পর্ব ১
বারোটা পর্যন্ত ঘুম
অয়নের দিন শুরু হত দুপুর বারোটায়।
তার আগে ঘরের পর্দা সরানো হত না। কাজের লোক দরজার বাইরে চায়ের কাপ রেখে চলে যেত, কাপ ঠান্ডা হয়ে যেত, কেউ কিছু বলত না।
বাড়ির লোকেরা জানত, রাত তিনটের আগে অয়ন ফেরে না।
পঁচিশ বছর বয়স। কোনো কাজ নেই। বন্ধুর সংখ্যা অগুনতি।
আগের রাতেই সে বন্ধুদের নিয়ে শহরের সবচেয়ে দামি জায়গায় গিয়েছিল। টেবিলে বিল এসেছিল—
৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।
অয়ন বিলটা একবার দেখেওনি। কার্ড এগিয়ে দিয়েছিল।
তার কাছে এটা কোনো ঘটনা নয়। এরকম রাত মাসে কয়েকবার আসে।
টাকা কোথা থেকে আসে, সে প্রশ্ন তার কখনও মনে হয়নি।
বাবার ব্যবসা। বাবার নাম। বাবার সম্পত্তি।
এর বাইরে নিজের বলতে তার কিছু ছিল না—এই কথাটা সে কোনোদিন ভেবেও দেখেনি।
সেদিন দুপুরে ঘুম ভাঙতেই সে দেখল, ঘরের পর্দা সরানো।
জানলার পাশে চেয়ারে বসে আছেন তার মা।
অয়ন উঠে বসল।
— “তুমি এখানে?”
মা কোনো উত্তর দিলেন না। টেবিলের ওপর একটা কাগজ রাখলেন।
গত ছ’মাসের খরচের হিসাব।
অয়ন কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
— “এসব দেখার কী আছে?”
মা শান্ত গলায় বললেন,
— “আজ থেকে এই টাকা বন্ধ।”
অয়ন হেসে ফেলল।
— “মা, তুমি রেগে আছ।”
— “না। আমি ঠিক করে ফেলেছি।”
এবার অয়নের হাসি থেমে গেল।
মা উঠে দাঁড়ালেন।
— “তুমি এই বাড়ি ও শহর ছেড়ে যাবে। অন্য শহরে, সেখানে কেউ তোমার বাবার নাম বা পরিচয় জানবে না।”
— “আর যদি না যাই?”
— “তাহলে এই বাড়িতে তোমার জন্য আর কিছু থাকবে না।”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “আমি কী করব সেখানে?”
মা তার হাতে একটা খাম দিলেন।
খামের ভিতরে ২০,০০০ টাকা।
— “এই টাকাটাই শেষ। এরপর যা লাগবে, নিজে রোজগার করবে।”
— “কত?”
— “অন্তত ২৫,০০০ টাকা। নিজের পরিশ্রমে। ছ’মাসের মধ্যে রোজগার করে আমাকে দেখাবে।”
অয়ন খামটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মা দরজার কাছে গিয়ে থামলেন।
— “আর একটা শর্ত।”
— “বলো।”
— “কোথাও তোমার বাবার নাম বলবে না। কোনো সুবিধা নেবে না। কেউ যেন না জানে তুমি কার ছেলে।”
অয়ন অবাক হয়ে বলল,
— “কেন?”
মা একটু থামলেন।
তাঁর মুখে এমন একটা ছায়া পড়ল, যা অয়ন আগে কখনও দেখেনি।
— “একদিন বুঝবে।”
পরদিন ভোরে অয়ন বাড়ি ছাড়ল।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে সে একবার পিছনে তাকাল।
বিরাট বাড়ি। লোহার গেট। নামফলক।
সেই নামফলকে লেখা নামটার আড়ালেই সে এতদিন বেঁচে ছিল।
ট্রেনে বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে সে ভাবল—
“আমি কি সত্যিই নিজের পরিচয়ে বাঁচতে পারব?”
কিন্তু সে তখনও জানত না, নতুন শহরে তার নতুন জীবনের সঙ্গে খুব শিগগিরই জড়িয়ে পড়বে তার বাবার পুরোনো অতীত।
পর্ব ২
নিজের পরিচয়
নতুন শহরে অয়ন যে ঘরটি ভাড়া নিল, সেটি একটি পুরোনো একতলা বাড়ির পিছন দিকে।
দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। ছাদ থেকে জল পড়ে।
বাড়িওয়ালির নাম সুধা দেবী।
বয়স হয়েছে। সংসার চলে কষ্টে। ভাড়ার টাকাটাই তাঁর প্রধান ভরসা।
প্রথম দিনই তিনি বললেন,
— “বাবা, আগাম ভাড়া দিতে হবে। কিছু মনে কোরো না।”
অয়ন টাকা দিল।
জীবনে এই প্রথম সে গুনে গুনে টাকা দিল।
তারপর শুরু হল চাকরির খোঁজ।
অয়ন ভেবেছিল, কাজ পেতে কতক্ষণ?
কিন্তু প্রতিটি জায়গায় একই প্রশ্ন—
কত দিনের অভিজ্ঞতা?
আগে কোথায় কাজ করেছেন?
কোনো রেফারেন্স আছে?
অয়নের কাছে তিনটিরই উত্তর ছিল একটাই।
কিছু নেই।
একটা নাম বললেই হয়তো সব দরজা খুলে যেত।
কিন্তু মায়ের শর্ত তার মনে ছিল।
সে নামটা বলল না।
দুই মাসের মাথায় খামের টাকা শেষ হয়ে এল।
এক সকালে সে বুঝল, পকেটে যা আছে তাতে দু’দিন চলবে।
সেই বাড়িতেই থাকত বিশাখা—সুধা দেবীর মেয়ে।
অয়ন তাকে প্রায়ই দেখত।
সকালবেলা বিশাখা কারখানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেত। সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরত।
দুজনের দেখা হতো প্রায় প্রতিদিনই—কখনও সিঁড়িতে, কখনও উঠোনে, কখনও বাড়ির দরজার সামনে।
কিন্তু কথা হতো না।
বিশাখা শুধু জানত, নতুন ভাড়াটে ছেলেটি চাকরির চেষ্টা করছে। কয়েকবার তাকে সকালে বেরিয়ে যেতে এবং বিকেলে ফিরে আসতে দেখেছে।
অয়নও জানত, মেয়েটি প্রতিদিন কারখানায় কাজ করতে যায়।
তাদের মধ্যে তখনও কোনো বন্ধুত্ব তৈরি হয়নি। ছিল শুধু নীরব পরিচিতি—একই বাড়িতে থাকা দুজন মানুষের প্রতিদিনের দেখা হওয়া।
একদিন বিকেলে অয়ন উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে কয়েকটি কাগজ—আরও একটি চাকরির আবেদনপত্র।
মুখে ক্লান্তি। চোখে হতাশা।
ঠিক তখনই কারখানা থেকে ফিরে বিশাখা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ অয়নের হাতে থাকা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে সে প্রথমবার কথা বলল,
— “চাকরির চেষ্টা করছেন?”
