এক অদ্ভুত স্বভাবের বালকের গল্প, যে বিশ্বাস করার আগে দেখতে চাইত
পর্ব ১
ঘোড়ার গাড়ির শব্দে তখনও শহরের রাস্তা মুখরিত হয়। গঙ্গার হাওয়া এসে মিশে যায় পুরনো বাড়িগুলোর বারান্দায়। সেই কলকাতার সিমুলিয়া অঞ্চলের এক বাড়িতে বড় হয়ে উঠছিল এক অদ্ভুত স্বভাবের ছেলে।
তার নাম—নরেন্দ্রনাথ দত্ত।
বাড়িতে সবাই তাকে ভালোবেসে ডাকত—নরেন।
নরেনকে এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা ছিল কঠিন কাজ।
কখনও সে বন্ধুদের নিয়ে খেলছে, কখনও গান গাইছে, কখনও শরীরচর্চা করছে, আবার কখনও কোনো বই হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগে পড়ছে।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অন্য কিছু।
সে প্রশ্ন করত।
অনেক প্রশ্ন।
একদিন বাড়ির ঠাকুরঘরে বসে নরেন মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করল,
"মা, ঈশ্বরকে দেখা যায়?"
মা হেসে বললেন,
"ভক্তি দিয়ে তাঁকে অনুভব করতে হয়।"
নরেন আবার প্রশ্ন করল,
"কিন্তু সত্যিই কি তাঁকে দেখা যায়?"
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি বুঝতেন, এই ছেলে শুধু উত্তর শুনে থেমে থাকবে না।
নরেন নিজের চোখে সত্যকে দেখতে চায়।
ভূতের গাছ
পাড়ার কয়েকজন ছেলে একদিন একটি বড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল।
একজন বলল,
"ওই গাছে ভূত আছে।"
নরেন বলল,
"কে দেখেছে?"
"সবাই জানে!"
"সবাই জানে মানেই সত্যি?"
ছেলেরা চুপ।
একজন বলল,
"তুমি বিশ্বাস করো না?"
নরেন গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল,
"দেখে না নিয়ে বিশ্বাস করব কেন?"
সে ধীরে ধীরে গাছটির দিকে এগিয়ে গেল।
বন্ধুরা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
নরেন গাছের চারপাশ ঘুরে দেখল। কিছুই নেই।
ফিরে এসে সে বলল,
"ভয় অনেক সময় আমাদের চোখকে এমন জিনিসও দেখায়, যা আসলে নেই।"
এই ছোট্ট ঘটনাটিই যেন তার চরিত্রের একটি দিক প্রকাশ করেছিল—
সে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে চাইত না।
মায়ের শিক্ষা
নরেনের মা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণা, দৃঢ়চেতা এবং গভীর স্মৃতিশক্তির অধিকারিণী।
তিনি ছেলেকে শুধু ধর্মের কথা শেখাতেন না। শেখাতেন সত্য, সাহস, আত্মসম্মান এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।
একদিন তিনি নরেনকে বললেন,
"বাবা, জীবনে সত্যের পথে থেকো। অন্যায় করলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবে।"
নরেন চুপ করে মায়ের কথা শুনল।
তারপর বলল,
"মা, যদি সবাই অন্যায় করে?"
মা উত্তর দিলেন,
"তবু তুমি অন্যায় করবে না।"
নরেন মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই কথাটি তার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
কারণ ভবিষ্যতে পৃথিবী তাকে যতই পরীক্ষা করুক, সত্যের প্রতি সেই আকর্ষণ তার চরিত্রের অন্যতম শক্তি হয়ে থাকবে।
পর্ব ২
নরেনের পৃথিবী ছিল অনেক বড়।
তার কাছে শিক্ষা মানে শুধু বই পড়া নয়।
সে গান শিখত, শরীরচর্চা করত, সাঁতার কাটত, খেলাধুলা করত এবং বন্ধুদের সঙ্গে নানা ধরনের দুঃসাহসিক কাজে অংশ নিত।
তার কণ্ঠস্বর ছিল সুন্দর। গান শুনতে সে যেমন ভালোবাসত, তেমনই নিজেও গান গাইত।
আবার শরীরকে শক্ত রাখার ব্যাপারেও সে ছিল আগ্রহী।
একদিন এক বন্ধু বলল,
"নরেন, তুমি এত কিছু একসঙ্গে কীভাবে করো?"
নরেন হেসে বলল,
"শুধু বই পড়লেই তো মানুষ শক্তিশালী হয় না। শরীরও শক্ত হতে হবে, মনও।"
সে বুঝতে শুরু করেছিল—মানুষের সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য শরীর, মন ও চরিত্র—সবকিছুরই প্রয়োজন।
বাবার কাছ থেকে অন্য শিক্ষা
নরেনের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন শিক্ষিত, উদারমনা এবং আইনজীবী।
বাড়িতে নানা ধরনের মানুষের যাতায়াত ছিল।
বিভিন্ন মতের মানুষ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ—অনেকেই আসতেন।
নরেন ছোট থেকেই তাঁদের কথাবার্তা শুনত।
তার বাবা তাকে স্বাধীনভাবে ভাবতে উৎসাহ দিতেন।
একদিন কোনো একটি বিষয় নিয়ে নরেন বাবাকে প্রশ্ন করল।
বাবা সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন,
"নিজে ভেবে দেখো।"
নরেন একটু অবাক।
"আপনি বলছেন না কেন?"
