিল দূরের এক বড় নদী থেকে। জমিদারবাবুর আদেশ ছিল—

“অন্নপ্রাশনের ভোজে এমন মাছ চাই, যা দেখে অতিথিরা বাড়ি গিয়ে গল্প করবে।”

তাই মাছটিকে সকালেই রান্নাঘরের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। হরিপদ ঠাকুর নিজেই কোমর বেঁধে মাছ কাটতে বসলেন। চারপাশে কয়েকজন সহকারী দাঁড়িয়ে।

হরিপদ ছুরি ধার দিয়ে বললেন,

—“চল, আজ দেখি তোর ভিতরে কী আছে!”

নিতাই মজা করে বলল,

—“ঠাকুরমশাই, এত বড় মাছের ভিতরে যদি আরেকটা মাছ থাকে?”

—“তাহলে সেটাকেও কাটব।”

—“তার ভিতরে যদি আবার একটা মাছ থাকে?”

হরিপদ ছুরি থামিয়ে বললেন,

—“তুই চুপ কর। নইলে তোকে আগে কাটব!”

আবার হাসির শব্দ উঠল।

মাছ কাটার কাজ শুরু হলো। একবার... দুবার... তারপর হঠাৎ—

ঠং!

ছুরির ফলায় অদ্ভুত একটা শব্দ হলো। হরিপদ থেমে গেলেন।

—“কীসের শব্দ হলো?”

নিতাই বলল,

—“হাড়ে লেগেছে?”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

—“না। হাড়ের শব্দ এমন নয়।”

তিনি মাছের পেটের অংশটি সাবধানে কাটতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ তাঁর চোখ বড় হয়ে গেল।

—“আরে!”

—“কী হয়েছে?”

হরিপদ মাছের পেটের ভিতর থেকে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করলেন। তাঁর হাতের তালুতে ছোট্ট একটি জিনিস। সূর্যের আলো পড়তেই সেটি ঝিকমিক করে উঠল।

একটি হীরের আংটি!


সবাই হতবাক

কিছুক্ষণের জন্য রান্নাঘরে একেবারে নীরবতা। নিতাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে।

আরেকজন বলল,

—“মাছের পেটের মধ্যে আংটি!”

হরিপদ বললেন,

—“আমি জীবনে অনেক মাছ কেটেছি। কিন্তু মাছের পেট থেকে আজ পর্যন্ত পুঁটি মাছও পেয়েছি, চিংড়িও পেয়েছি... আংটি পাইনি!”

কেউ বলল,

—“এটা নিশ্চয়ই কারও হারানো আংটি।”

আরেকজন বলল,

—“কিন্তু মাছের পেটে গেল কী করে?”

কেউ কোনো উত্তর দিতে পারল না।

খবর মুহূর্তের মধ্যে রান্নাঘর থেকে উঠোনে পৌঁছে গেল। তারপর উঠোন থেকে বারান্দায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই—

“মাছের পেট থেকে হীরের আংটি বেরিয়েছে!”

এই খবর গোটা জমিদারবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। অতিথিরাও ভিড় করতে শুরু করলেন।


জমিদারবাবুর সামনে আংটি

রাজচন্দ্র রায় তখন অতিথিদের সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন। একজন কর্মচারী দৌড়ে এসে বলল,

—“জমিদারবাবু! বড় আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে!”

রাজচন্দ্রবাবু হেসে বললেন,

—“আজ তো আশ্চর্য ঘটনার অভাব নেই। কী হয়েছে?”

—“মাছের পেট থেকে আংটি পাওয়া গেছে।”

—“কী বললে?”

—“হীরের আংটি।”

রাজচন্দ্রবাবু এবার উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর সামনে আংটিটি এনে রাখা হলো। তিনি আংটিটি হাতে তুলে নিলেন।

অসাধারণ সুন্দর আংটি। মাঝখানে বড় একটি স্বচ্ছ হীরা। চারপাশে সূক্ষ্ম নকশা।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—আংটির ভিতরের দিকে খুব ছোট করে কয়েকটি অক্ষর খোদাই করা। রাজচন্দ্রবাবু চোখ কুঁচকে সেগুলো পড়ার চেষ্টা করলেন। কিছু বোঝা গেল না।

তিনি রানী হেমাঙ্গিনীর দিকে তাকালেন। রানীও আংটিটি দেখে অবাক। বললেন,

—“এ আংটি নিশ্চয়ই কোনো সাধারণ মানুষের নয়।”

রাজচন্দ্রবাবু বললেন,

—“তা তো মনে হচ্ছে না।”

একজন বৃদ্ধ আত্মীয় বললেন,

—“হয়তো বহু বছর আগে কোনো ধনী ব্যক্তির আংটি নদীতে পড়ে গিয়েছিল। মাছ সেটি গিলে ফেলেছিল।”

আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—“তাহলে এতদিন মাছটির পেটে ছিল?”

বৃদ্ধ বললেন,

—“তা তো...”

তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। কারণ সেই ব্যাখ্যাটি কারও কাছেই খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।


আংটিটি কার?

জমিদারবাবু আংটিটি আবার হাতে নিয়ে দেখলেন। হীরেটি অদ্ভুতভাবে ঝলমল করছে। কোনো দামি পাথর তিনি আগে দেখেছেন, কিন্তু এই হীরের আলো যেন একটু অন্যরকম।

তিনি বললেন,

—“আংটিটি আপাতত আমার কাছেই থাকবে।”

রানী মৃদু হেসে বললেন,

—“কিন্তু এত লোকের সামনে পাওয়া জিনিস। পরে এর আসল মালিককে খুঁজে পাওয়া গেলে?”

—“তখন অবশ্যই ফিরিয়ে দেব।”

তিনি আংটিটি নিজের পকেটে রেখে দিলেন। তারপর যেন কিছুই ঘটেনি, আবার অতিথিদের দিকে ফিরে গেলেন। কারণ আজ তাঁর ছেলের অন্নপ্রাশন। এমন আনন্দের দিনে একটি রহস্যময় আংটির চিন্তায় তিনি উৎসবের আনন্দ নষ্ট করতে চান না।


সন্ধ্যা নামল। অন্নপ্রাশনের সমস্ত অনুষ্ঠান শেষ হলো। অতিথিরা একে একে বিদায় নিলেন। নহবতের শব্দ থেমে গেল। আলো কমে এল। সারাদিনের ব্যস্ততার পর জমিদারবাড়ি ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

শশাঙ্ক ঘুমিয়ে পড়েছে। রানীও নিজের ঘরে চলে গেছেন। রাজচন্দ্রবাবু একা বসে আছেন তাঁর ঘরে। টেবিলের ওপর একটি প্রদীপ জ্বলছে।

তিনি পকেট থেকে সেই আংটিটি বের করলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিজের মনেই বললেন,

—“মাছের পেট থেকে আংটি... এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে।”

আংটিটি তিনি আঙুলের কাছে নিয়ে এলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে হালকা বাতাস এসে প্রদীপের শিখাটিকে দুলিয়ে দিল। হীরেটি একবার ঝলসে উঠল। রাজচন্দ্রবাবু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি জানতেন না—

এই ছোট্ট আংটিটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায়ের দরজা খুলে দিতে চলেছে।

আর সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে এমন এক রহস্য, যার কথা তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি।

চলবে...
গল্পটি সম্পূর্ণ — পর্ব ১ থেকে ৬ পর্যন্ত সবটাই এখন পড়া যাবে 💎
⟲
▶
কাতলা মাছের পেটের হীরের আংটি — পর্ব ১
শুনতে চাইলে প্লে বাটনে চাপুন
⏮
⏭