অয়ন একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “হ্যাঁ। এখনও কিছু হয়নি।”
বিশাখা মাথা নাড়ল।
— “হয়ে যাবে। চেষ্টা করলে একদিন না একদিন হয়।”
এই ছিল তাদের প্রথম কথা।
খুব সাধারণ কয়েকটি কথা।
কিন্তু অয়ন তখনও জানত না—এই সামান্য কথোপকথনই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের শুরু হয়ে উঠবে।
— “আপনি তো অনেক জায়গায় ঘুরছেন। আমাদের কারখানায় লোক নিচ্ছে। যাবেন?”
অয়ন ইতস্তত করল।
— “আমি তো ওসব কাজ পারি না।”
বিশাখা সোজাসুজি বলল,
— “কেউ জন্ম থেকে পারে না।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু অয়নের মনে কথাটা যেন কোথাও গিয়ে আটকে গেল।
পরদিন সকালে অয়ন তার সঙ্গে কারখানায় গেল।
বিশাখা তাকে কারখানার সুপারভাইজারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
— “স্যার, উনি কাজ খুঁজছেন। খুব দরকার ওনার একটা কাজ।”
সুপারভাইজার অয়নের দিকে তাকালেন।
— “আগে কোথাও কাজ করেছেন?”
অয়ন একটু থেমে বলল,
— “না। তবে কাজ শিখতে পারব।”
বিশাখা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “ওকে একটা সুযোগ দিন। কাজ শিখে নেবে।”
সুপারভাইজার কিছুক্ষণ অয়নের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
— “ঠিক আছে। কাল থেকে আসুন। প্রথমে কাজ শিখবেন। ভালো করলে স্থায়ীভাবে রাখা হবে।”
অয়ন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। এতদিন ধরে অনেক জায়গায় ঘুরেও যে সুযোগটা পায়নি, সেটা আজ এত সহজে এসে গেল।
সে বিশাখার দিকে তাকাল।
— “আপনাকে ধন্যবাদ।”
বিশাখা হেসে বলল,
— “ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। কাজটা আপনাকেই করতে হবে।”
অয়ন মাথা নাড়ল।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হল—জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে তার বাবার নাম দিয়ে নয়, একজন মানুষ হিসেবে একটা সুযোগ দিয়েছে।
আর সেই সুযোগের প্রথম দরজাটা খুলে দিয়েছে বিশাখা।
সেদিন থেকেই তার জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হল।
প্রথম সপ্তাহে তার হাতে ফোস্কা পড়ল।
দ্বিতীয় সপ্তাহে পিঠ ব্যথায় রাতে ঘুম হল না।
তৃতীয় সপ্তাহে সে প্রথমবার নিজের হাতে বেতন পেল।
টাকার অঙ্কটা তার আগের এক রাতের বিলের তুলনায় কিছুই নয়।
কিন্তু সেই টাকাটা হাতে নিয়ে তার হাত কেঁপে উঠল।
এই প্রথম—কোনো বাবার টাকা নয়, কোনো পরিবারের টাকা নয়, কোনো পরিচয়ের জোরে পাওয়া টাকা নয়।
এই টাকা তার নিজের।
অয়ন কিছুক্ষণ নীরবে টাকার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হল, জীবনে প্রথমবার সে শুধু টাকা উপার্জন করেনি—নিজের একটা পরিচয় তৈরি করার পথে প্রথম পা রেখেছে।
কারখানায় কাজ করতে করতে অয়ন ধীরে ধীরে বিশাখাকে আরও কাছ থেকে চিনতে শুরু করল।
একদিন তাকে হিসাবের কাজে একটু সাহায্য করতে বলা হয়েছিল। কাজের ফাঁকে মজুরির হিসাবের খাতাটি মিলিয়ে দেখছিল অয়ন।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটি হিসাবের ওপর।
বিশাখার নামে একশো টাকা বেশি লেখা হয়েছে।
ভুলটা সম্ভবত হিসাবরক্ষকের চোখ এড়িয়ে গেছে। কেউ বিষয়টি খেয়াল করেনি।
অয়ন ভাবল, বিশাখা হয়তো জানতই না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর বিশাখা নিজেই খাতাটি দেখতে এসে ভুলটা বুঝতে পারল।
সে সঙ্গে সঙ্গে হিসাবরক্ষকের কাছে গিয়ে বলল,
— “আমার নামে একশো টাকা বেশি লেখা হয়েছে।”
হিসাবরক্ষক অবাক হয়ে বললেন,
— “ওটা তো কেউ খেয়াল করেনি। থাক না।”
বিশাখা মাথা নাড়ল।
— “ভুল করে পাওয়া টাকা আমার নয়।”
সে একশো টাকা ফেরত দিয়ে দিল।
অয়ন দূর থেকে পুরো ঘটনাটা দেখছিল। পরে সুযোগ পেয়ে সে বলল,
— “কেউ তো টেরই পেত না।”
বিশাখা শান্তভাবে বলল,
— “কেউ না জানলেও আমি তো জানতাম।”
অয়ন আর কিছু বলতে পারল না।
যে বাড়িতে দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেই বাড়ির মেয়ে একশো টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছে।
আর সে নিজে এক রাতে সাড়ে তিন লাখ টাকা উড়িয়ে দিয়েছিল।
সেদিন রাতে অয়ন অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারল না।
তার মনে প্রথমবার প্রশ্ন জাগল—
“টাকার পরিমাণ বড় হলেই কি মানুষ বড় হয়?”
তিন মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর অয়নের জমানো টাকার অঙ্ক দাঁড়াল ২৫,০০০ টাকা।
টাকাগুলো হাতে নিয়ে সেদিন অয়নের মনে এক অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল।
সে ঠিক করেছিল, মাকে ফোন করে বলবে—
“মা, আমি পেরেছি। নিজের পরিশ্রমে ২৫ হাজার টাকা জমিয়েছি।”
কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।
সেদিন দুপুরে হঠাৎ খবর এল—সুধা দেবী রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়েছেন।
বিশাখা ছুটে হাসপাতালে চলে গেল। অয়নও তার সঙ্গে গেল।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ডাক্তার জানালেন, সুধা দেবীর দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসক যে আনুমানিক খরচের কথা বললেন, তা শুনে বিশাখার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
প্রায় ১ লাখ টাকা।
হাসপাতালের করিডরে এক কোণে বসে ছিল বিশাখা। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিল সে।
অয়ন ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে বসল।
— “বিশাখা...”
বিশাখা মুখ তুলল। চোখের কোণে জল।
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আমার কাছে এখন ২৫ হাজার টাকা আছে। পুরোটা দিতে পারি।”
বিশাখা মাথা নাড়ল।
— “ওতে হবে না।”
অয়ন বলল,
— “আরও ব্যবস্থা করা যাবে। তুমি চিন্তা কোরো না।”
বিশাখা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— “আপনাকে একটা কথা বলব?”
