নরেন

নরেন্দ্রনাথ দত্ত
উনিশ শতকের কলকাতা

নরেন — যে ছেলেটি প্রশ্ন করতে জানত

এক অদ্ভুত স্বভাবের বালকের গল্প, যে বিশ্বাস করার আগে দেখতে চাইত

পর্ব ১

ঘোড়ার গাড়ির শব্দে তখনও শহরের রাস্তা মুখরিত হয়। গঙ্গার হাওয়া এসে মিশে যায় পুরনো বাড়িগুলোর বারান্দায়। সেই কলকাতার সিমুলিয়া অঞ্চলের এক বাড়িতে বড় হয়ে উঠছিল এক অদ্ভুত স্বভাবের ছেলে।

তার নাম—নরেন্দ্রনাথ দত্ত।

বাড়িতে সবাই তাকে ভালোবেসে ডাকত—নরেন।

নরেনকে এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা ছিল কঠিন কাজ।

কখনও সে বন্ধুদের নিয়ে খেলছে, কখনও গান গাইছে, কখনও শরীরচর্চা করছে, আবার কখনও কোনো বই হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগে পড়ছে।

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অন্য কিছু।

সে প্রশ্ন করত।

অনেক প্রশ্ন।

একদিন বাড়ির ঠাকুরঘরে বসে নরেন মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করল,

"মা, ঈশ্বরকে দেখা যায়?"

মা হেসে বললেন,

"ভক্তি দিয়ে তাঁকে অনুভব করতে হয়।"

নরেন আবার প্রশ্ন করল,

"কিন্তু সত্যিই কি তাঁকে দেখা যায়?"

মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি বুঝতেন, এই ছেলে শুধু উত্তর শুনে থেমে থাকবে না।

নরেন নিজের চোখে সত্যকে দেখতে চায়।

ভূতের গাছ

পাড়ার কয়েকজন ছেলে একদিন একটি বড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল।

একজন বলল,

"ওই গাছে ভূত আছে।"

নরেন বলল,

"কে দেখেছে?"

"সবাই জানে!"

"সবাই জানে মানেই সত্যি?"

ছেলেরা চুপ।

একজন বলল,

"তুমি বিশ্বাস করো না?"

নরেন গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল,

"দেখে না নিয়ে বিশ্বাস করব কেন?"

সে ধীরে ধীরে গাছটির দিকে এগিয়ে গেল।

বন্ধুরা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

নরেন গাছের চারপাশ ঘুরে দেখল। কিছুই নেই।

ফিরে এসে সে বলল,

"ভয় অনেক সময় আমাদের চোখকে এমন জিনিসও দেখায়, যা আসলে নেই।"

এই ছোট্ট ঘটনাটিই যেন তার চরিত্রের একটি দিক প্রকাশ করেছিল—

সে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে চাইত না।

মায়ের শিক্ষা

নরেনের মা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণা, দৃঢ়চেতা এবং গভীর স্মৃতিশক্তির অধিকারিণী।

তিনি ছেলেকে শুধু ধর্মের কথা শেখাতেন না। শেখাতেন সত্য, সাহস, আত্মসম্মান এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।

একদিন তিনি নরেনকে বললেন,

"বাবা, জীবনে সত্যের পথে থেকো। অন্যায় করলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবে।"

নরেন চুপ করে মায়ের কথা শুনল।

তারপর বলল,

"মা, যদি সবাই অন্যায় করে?"