বাবা মৃদু হেসে বললেন,
"সব উত্তর অন্যের মুখ থেকে শুনে নিলে নিজের বুদ্ধি কখন ব্যবহার করবে?"
নরেন চুপ করে গেল।
এই শিক্ষাটিও তার মনে থেকে গেল।
বইয়ের জগৎ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরেনের পড়াশোনার পরিধিও বাড়তে লাগল।
ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, ধর্ম—বিভিন্ন বিষয় তাকে আকর্ষণ করত।
কিন্তু বই পড়ে তার প্রশ্ন কমত না।
বরং বাড়ত।
একটি বইয়ের উত্তর তাকে নিয়ে যেত আরেকটি প্রশ্নের কাছে।
একদিন সে ভাবল,
"মানুষ কেন দুঃখ পায়?"
"ঈশ্বর যদি থাকেন, তবে পৃথিবীতে এত অন্যায় কেন?"
"মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কী?"
এই প্রশ্নগুলো তখনও তার কাছে পরিষ্কার ছিল না।
কিন্তু তার ভিতরে যেন একটি অনুসন্ধান শুরু হয়ে গিয়েছিল।
সে জানত না সেই অনুসন্ধান তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।
শুধু জানত—
সত্যকে জানতে হবে।
পর্ব ৩
নরেনের সাহসের গল্প পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
তবে সাহস মানে যে কখনও ভয় না পাওয়া—এ কথা নরেনও জানত না।
সাহস মানে ছিল ভয়ের সামনে দাঁড়াতে শেখা।
একদিন কয়েকজন বন্ধু মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করল।
এক বন্ধু বলল,
"ওখানে গেলে সাবধানে থাকতে হবে।"
নরেন হেসে বলল,
"কেন?"
"জায়গাটা নাকি বিপজ্জনক।"
নরেন বলল,
"তাহলে সাবধানে যাব। কিন্তু ভয় পেয়ে যাওয়াই কি সমাধান?"
তার এই স্বভাব অনেকের কাছে আশ্চর্য লাগত।
অন্যের জন্য নিজের কথা ভুলে যাওয়া
নরেনের মধ্যে আরেকটি গুণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল—অন্যের কষ্ট দেখলে সে স্থির থাকতে পারত না।
কোনো দরিদ্র মানুষকে দেখলে তার মনে প্রশ্ন জাগত,
"ওঁরাও তো আমাদের মতো মানুষ। তাহলে তাঁদের এত কষ্ট কেন?"
এই প্রশ্ন পরে তার জীবনের অন্যতম বড় চিন্তায় পরিণত হবে।
কিন্তু তখন সে ছিল কেবল এক কিশোর।
তার সামর্থ্য ছিল সীমিত।
তবু যতটুকু পারত, সাহায্য করত।
কখনও নিজের খাবার ভাগ করে দিত, কখনও কারও কথা মন দিয়ে শুনত।
একটি গভীর প্রশ্ন
একদিন এক ধর্মীয় আলোচনায় বসে নরেন অনেক কথা শুনল।
ঈশ্বর, আত্মা, ধর্ম—অনেক আলোচনা হলো।
সবাই কথা বলছে।
কিন্তু নরেনের মনে একটি প্রশ্নই ঘুরছে।
শেষে সে বলেই ফেলল,
"কেউ কি সত্যিই ঈশ্বরকে দেখেছেন?"
ঘরে কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল।
অনেকে নানা ব্যাখ্যা দিলেন।
কেউ বললেন, "শাস্ত্রে লেখা আছে।"
কেউ বললেন, "বিশ্বাস করতে হয়।"
কিন্তু নরেনের মন তাতে শান্ত হলো না।
সে ভাবল,
"আমি শুধু শুনতে চাই না। আমি সত্যটা জানতে চাই।"
এই প্রশ্নই একদিন তাকে এমন একজন মানুষের কাছে নিয়ে যাবে, যিনি তার জীবনকে সম্পূর্ণ নতুন পথে পরিচালিত করবেন।
পর্ব ৪
দিন কেটে যাচ্ছিল।
নরেন তখন যুবক। তার প্রশ্নগুলো আরও গভীর হয়েছে।
সে বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় বক্তৃতা শুনেছে, নানা মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু তার মনের তৃষ্ণা মেটেনি।
একদিন তার পরিচয় হলো দক্ষিণেশ্বরের এক সাধকের সঙ্গে।