অয়ন তার দিকে তাকাল।
— “বলুন।”
বিশাখা নিচু গলায় বলল,
— “আমাদের একসময় সব ছিল, জানেন?”
অয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
বিশাখা বলতে শুরু করল।
তার বাবা গ্রামের দিকে জমিজমা ও একটি ছোট ব্যবসা করতেন। সংসারে অভাব ছিল না। তারা খুব বড়লোক না হলেও নিজেদের মতো ভালোই চলত।
তারপর একদিন একজন প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে তাদের পরিবারের বিরোধ শুরু হয়।
একটার পর একটা কাগজ তাঁদের হাতছাড়া হতে লাগল। জমির কাগজ নিয়ে সমস্যা তৈরি হল। ব্যবসাটাও ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে গেল।
বাবা মামলা করলেন। কিন্তু মামলা চালাতে চালাতে তাঁদের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল।
বিশাখা থামল। গলা ভারী হয়ে এল।
— “বাবা শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছিলেন।”
অয়ন নীরবে শুনছিল।
বিশাখা আবার বলল,
— “একদিন বাবা আর বাড়ি ফিরলেন না।”
অয়নের বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
— “যে মানুষটা আপনাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল... তিনি কে?”
বিশাখা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“রায় বাহাদুর বিক্রমবাবু।”
নামটা শুনেই অয়নের শরীর যেন হঠাৎ অবশ হয়ে গেল।
হাসপাতালের করিডরের আলো, মানুষের পায়ের শব্দ, দূরের নার্সদের ব্যস্ততা—সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য তার কাছ থেকে দূরে সরে গেল।
সে কিছু বলতে পারল না।
কারণ বিশাখা জানত না—
যে মানুষটির কথা সে এতদিন ধরে বলছে, সেই রায় বাহাদুর বিক্রমবাবুই অয়নের বাবা।
অয়ন চোখ নামিয়ে নিল।
তার মুঠো শক্ত হয়ে গেল।
তার সামনে তখন দুটি সত্য দাঁড়িয়ে ছিল—
একদিকে তার বাবা।
অন্যদিকে সেই মানুষটি, যাকে সে এতদিন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় বলে জানত না।
আর বিশাখা?
সে তখনও জানত না, তার পাশে বসে থাকা মানুষটির সঙ্গে তার পরিবারের সেই পুরোনো ক্ষতের সম্পর্ক কত গভীর।
সেই রাতে অয়ন মাকে ফোন করল।
হাসপাতালের ঘটনা, সুধা দেবীর অবস্থা, চিকিৎসার খরচ—সবকিছু খুলে বলল।
ফোনের অন্য প্রান্তে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ হল না।
তারপর মা ধীরে বললেন,
— “টাকা আমি পাঠাচ্ছি।”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “তুমি তো বলেছিলে, আর টাকা নয়।”
মায়ের গলায় এবার অন্যরকম দৃঢ়তা।
— “এটা তোমার খরচ নয়।”
একটু থেমে মা ধীরে বললেন,
— “এটা আমাদের দেনা।”
অয়ন আর কোনো কথা বলতে পারল না।
ফোনের অন্য প্রান্তে তখনও তার মা নীরব।
তিনি জানতেন, বিক্রমবাবুর জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটেছিল, যেগুলো কখনও অয়নের সামনে পুরোপুরি বলা হয়নি। মানুষের প্রতি অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, কারও জীবন ভেঙে দেওয়ার মতো কিছু সিদ্ধান্ত—সবকিছুর কথা তিনি জানতেন না, কিন্তু অনেকটাই আঁচ করেছিলেন।
আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি নিজের ছেলের মধ্যেও কিছু একই লক্ষণ দেখতে শুরু করেছিলেন।
অয়নের হাতে সহজে টাকা আসছিল। আর সেই টাকা যেন ধীরে ধীরে তাকে তার বাবার পুরোনো ছায়ার দিকেই ঠেলে দিচ্ছিল।
সাড়ে তিন লাখ টাকা এক রাতে খরচ করে ফেলার পরই তিনি বুঝেছিলেন—এভাবে চলতে দিলে একদিন হয়তো অয়নও শুধু তার বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না, তার কিছু ভুলেরও উত্তরাধিকারী হয়ে উঠবে।
তাই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাঁকে।
ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, টাকা বন্ধ করে দেওয়া—কোনোটাই তিনি আনন্দ নিয়ে করেননি।
তিনি চেয়েছিলেন, অয়ন একদিন বুঝুক—
অন্যের টাকায় বড় হওয়া আর নিজের পরিশ্রমে মানুষ হওয়া এক জিনিস নয়।
কিন্তু আজ হাসপাতালের সেই খবর শুনে তাঁর বুকের ভিতর আবার পুরোনো প্রশ্নটা ফিরে এল।
“আমি কি ছেলেকে শাস্তি দিতে গিয়ে তার কাছ থেকে মায়ের অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছি?”
না।
এই টাকা অয়নের জন্য নয়।
এটি এমন একটি পরিবারের জন্য, যার জীবনে তাদের পরিবারের অতীতের কোনো অন্যায়ের ছায়া পড়ে থাকতে পারে।
তাই তিনি টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
কিন্তু অয়নকে তিনি তখনও সত্যিটা বললেন না।
কারণ তিনি জানতেন—
কিছু সত্য মানুষকে বদলে দেয়, কিন্তু ভুল সময়ে বলা সত্য মানুষকে ভেঙেও দিতে পারে।
অয়ন আর কোনো কথা বলতে পারল না।
ফোন রেখে সে অনেকক্ষণ হাসপাতালের করিডরের একটি বেঞ্চে চুপ করে বসে রইল।
তার মনে হল—
“বাবার সম্পত্তি আমাকে এতদিন বাঁচিয়েছে। অথচ সেই সম্পত্তির কারণেই হয়তো অন্য একটি পরিবার ধ্বংস হয়েছিল।”
এতদিন সে ভেবেছিল, বাবার পরিচয় তার শক্তি।
সেদিন প্রথমবার মনে হল—
সেই পরিচয়ের সঙ্গে হয়তো একটি ঋণও জড়িয়ে আছে।
কিন্তু বিশাখাকে সে সেদিনও কিছু বলতে পারল না।
সে যে কার ছেলে, সেই সত্যটা এখনও তার গলার কাছে এসে থেমে রইল।
পর্ব ৩
হারানো ব্যাগ
এখান থেকে গল্প কিছুটা পিছিয়ে যায়।
শহরের অন্যতম পরিচিত ব্যবসায়ী রায় বাহাদুর বিক্রমবাবু।
ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিতেও তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল। বড় বড় নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা, এলাকায় তাঁর কথার দাম—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের চোখে তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি।
কিন্তু সেই সম্মানের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অন্ধকার জীবন।
একদিন সকালে বিক্রমবাবু একটি ব্যাংকে গেলেন টাকা জমা দিতে। সঙ্গে ছিল একটি কালো চামড়ার ব্যাগ।
ব্যাগের ভিতরে ছিল—
- ৫০,০০০ টাকা
- একটি ব্যক্তিগত ডাইরি
- একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি
সেই সময় ব্যাংকে CCTV ব্যবস্থা চালু ছিল না।
তাই ব্যাংকের ভেতরে কোনো কিছু হারিয়ে গেলে তার কোনো দৃশ্যমান রেকর্ড থাকত না—কে কোথায় গেল, কীভাবে জিনিসটি হারাল, পরে তা খুঁজে বের করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
টাকা জমা দেওয়ার তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে আসার সময় বিক্রমবাবু বুঝতেই পারলেন না—ব্যাগটি কোথায় পড়ে গেছে।
বাড়ি ফিরে ব্যাগটি না পেয়ে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন।
টাকার জন্য যতটা না চিন্তা, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় ছিল ডাইরি আর চিঠির জন্য।
কারণ ডাইরিটি ছিল তাঁর নিজের হাতে লেখা এক গোপন ইতিহাস।
সেখানে ছিল তাঁর দলের তরুণ কর্মী বিশ্বজিৎ-এর মৃত্যুর রহস্য। বিশ্বজিতের স্ত্রী রেখার সঙ্গে বিক্রমবাবুর সম্পর্ক, তাকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, উপহার—সবকিছুর বিবরণ ছিল।
বিশ্বজিতের মৃত্যুর পেছনে যে তাঁরই হাত ছিল, তার ইঙ্গিতও ছিল সেই ডাইরিতে।
শুধু রেখা নয়, আরও কয়েকজন নারীর জীবনে কীভাবে তিনি নিজের প্রভাব ব্যবহার করেছিলেন, তারও বিবরণ ছিল।
সেই সঙ্গে ছিল জমি-সম্পত্তির কিছু পুরোনো হিসাব—কোন পরিবারের কাছ থেকে কীভাবে কাগজ হাতে এসেছিল, তার বিবরণ।
চিঠিটিও ছিল সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
তাই সেদিন রাতে বিক্রমবাবুর মনে একটাই ভয়—
“ডাইরিটা যদি ভুল মানুষের হাতে পড়ে?”