মা উত্তর দিলেন,

"তবু তুমি অন্যায় করবে না।"

নরেন মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

সেই কথাটি তার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।

কারণ ভবিষ্যতে পৃথিবী তাকে যতই পরীক্ষা করুক, সত্যের প্রতি সেই আকর্ষণ তার চরিত্রের অন্যতম শক্তি হয়ে থাকবে।

পর্ব ২

নরেনের পৃথিবী ছিল অনেক বড়।

তার কাছে শিক্ষা মানে শুধু বই পড়া নয়।

সে গান শিখত, শরীরচর্চা করত, সাঁতার কাটত, খেলাধুলা করত এবং বন্ধুদের সঙ্গে নানা ধরনের দুঃসাহসিক কাজে অংশ নিত।

তার কণ্ঠস্বর ছিল সুন্দর। গান শুনতে সে যেমন ভালোবাসত, তেমনই নিজেও গান গাইত।

আবার শরীরকে শক্ত রাখার ব্যাপারেও সে ছিল আগ্রহী।

একদিন এক বন্ধু বলল,

"নরেন, তুমি এত কিছু একসঙ্গে কীভাবে করো?"

নরেন হেসে বলল,

"শুধু বই পড়লেই তো মানুষ শক্তিশালী হয় না। শরীরও শক্ত হতে হবে, মনও।"

সে বুঝতে শুরু করেছিল—মানুষের সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য শরীর, মন ও চরিত্র—সবকিছুরই প্রয়োজন।

বাবার কাছ থেকে অন্য শিক্ষা

নরেনের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন শিক্ষিত, উদারমনা এবং আইনজীবী।

বাড়িতে নানা ধরনের মানুষের যাতায়াত ছিল।

বিভিন্ন মতের মানুষ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ—অনেকেই আসতেন।

নরেন ছোট থেকেই তাঁদের কথাবার্তা শুনত।

তার বাবা তাকে স্বাধীনভাবে ভাবতে উৎসাহ দিতেন।

একদিন কোনো একটি বিষয় নিয়ে নরেন বাবাকে প্রশ্ন করল।

বাবা সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন,

"নিজে ভেবে দেখো।"

নরেন একটু অবাক।

"আপনি বলছেন না কেন?"

বাবা মৃদু হেসে বললেন,

"সব উত্তর অন্যের মুখ থেকে শুনে নিলে নিজের বুদ্ধি কখন ব্যবহার করবে?"

নরেন চুপ করে গেল।

এই শিক্ষাটিও তার মনে থেকে গেল।

বইয়ের জগৎ

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরেনের পড়াশোনার পরিধিও বাড়তে লাগল।

ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, ধর্ম—বিভিন্ন বিষয় তাকে আকর্ষণ করত।

কিন্তু বই পড়ে তার প্রশ্ন কমত না।

বরং বাড়ত।

একটি বইয়ের উত্তর তাকে নিয়ে যেত আরেকটি প্রশ্নের কাছে।

একদিন সে ভাবল,

"মানুষ কেন দুঃখ পায়?"

"ঈশ্বর যদি থাকেন, তবে পৃথিবীতে এত অন্যায় কেন?"

"মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কী?"

এই প্রশ্নগুলো তখনও তার কাছে পরিষ্কার ছিল না।

কিন্তু তার ভিতরে যেন একটি অনুসন্ধান শুরু হয়ে গিয়েছিল।

সে জানত না সেই অনুসন্ধান তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

শুধু জানত—

সত্যকে জানতে হবে।

পর্ব ৩

নরেনের সাহসের গল্প পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

তবে সাহস মানে যে কখনও ভয় না পাওয়া—এ কথা নরেনও জানত না।

সাহস মানে ছিল ভয়ের সামনে দাঁড়াতে শেখা।

একদিন কয়েকজন বন্ধু মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করল।

এক বন্ধু বলল,

"ওখানে গেলে সাবধানে থাকতে হবে।"

নরেন হেসে বলল,

"কেন?"

"জায়গাটা নাকি বিপজ্জনক।"

নরেন বলল,

"তাহলে সাবধানে যাব। কিন্তু ভয় পেয়ে যাওয়াই কি সমাধান?"

তার এই স্বভাব অনেকের কাছে আশ্চর্য লাগত।

অন্যের জন্য নিজের কথা ভুলে যাওয়া

নরেনের মধ্যে আরেকটি গুণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল—অন্যের কষ্ট দেখলে সে স্থির থাকতে পারত না।

কোনো দরিদ্র মানুষকে দেখলে তার মনে প্রশ্ন জাগত,

"ওঁরাও তো আমাদের মতো মানুষ। তাহলে তাঁদের এত কষ্ট কেন?"

এই প্রশ্ন পরে তার জীবনের অন্যতম বড় চিন্তায় পরিণত হবে।

কিন্তু তখন সে ছিল কেবল এক কিশোর।

তার সামর্থ্য ছিল সীমিত।

তবু যতটুকু পারত, সাহায্য করত।

কখনও নিজের খাবার ভাগ করে দিত, কখনও কারও কথা মন দিয়ে শুনত।

একটি গভীর প্রশ্ন

একদিন এক ধর্মীয় আলোচনায় বসে নরেন অনেক কথা শুনল।

ঈশ্বর, আত্মা, ধর্ম—অনেক আলোচনা হলো।

সবাই কথা বলছে।

কিন্তু নরেনের মনে একটি প্রশ্নই ঘুরছে।

শেষে সে বলেই ফেলল,

"কেউ কি সত্যিই ঈশ্বরকে দেখেছেন?"

ঘরে কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল।

অনেকে নানা ব্যাখ্যা দিলেন।

কেউ বললেন, "শাস্ত্রে লেখা আছে।"

কেউ বললেন, "বিশ্বাস করতে হয়।"

কিন্তু নরেনের মন তাতে শান্ত হলো না।

সে ভাবল,

"আমি শুধু শুনতে চাই না। আমি সত্যটা জানতে চাই।"

এই প্রশ্নই একদিন তাকে এমন একজন মানুষের কাছে নিয়ে যাবে, যিনি তার জীবনকে সম্পূর্ণ নতুন পথে পরিচালিত করবেন।

পর্ব ৪

দিন কেটে যাচ্ছিল।

নরেন তখন যুবক। তার প্রশ্নগুলো আরও গভীর হয়েছে।

সে বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় বক্তৃতা শুনেছে, নানা মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু তার মনের তৃষ্ণা মেটেনি।

একদিন তার পরিচয় হলো দক্ষিণেশ্বরের এক সাধকের সঙ্গে।

তিনি—শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস।

প্রথম সাক্ষাতে নরেন তাঁর সামনে বসে রইল।

নরেনের স্বভাবই ছিল সরাসরি কথা বলা।

সে প্রশ্ন করল,

"আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন?"

প্রশ্নটি শুনে শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে যেন অন্যরকম হাসি ফুটে উঠল।

তিনি বললেন,

"হ্যাঁ, দেখেছি।"

নরেন অবাক।

এমন উত্তর সে আশা করেনি।

শ্রীরামকৃষ্ণ আরও বললেন যে ঈশ্বরকে যেমন প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করা যায়, তেমনই মানুষের মধ্যেও ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার শিক্ষা তিনি নরেনকে দিতে শুরু করেন।

নরেন তখনও সবকিছু মেনে নেয়নি।

তার স্বভাব ছিল প্রশ্ন করা, যাচাই করা।

তাই এই সম্পর্কও একদিনে তৈরি হয়নি।

ছিল প্রশ্ন, দ্বিধা, পরীক্ষা এবং ধীরে ধীরে গভীরতর উপলব্ধির পথ।

কিন্তু সেই প্রথম সাক্ষাৎটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ নরেনের জীবনের অনুসন্ধান এবার একটি নতুন দিক পেল।

নরেনের সামনে নতুন দরজা

সে বুঝতে শুরু করল—

ধর্ম শুধু বইয়ের বিষয় নয়।

মানুষকে ভালোবাসা, সত্যের অনুসন্ধান এবং নিজের ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলাও তার সঙ্গে যুক্ত।