পরদিন দুপুরে তাঁর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল একজন।
নাম নিবারণ।
তার হাতে সেই কালো ব্যাগ।
বিক্রমবাবু ব্যাগটি খুলে দেখলেন—পুরো ৫০,০০০ টাকা আছে।
কিন্তু ডাইরি নেই।
চিঠিও নেই।
তিনি নিবারণের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “ডাইরি আর চিঠিটা কোথায়?”
নিবারণ শান্তভাবে উত্তর দিল,
— “আমার কাছে।”
বিক্রমবাবুর মুখ শুকিয়ে গেল।
— “তুমি কী চাও?”
নিবারণ শান্ত গলায় বলল,
— “টাকা নয়।”
সে একটু থেমে বলল,
— “আমার পরিচিত চারজন বেকার যুবক আছে। ওদের একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিন।”
বিক্রমবাবু সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেন না।
— “চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা আমার হাতে নেই।”
নিবারণ বুঝেছিল, এই পথ সহজ হবে না।
তবে সে আগেই নিজের হিসাব করে রেখেছিল।
চারজনের চাকরি যদি বিক্রমবাবুর প্রভাব খাটিয়ে করিয়ে দিতে পারে, তাহলে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। চারজন মিলিয়ে চার লাখ টাকা—যার পুরোটাই সে নিজের কাছে রাখবে।
কিন্তু বিক্রমবাবু যদি চাকরির ব্যবস্থা করতে রাজি না হন?
সেই সম্ভাবনাটাও নিবারণ হিসাবের বাইরে রাখেনি।
তখন তার দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল—চারজনের নামে প্রতি মাসে ৮,০০০ টাকা করে আদায় করা।
প্রত্যেক যুবককে সে দেবে মাত্র ১,০০০ টাকা করে।
বাকি ৪,০০০ টাকা সে নিজের কমিশন হিসেবে রেখে দেবে।
তবে এই হিসাবের কথা চার যুবককে জানানো হবে না।
নিবারণের কাছে ব্যাপারটা ছিল খুব পরিষ্কার—
“চাকরি হলে একবারে চার লাখ। চাকরি না হলে প্রতি মাসে চার হাজার।”
বিক্রমবাবু শেষ পর্যন্ত চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।
নিবারণ তখন তার দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি সামনে আনল।
বিক্রমবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর নিবারণ শান্ত গলায় বলল,
— “আপনি যদি চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারেন, তাহলে একটা অন্য ব্যবস্থা করা যায়।”
বিক্রমবাবু তাকালেন।
— “কী ব্যবস্থা?”
নিবারণ বলল,
— “ওরা চারজন সারাদিন আপনার সঙ্গে থাকবে। আপনি যেখানে যাবেন, ওরা আশেপাশে থাকবে। কোনো বিপদ হলে আপনাকে রক্ষা করবে। আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব ওদের।”
বিক্রমবাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন,
— “আর তার বিনিময়ে?”
নিবারণ বলল,
— “আপনি আমাকে মাসে ৮,০০০ টাকা দেবেন। আমি ওদের দিয়ে দেব।”
বিক্রমবাবু কিছুক্ষণ নীরবে নিবারণের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নিবারণ আবার বলল,
— “ওরা আপনার কাছ থেকে সরাসরি কিছু চাইবে না। আমি সব সামলে নেব।”
শেষ পর্যন্ত বিক্রমবাবু রাজি হলেন।
একটি গোপন চুক্তি হল—
বিক্রমবাবু প্রতি মাসে ৮,০০০ টাকা নিবারণকে দেবেন, আর নিবারণ সেই টাকার বিনিময়ে চারজন যুবককে দিয়ে দিনের বেলা বিক্রমবাবুর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে।
নিবারণ জানত—বিক্রমবাবু যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এই চুক্তি থেকে তার নিজেরও একটি নিয়মিত আয় থাকবে।
নিবারণ ডাইরি ও চিঠি নিজের কাছে রাখবে।
বিক্রমবাবু জানতেন, এই চুক্তি তাঁর জন্য মুক্তি নয়।
এটি ছিল তাঁর গোপন অতীতের মূল্য।
কিন্তু তিনি জানতেন না—
নিবারণও পুরো সত্যটা কাউকে জানায়নি।
পর্ব ৪
চার পাহারাদার
বিক্রমবাবুর সঙ্গে নিবারণের সেই অদ্ভুত চুক্তির পর কয়েকদিন কেটে গেল।
নিবারণ বুঝেছিল, ডাইরি আর চিঠি তার হাতে থাকলেও বিক্রমবাবুর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নিরাপদ নয়। মানুষটি প্রভাবশালী। তার শত্রু কম নয়। কখন কোথা থেকে বিপদ আসে, বলা যায় না।
তাই নিবারণ চারজন বেকার যুবককে ডেকে পাঠালো,
চারজনই ভেবেছিল, হয়তো অবশেষে তাদের চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে।
নিবারণ তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “চাকরি এখনই হচ্ছে না। তবে একটা কাজ আছে।”
একজন জিজ্ঞেস করল,
— “কী কাজ?”