তার শৈশবের প্রশ্নগুলো যেন একে একে নতুন অর্থ পেতে শুরু করল।

কিন্তু সামনে তখনও অনেক পথ।

অনেক পরীক্ষা।

অনেক দুঃখ।

অনেক সংগ্রাম।

পর্ব ৫

কলকাতার সেই বাড়িটা একসময় ছিল হাসি-আনন্দে ভরা।

কিন্তু হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল।

নরেনের বাবা, বিশ্বনাথ দত্ত, মারা গেলেন।

সংসারের ওপর যেন একসঙ্গে অনেকগুলো দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

যে পরিবারে একসময় অতিথিদের আনাগোনা ছিল, সেই বাড়িতেই এবার হিসেব কষতে হচ্ছে—কীভাবে সংসার চলবে?

নরেন তখন তরুণ।

তার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন ছিল। পড়াশোনা ছিল। গান ছিল। বন্ধু ছিল। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ল।

একদিন অনেক চেষ্টা করে সে একটি বাড়িতে কাজের আশায় গেল।

ফিরে এল খালি হাতে।

আরেকদিন গেল।

সেখানেও কোনো ব্যবস্থা হলো না।

দিনের পর দিন একই অবস্থা।

একসময় তার নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগল,

"যে ঈশ্বরের কথা এত শুনেছি, তিনি কোথায়?"

প্রশ্নটি এবার আর কৌতূহলের প্রশ্ন ছিল না।

এ ছিল জীবনের গভীর যন্ত্রণার প্রশ্ন।

দক্ষিণেশ্বরে

নরেন আবার শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে গেল।

তার চোখে তখন আগের সেই দুরন্ত কিশোরের উজ্জ্বলতা নেই। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে।

সে বলল,

"আমার পরিবারের এত কষ্ট। আপনি কি মায়ের কাছে প্রার্থনা করে আমাদের জন্য কিছু চাইতে পারেন না?"

শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন,

"তুমি নিজেই মায়ের কাছে চাও।"

নরেন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে গেল।

তার মনে ছিল—আজ সে পরিবারের জন্য প্রার্থনা করবে।

কিন্তু মন্দিরের সামনে দাঁড়াতেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল অন্য কথা।

সে চাইল—

"মা, আমাকে জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বৈরাগ্য দাও।"

ফিরে এসে সে বুঝতে পারল, সে সংসারের অভাবের কথা বলতে ভুলে গেছে।

শ্রীরামকৃষ্ণ আবার তাকে পাঠালেন।

দ্বিতীয়বারও একই ঘটনা।

তৃতীয়বারও।

শেষে শ্রীরামকৃষ্ণ মৃদু হেসে বললেন,

"তোমার পরিবারের অন্ন-বস্ত্রের অভাব হবে না।"

নরেন চুপ করে রইল।

তার ভিতরে তখন এক নতুন লড়াই শুরু হয়েছে।

জীবনের কষ্ট তাকে শুধু নিজের কথা ভাবতে শেখায়নি—বরং অন্য মানুষের কষ্টকেও নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছে।

এক নতুন পথ

এরপরের দিনগুলো সহজ ছিল না।

নরেনের সামনে ছিল সংসারের দায়িত্ব, নিজের ভবিষ্যৎ এবং আধ্যাত্মিক সত্যের অনুসন্ধান।

শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে তার চিন্তা আরও গভীর হতে লাগল।

সে বুঝতে শুরু করল—

মানুষকে ভালোবাসা আর ঈশ্বরকে খোঁজা আলাদা কোনো পথ নয়।

কিন্তু তখনও সে জানত না, ভবিষ্যৎ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

তার সামনে তখন এক দীর্ঘ পথ।

এই পথেই একদিন নরেন্দ্রনাথ দত্ত পরিচিত হবেন অন্য এক নামে—

স্বামী বিবেকানন্দ।

পর্ব ৬ · শেষ পর্ব

সময় এগিয়ে গেল।

শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের পর নরেন ও তাঁর সহশিষ্যরা সন্ন্যাসজীবনের পথে এগিয়ে গেলেন।