নিবারণ বলল,
— “বিক্রমবাবুর দিনের বেলা নজর রাখবে। উনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে দেখা করছেন—সেটা খেয়াল রাখবে। কোনো বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করবে।”
চারজন পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল।
নিবারণ বলল,
— “প্রত্যেকে মাসে ১,০০০ টাকা করে পাবে।”
একজন একটু অবাক হয়ে বলল,
— “শুধু দিনের বেলা?”
নিবারণ মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ। রাতে তোমাদের থাকতে হবে না।”
চারজনই রাজি হয়ে গেল।
তারা জানত না, বিক্রমবাবু তাদের জন্য প্রতি মাসে মোট কত টাকা দিচ্ছেন।
তারা শুধু জানত—এই কাজের বিনিময়ে প্রত্যেকে ১,০০০ টাকা পাবে।
আর নিবারণ?
তার নিজের হিসাব সে কাউকেই জানাল না।
চারজনের ভাগের নামে আসা টাকার অর্ধেক তার নিজের পকেটে যাবে—এই পরিকল্পনাই ছিল তার আসল উদ্দেশ্য।
পরদিন থেকেই পাহারার কাজ শুরু হল।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চারজন চারদিকে ছড়িয়ে থাকত।
কেউ চায়ের দোকানের সামনে বসে থাকত, কেউ রাস্তার মোড়ে, কেউ বিক্রমবাবুর অফিসের আশেপাশে।
বিক্রমবাবু কোথাও গেলে তারাও দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করত।
তবে বিক্রমবাবু জানতেন না যে এই চারজনকে নিবারণ তাঁর নিরাপত্তার জন্য রেখেছে।
বিক্রমবাবু একদিন চার যুবককে আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখে নিবারণকে জিজ্ঞেস করলেন,
— “ওরা আবার কারা?”
নিবারণ বলল,
— “ওরা এলাকার ছেলেরা।”
বিক্রমবাবু কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
— “ঠিক আছে। তোমরা দূরত্ব বজায় রেখে থাকবে। কাউকে বুঝতে দেবে না যে তোমরা আমার পাহারায় আছ।”
চার যুবক মাথা নাড়ল।
নিবারণ বলল,
— “ওরা দিনের বেলায় সবসময় আপনার আশেপাশেই থাকবে। আপনি কোথাও গেলে দূর থেকে অনুসরণ করবে।”
বিক্রমবাবু আর কিছু বললেন না।
তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি ও ব্যবসার কারণে নিরাপত্তা নিয়ে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। তাই বিষয়টিকে তিনি খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না।
কিন্তু তিনি জানতেন না—এই চার যুবকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিবারণের নিজের স্বার্থও।
বিক্রমবাবু আর প্রশ্ন করতেন না।
একটি বিষয় অবশ্য শুরু থেকেই পরিষ্কার ছিল।
রাতে পাহারা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
সন্ধ্যার পর চারজন নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেত।
নিবারণও তাদের কখনও রাতে থাকতে বলেনি।
কারণ তার হিসাব ছিল অন্যরকম।
বিক্রমবাবু যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিনই তার গোপন চুক্তি থেকে টাকা আসবে।
তাই বিক্রমবাবুর কোনো বিপদ হওয়া নিবারণের নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেই ছিল।
কিন্তু হিসাবটা আরও গভীর ছিল।
চুক্তির অঙ্ক ছিল ৮,০০০ টাকা।
চারজনের হাতে পৌঁছত মোট ৪,০০০ টাকা।
বাকি ৪,০০০ টাকা নিবারণ নিজের কাছে রেখে দিত।
চার যুবক ভাবত, বিক্রমবাবু নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সাহায্য করছেন।
তারা শুধু জানত—
দিনে পাহারা দিতে হবে, মাসে ১,০০০ টাকা পাওয়া যাবে। নিবারণের সঙ্গে তাদের সেই কথা হয়েছে।
এদিকে সেই শহরেই অয়নের দিন কাটছিল কারখানা আর ভাড়া বাড়ির মধ্যে।
সুধা দেবী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
কিন্তু অয়নের ভিতরে একটা কথা কাঁটার মতো বিঁধে ছিল।
বিশাখার বাবার জমি।
তার নিজের বাবার নাম।
কোনো একটি ব্যবসায়িক কাজে বিক্রমবাবু সেই শহরে এসেছিলেন।
সেদিন কাজের শেষে অয়ন জানতে পারল, বিক্রমবাবু কাছেই তাঁর অফিসে এসেছেন।
অয়ন কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে অফিসের রাস্তার ওপারে গিয়ে দাঁড়াল।
দূর থেকে সে সেই পরিচিত মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল—
রায় বাহাদুর বিক্রমবাবু।
তার বাবা।
কিন্তু বিক্রমবাবু জানতেন না, তাঁর ছেলে অয়ন এই শহরেই আছে।
দূর থেকে সে দেখল—তাঁর বাবা গাড়ি থেকে নামছেন।
লোকজন এগিয়ে এসে হাত মেলাচ্ছে। কেউ হাসিমুখে কথা বলছে, কেউ সম্মান জানাচ্ছে।
অয়ন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও তার চোখ বারবার আটকে যাচ্ছিল সেই মানুষটির দিকে—
যার পরিচয় এতদিন তার কাছে ছিল গর্বের, অথচ এখন সেই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে একের পর এক অজানা প্রশ্ন।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল আরেকটি ছেলে।
রোগা। বয়স অল্প। রাস্তার উল্টো দিকের একটি পুরোনো দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সেও একদৃষ্টিতে বিক্রমবাবুর দিকে তাকিয়ে।
অয়নের সঙ্গে হঠাৎ ছেলেটির চোখাচোখি হয়ে গেল।
এক মুহূর্ত।
তারপর ছেলেটি দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সেখান থেকে সরে গেল।
অয়ন তাকে চিনত না।
সে জানত না—এই ছেলেটির চোখেও বিক্রমবাবুকে ঘিরে রয়েছে এক পুরোনো হিসাব।
কী সেই হিসাব, তা অয়ন তখনও জানত না।
শুধু ছেলেটির মনে তখন একটিই নাম ঘুরছিল—
বিক্রমবাবু।
পর্ব ৫
আগুনের শুরু
সেই শহরে শীতে পাড়ার মাঠে একটি নাটক হল।
বাঁশের কাঠামো, টিনের ছাউনি, মঞ্চের দু’পাশে দুটি আলো।
টিকিট লাগত না।
বিশাখা বলেছিল,
— “চলুন, এখানে প্রতি বছর নাটক হয়। ভালো লাগবে।”
অয়ন রাজি হল।
তারা যখন পৌঁছল, তখন সামনের সারি ভরে গেছে।
দুজনে পিছনের দিকে বসল।
কয়েক সারি সামনে, একপাশে বসে ছিল সেই রোগা ছেলেটি।
অয়ন তাকে আগেও দেখেছে—বিক্রমবাবুর অফিসের রাস্তার ওপারে।
কিন্তু সেদিন সে আর ভাবল না।
আলো নিভে গেল।
নাটকের গল্পে ছিল একজন অত্যাচারী মানুষ।
তার অন্যায়ের কারণে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।
জমি যায়। মামলা চলে। বাড়ির কর্তা মারা যান।
শেষ দৃশ্যে সেই পরিবারের এক যুবক অত্যাচারীকে হত্যা করে।
মঞ্চে আলো লাল হয়ে গেল।
দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ হাততালি দিল।
দু’জন তরুণ তখন দুই জায়গায় বসে একই দৃশ্য দেখছিল।
একজন বিশাখার পাশে।
আরেকজন একা।
নাটক শেষ হওয়ার পর অভিনেতারা দর্শকদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
একজন বললেন,
— “নাটক শুধু বিনোদন নয়।”
আরেকজন বললেন,
— “ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছেন, নাটকে লোকশিক্ষা হয়।”
তারপর তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করলেন।
সেই একই কথা সেদিন দুই তরুণের কানে পৌঁছল।
অয়ন
বাড়ি ফেরার পথে অয়ন চুপ করে ছিল।
তার মাথায় ঘুরছিল মঞ্চের সেই শেষ দৃশ্য।
একটি পরিবার। একটি জমি। একজন অত্যাচারী।
সে জানত, ওই গল্পটা কারও কল্পনা নয়।
ওই গল্পটা তার পাশে হাঁটতে থাকা মেয়েটির নিজের জীবন।
আর অত্যাচারী মানুষটি তার নিজের বাবা।
হঠাৎ তার ভিতরে একটা রাগ উঠে এল—এমন রাগ, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি।
বাবার ওপর রাগ। নিজের ওপর রাগ।
তার মনে হল, এখনই গিয়ে সব ভেঙে দেয়।
ঠিক তখনই বিশাখা বলল,
— “নাটকটা ভালো ছিল, না?”
অয়ন তার দিকে তাকাল।
যে মেয়েটির সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সে হাসছে।
যে মেয়েটির একশো টাকা ফেরত দেওয়ার কথা কেউ জানতেও পারত না, সে নিজে গিয়ে ফেরত দিয়ে এসেছিল।
অয়ন ধীরে বলল,
— “তোমার রাগ হয় না?”
বিশাখা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “হয়। রোজ হয়।”
— “তাহলে?”
— “রাগ দিয়ে বাবাকে ফিরে পাব না। আর আমার মা এখনও বেঁচে আছেন।”
অয়ন আর কিছু বলল না।
সেই রাতে সে ঘুমোতে পারল না।
কিন্তু ভোরবেলা উঠে সে কারখানায় গেল।
তার ভিতরের আগুনটা নিভল না।
সে শুধু ঠিক করল, ওই আগুন দিয়ে সে কাউকে পোড়াবে না।
অচিন্ত
মাঠের অন্য প্রান্তে, অয়নকে না জানিয়েই, আরেকটি তরুণের ভিতরে জমে থাকা বহু বছরের ক্ষোভ তখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায়।
সবাই উঠে চলে যাওয়ার পরও সে বসে রইল।
তার নাম অচিন্ত।
বয়স তখনও আঠেরো পূর্ণ হয়নি।
তার পাশে কোনো বিশাখা ছিল না।
তাকে থামানোর মতো কারও গলা সেই রাতে শোনা গেল না।
মঞ্চের কথাগুলো তার কানে অন্যভাবে বাজছিল।
অভিনেতারা বলেছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়।
অচিন্ত শুনল—
“আমার জীবনে যে অন্যায় হয়েছে, তার বিচার আমাকেই করতে হবে।”
একই মঞ্চ।
একই কথা।
কিন্তু দুই কানে দুই অর্থ।
সেই রাতেই তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেল।
পরের কয়েকদিন সে রোজ বিক্রমবাবুর বাড়ি আর অফিসের আশেপাশে ঘুরল।
সকালে দেখত—চারজন যুবক চারদিকে ছড়িয়ে বসে আছে। কেউ চায়ের দোকানে, কেউ মোড়ে, কেউ অফিসের সামনে। বিক্রমবাবু যেখানে যান, তারা দূর থেকে পিছু নেয়।
সন্ধ্যা নামলে দেখত—একে একে চারজনই উঠে চলে যায়।
রাতে বাড়ির সামনে কেউ থাকে না।
অচিন্ত সবই খেয়াল করল। অন্ধকারে সুযোগ ছিল।
কিন্তু সে রাত বেছে নিল না।
তার মনে হয়েছিল, সে যা করতে যাচ্ছে তা বিচার। আর বিচার লুকিয়ে করতে নেই—সবার সামনে করতে হয়।
নাটকের কথাটার ভুল অর্থই তখন তার কাছে একমাত্র অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কেন অচিন্তের বুকের ভিতর ওই নামটা বছরের পর বছর জ্বলছিল, তা তখনও কেউ জানত না।
পুলিশও না। অয়নও না।
সেই কারণ প্রকাশ পেতে আরও কিছুদিন বাকি ছিল।
পর্ব ৬
শেষ শিক্ষা
ঘটনাটি ঘটল প্রকাশ্য দিবালোকে।
দুপুরের পর বিক্রমবাবু একটি কাজে বেরিয়েছিলেন।
চার পাহারাদার আগের মতোই নিজেদের জায়গায় ছিল।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে অচিন্ত বিক্রমবাবুর একেবারে কাছে পৌঁছে গেল।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আঘাত করল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ঘটে গেল।
একটি আক্রমণ।
চিৎকার।
মানুষের দৌড়াদৌড়ি।
বিক্রমবাবু মাটিতে পড়ে গেলেন।
চারজন পাহারাদার ছুটে এল।
কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
বিক্রমবাবু মারা গেছেন।
চারদিকে হইচই শুরু হয়ে গেল।
অচিন্ত আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
ভিড় ঠেলে সে দ্রুত সরে গেল।
চারজন পাহারাদারও তাকে দেখতে পেয়ে তার পিছু নিল।
পুলিশ আসার আগেই অচিন্ত পৌঁছে গেল সেই থিয়েটারের অফিসে—যেখানে কয়েকদিন আগে সে নাটকটি দেখেছিল।
অচিন্ত দ্রুত থিয়েটারের অফিসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
তার এক হাতে তখনও ছিল রক্তমাখা ছুরিটি।
চারজন পাহারাদার কিছু দূর পিছন থেকে তাকে অনুসরণ করছিল। তারা বুঝতে পারছিল, ছেলেটিই বিক্রমবাবুর ওপর হামলা করেছে।
অচিন্ত হাঁপাতে হাঁপাতে থিয়েটারের অফিসের দরজায় এসে দাঁড়াল।
ভিতরে তখন পরের নাটকের মহড়া চলছিল।
অচিন্ত দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
— “আপনাদের সঙ্গে আমার কথা আছে।”
ঘরের সবাই তার দিকে তাকাল। তার হাতে রক্তমাখা ছুরিটি দেখে কয়েকজন আতঙ্কিত হয়ে উঠল।
একজন অভিনেতা এগিয়ে এসে বললেন,
— “কী হয়েছে? তোমার হাতে ওটা কী?”