নরেন্দ্রনাথ তখন আর শুধু নিজের জন্য সত্য খুঁজছেন না।

তিনি ভারতবর্ষকে দেখতে বেরিয়ে পড়লেন।

শহর থেকে গ্রাম।

রাজপ্রাসাদ থেকে সাধারণ মানুষের ঘর।

পথে পথে তিনি দেখলেন এক বিশাল দেশ—অসীম ঐতিহ্যের অধিকারী, অথচ দারিদ্র্য ও অশিক্ষায় জর্জরিত অসংখ্য মানুষ।

একদিন পথ চলতে চলতে তাঁর মনে হলো,

"যে দেশের মানুষ এত কষ্টে আছে, তাদের জন্য কিছু না করে শুধু নিজের মুক্তির কথা ভাবব কীভাবে?"

শৈশবের সেই প্রশ্নগুলো যেন নতুন অর্থ পেল।

ঈশ্বর কোথায়?

মানুষের মধ্যেই কি তাঁর প্রকাশ নেই?

সমুদ্রের ওপারে

১৮৯৩ সাল।

নরেন্দ্রনাথ তখন স্বামী বিবেকানন্দ।

তিনি আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্বধর্ম মহাসভায় যোগ দিতে গিয়েছেন।

সেখানে পৌঁছানোও সহজ ছিল না।

অপরিচিত দেশ।

অপরিচিত মানুষ।

অর্থের অভাব।

অনিশ্চয়তা।

তবু তিনি এগিয়ে গেলেন।

অবশেষে সেই দিন এল।

বিশাল সভাকক্ষে নানা ধর্ম ও দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত।

স্বামী বিবেকানন্দের পালা আসতে আর বেশি দেরি নেই।

মুহূর্তটি যেন তাঁর জীবনের সমস্ত পথকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করাল।

সেই ছোট্ট নরেন—

যে একদিন গাছের কাছে গিয়ে ভূতের গল্পের সত্যতা যাচাই করেছিল,

যে মায়ের কাছে ঈশ্বরকে নিয়ে প্রশ্ন করেছিল,

যে বাবার কাছে শুনেছিল নিজের বুদ্ধি দিয়ে ভাবতে,

যে দুঃখের দিনে মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্টের মতো অনুভব করতে শিখেছিল—

সেই নরেনই আজ বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে চলেছে।

তিনি মঞ্চে উঠলেন।

তারপর শুরু হলো তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা।

সেদিন তাঁর কণ্ঠে শুধু একটি ধর্মের কথা ছিল না।

ছিল মানবতা, সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার কথা।

ফিরে দেখা

অনেক বছর পরে যদি ছোট্ট নরেনকে কেউ প্রশ্ন করত,

"তুমি বড় হয়ে কী হবে?"

সে হয়তো কোনো উত্তর দিতে পারত না।

কারণ সে জানত না ভবিষ্যৎ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

কিন্তু তার মধ্যে তখন থেকেই কিছু জিনিস ছিল—

এই গুণগুলোই ধীরে ধীরে তাকে নরেন্দ্রনাথ থেকে স্বামী বিবেকানন্দে পরিণত করেছিল।

তাই স্বামী বিবেকানন্দের শৈশবের গল্প আসলে শুধু একটি মহান মানুষের ছোটবেলার গল্প নয়।

এটি একটি শিশুর ভিতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার গল্প।

যে শিশু প্রশ্ন করে, সে হয়তো একদিন নতুন উত্তর খুঁজে পাবে।

যে শিশু সত্য জানতে চায়, সে হয়তো একদিন অন্যদেরও সত্যের পথে ডাকবে।

আর যে শিশু মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখে, তার জীবন হয়তো একদিন মানুষের জন্যই উৎসর্গিত হবে।

ছোট্ট নরেনের গল্প তাই এখানেই শেষ নয়।

কারণ তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্ন আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—

"তুমি তোমার ভিতরের শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করবে?"

— সমাপ্ত —