অচিন্ত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— “আমি আপনাদের নাটক দেখেই বদলা নিয়েছি।”
ঘরের মধ্যে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
একজন প্রবীণ অভিনেতা অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুমি কী বলছ?”
অচিন্তের চোখে তখন অদ্ভুত এক স্থিরতা। সে ধীরে ধীরে বলল,
— “নাটকে লোকশিক্ষা হয়।”
কথাটা শুনে ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই চারজন পাহারাদার সেখানে এসে পৌঁছাল।
তাদের একজন থিয়েটারের লোকদের বলল,
— “এই ছেলেটিই বিক্রমবাবুর ওপর হামলা করেছে।”
থিয়েটারের লোকেরা আর কোনো ঝুঁকি নিল না। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেওয়া হল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে অচিন্তকে আটক করল।
অচিন্ত নিজের কাজ অস্বীকার করল না।
পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করল,
— “তুমি বিক্রমবাবুকে কেন আক্রমণ করলে?”
অচিন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আমি যা করেছি, করেছি। কিন্তু কেন করেছি, সেটা আপনাদের জানতে হবে।”
পুলিশ অচিন্তকে নিয়ে থানার উদ্দেশে রওনা দিল।
চার পাহারাদার কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর তারা নীরবে থিয়েটার থেকে চলে গেল।
তাদের কাজ ছিল বিক্রমবাবুর নিরাপত্তা দেওয়া।
কিন্তু যাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছিল, সেই মানুষটিই আর বেঁচে নেই।
পরদিন সকালে কারখানায় কাজ শুরুর আগে এক সহকর্মী মোবাইলের পর্দা সবার দিকে ঘুরিয়ে ধরল।
— “দেখেছ? শহরের সেই বড় ব্যবসায়ী, বিক্রমবাবু। কাল দিনের বেলা রাস্তার মাঝখানে...”
কেউ একজন বলল,
— “যেমন কর্ম, তেমন ফল।”
আরেকজন নিচু গলায় বলল,
— “ওর কীর্তি সবাই জানত। শুধু কেউ মুখ খুলত না।”
সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে অয়নও খবরটা শুনছিল।
কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যে একমাত্র অয়নই জানত—
বিক্রমবাবু তার বাবা।
কথাগুলো শুনতে শুনতে তার বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে উঠল।
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল বিশাখা।
খবরটা শুনে সে চুপ করে গেল।
না আনন্দ, না দুঃখ—শুধু তার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল মোবাইলের পর্দায়।
অয়ন একবার তার দিকে তাকাল।
কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
অন্যদিকে, বিক্রমবাবুর মৃত্যুর খবর তাঁর বাড়িতেও পৌঁছে গিয়েছিল।
অয়নের মা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন।
বিক্রমবাবুর মৃত্যু তাঁর কাছে শুধু স্বামীর মৃত্যু ছিল না।
এ যেন বহু বছর ধরে লুকিয়ে রাখা কিছু সত্যের দরজা হঠাৎ খুলে যাওয়া।
তিনি জানতেন, বিক্রমবাবুর অতীতের অনেক কথা একদিন প্রকাশ্যে আসবেই।
আর এতদিন ধরে তিনি নিজের ছেলেকে সেই অতীতের ছায়া থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন।
অয়নকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু তার অপচয় ছিল না।
মায়ের মনে আরও গভীর একটি ভয় ছিল—
ছেলেটিও যেন একদিন বাবার পথেই না হাঁটে।
তিনি অয়নকে ফোন করলেন।
— “অয়ন, তুমি যেখানে আছ, সেখানেই থাকো।”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “মা... আমি খবরটা পেয়েছি।”
মা আর কিছু বললেন না।
দুজনের মাঝখানে কিছুক্ষণ শুধু নীরবতা।
অয়ন ধীরে বলল,
— “তুমি কি বাবার সম্পর্কে সব জানতে?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “সব নয়। কিন্তু যতটা জানতাম, ততটাই ভয় পেতাম তোমাকে নিয়ে।”
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
মা বললেন,
— “তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম শুধু তোমার টাকা খরচ করার জন্য নয়। আমি চেয়েছিলাম তুমি নিজের জীবন নিজের হাতে তৈরি করো। তোমার বাবার পরিচয় বা তাঁর পথ—কোনোটাই যেন তোমাকে নিয়ন্ত্রণ না করে।”
অয়ন আর কোনো উত্তর দিল না।
ফোন রেখে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার মনে পড়ল বিশাখার মায়ের কথা।
তারপর অচিন্তের কথা।
তারপর বাবার মুখ।
সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা।
একজন মানুষের অতীত—কতগুলো মানুষের বর্তমানকে বদলে দিতে পারে!
অয়ন জানত, সত্যটা আর বেশিদিন চেপে রাখা যাবে না।
কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাখাকে সে এখনও বলতে পারল না—
সে আসলে কার ছেলে।
কিন্তু সে বুঝল, সত্যটা আর বেশিদিন চেপে রাখা যাবে না।
বিক্রমবাবুর মৃত্যুর পরদিন চার যুবক নিবারণের কাছে গেল।
একজন বলল,
— “দাদা, এখন আমাদের কী হবে?”
নিবারণ ধীরে মাথা নাড়ল।
— “তোমাদের টাকা আর দেওয়া হবে না।”
— “আমরা তো কাজটা করতাম...”
— “মানুষটাই যখন নেই, তখন পাহারা কাকে দেবে?”
চারজন আর কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কিন্তু নিবারণ তখন অন্য কথা ভাবছিল।
বিক্রমবাবু নেই।
তার মানে ডাইরি আর চিঠি এখন আর কোনো নিরাপত্তা নয়—বিপদ।
এই দুটি জিনিস যদি ভুল মানুষের হাতে যায়, তাহলে শুধু বিক্রমবাবুর অতীত নয়—
নিবারণের নিজের গোপন হিসাবও প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে।
সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল।
পরদিন সে চার যুবককে ডেকে ডাইরি ও চিঠিটি তাদের হাতে দিল।
— “এগুলো থানায় জমা দিয়ে এসো।”
— “কী বলব?”
— “বলবে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলে। বিক্রমবাবুর ভয়ে এতদিন জমা দিতে পারোনি।”
চারজন ভয় পেলেও রাজি হল।
পরদিন তারা থানায় গিয়ে ডাইরি ও চিঠি জমা দিল।
পুলিশ ডাইরির কয়েকটি পাতা পড়তেই বুঝল, বিষয়টি সাধারণ নয়।
একজন মৃত ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত ডাইরি থেকে উঠে আসছে বহু পুরোনো ঘটনা।
বিশ্বজিৎ।
রেখা।
আরও কয়েকজন নারী।
চাকরির প্রতিশ্রুতি।
উপহার।
জমির কাগজ।
ক্ষমতার অপব্যবহার।
তদন্তের দিক বদলে গেল।
এবং একটি প্রশ্ন সামনে এল—
ডাইরিটি এতদিন কার কাছে ছিল?
থানায় ডাকা হল চার যুবককে।
— “রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলে? কোন রাস্তায়?”
একজন বলল, বাজারের কাছে। আরেকজন বলল, স্টেশনের পাশে।
তদন্তকারী কিছু বললেন না। শুধু খাতায় কী একটা লিখলেন।
— “বিক্রমবাবুর সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক কী ছিল?”
— “আমরা তাঁকে পাহারা দিতাম, স্যার। দিনের বেলা।”
— “কে রেখেছিল?”
— “নিবারণদা।”
— “কত টাকা পেতে?”
— “আমরা তো প্রত্যেকে মাত্র ১,০০০ টাকা করে পেতাম।”
তদন্তকারী এবার একটি কাগজ টেবিলে রাখলেন।
বিক্রমবাবুর ব্যাংক-হিসাবের বিবরণ। প্রতি মাসের একই তারিখে নগদ তোলা হয়েছে ৮,০০০ টাকা।
চার যুবক কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
— “চারজনের ১,০০০ করে মোট ৪,০০০।”
তদন্তকারী মুখ তুললেন।
তাহলে বাকি টাকা কোথায় যেত?
নিবারণকে ডাকা হল।
প্রথমে সে সবকিছু এড়িয়ে গেল। ডাইরির কথা জিজ্ঞেস করলে বলল, সে কিছু জানে না—ছেলেরা নিজেরাই ওটা পেয়েছে।
তারপর তদন্তকারী বললেন,
— “বিক্রমবাবুর কাছ থেকে মাসে কত টাকা নেওয়া হত?”
নিবারণ থেমে গেল।
দরজার বাইরে চার যুবক দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সব শুনল।
এতদিন তারা ভেবেছিল, লোকটি তাদের উপকার করছে।
একজনের চোখে জল এসে গেল।
বড় অন্যায়ের ছায়াতেই ছোট অন্যায় বাসা বেঁধেছিল।
এদিকে তদন্তে অচিন্তের অতীত উঠে এল।
বহু বছর আগে তার বাবা বিক্রমবাবুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
তারপর একদিন তিনি মারা যান।
ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু বিক্রমবাবুর প্রভাবের কারণে সেগুলো চাপা পড়ে যায়।
স্বামীর মৃত্যুর পর অচিন্তের মা আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত তিনিও চলে যান।
এই পুরোনো ক্ষত থেকেই অচিন্তের ভিতরে প্রতিশোধের আগুন তৈরি হয়েছিল।
অচিন্তের বয়স আঠেরোর কম হওয়ায় তার মামলাটি কিশোর বিচারব্যবস্থার অধীনে বিবেচিত হল।
তার বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং পুনর্বাসনের প্রশ্নও গুরুত্ব পেল।
কিছুদিন পর রেখাদেবী থানায় গিয়ে ডাইরির পাতাগুলো পড়লেন।
বিশ্বজিতের নাম।
তাঁর নিজের নাম।
বছরের পর বছর যে সত্যটি তাঁকে ভিতর থেকে পোড়াচ্ছিল, এবার তার লিখিত প্রমাণ তাঁর সামনে।
তারপর তিনি অচিন্তের কথা জানতে পারলেন।
তিনি তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন।
অচিন্তকে সামনে আনা হল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
রেখা বললেন,
— “তুমি যা করেছ, সেটা আমি সমর্থন করি না।”
অচিন্ত মাথা নিচু করল।
— “জানি।”
— “কিন্তু তোমার সঙ্গে কী হয়েছিল, সেটাও এখন আমি জানি।”
অচিন্তের চোখ ভিজে উঠল।
— “আমার কেউ নেই।”
রেখা ধীরে বললেন,
— “এখন থেকে তুমি একা থাকবে না।”
একদিন অচিন্ত তাঁকে জিজ্ঞেস করল,
— “তাহলে নাটকে যা দেখেছিলাম?”
রেখা বললেন,
— “নাটক তোমাকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে। কিন্তু তোমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।”
তারপর বললেন,
— “সেই রাতে ওই মাঠে আরও অনেকে বসে ছিল। একই কথা তারাও শুনেছিল।”
অচিন্ত চুপ করে রইল।
সেই রাতের পর এই প্রথম তার মনে একটা প্রশ্ন জাগল।
সেদিন মাঠে বসে সে যা শুনেছিল, সেটাই কি সবটুকু ছিল?
পর্ব ৭
পরিচয়ের ভার
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
সুধা দেবীর পুরোনো বাড়ির উঠোনে বিশাখা একা বসে ছিল।
তার সামনে টেবিলের ওপর রাখা কয়েকটি কাগজ।
সম্পত্তির দলিল।
যে সম্পত্তি একসময় তাদের পরিবারের ছিল।
যে সম্পত্তির কথা তার মা বহু বছর কাউকে বলেননি।
আর সেই কাগজগুলোর পাশে রাখা অয়নকে নিয়ে একটি ফাইল।
বিশাখা ফাইলটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার হাত কাঁপছিল।
কারণ আজ সে এমন একটি সত্য জেনেছে, যা তার কাছে অয়নের পুরো পরিচয়টাকেই বদলে দিয়েছে।
অয়ন—
বিক্রমবাবুর ছেলে।
ঠিক তখনই বাড়ির দরজায় একটি গাড়ি এসে থামল।
বিশাখা মুখ তুলে তাকাল।
গাড়ি থেকে একজন মহিলা ধীরে ধীরে নামলেন।
তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর বিষণ্ণতা।
তিনি চারপাশে একবার তাকিয়ে এগিয়ে এলেন।
বিশাখা উঠে দাঁড়াল।
— “আপনি?”
মহিলা কিছুক্ষণ বিশাখার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর শান্ত গলায় বললেন,
— “আমি অয়নের মা।”
বিশাখার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।
অবশেষে বিশাখা বলল,
— “আপনি এখানে কেন এসেছেন?”
অয়নের মা ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন।
দলিলগুলোর দিকে তাকালেন।
তারপর অয়নের ফাইলটির দিকে।
তাঁর চোখে জল এসে গেল।
— “এই কাগজগুলো তোমাদের কাছে থাকার কথা ছিল।”
বিশাখা চুপ করে রইল।
অয়নের মা বললেন,
— “আমি জানি, তোমাদের পরিবারের সঙ্গে কী হয়েছে। অনেক কিছু জানতাম। সবকিছু থামানোর ক্ষমতা হয়তো আমার ছিল না... কিন্তু আমি চুপ থেকেছি। সেটাও আমার অপরাধ।”
বিশাখা ধীরে জিজ্ঞেস করল,
— “অয়ন কি জানে?”
মহিলা মাথা নাড়লেন।
— “সবটা নয়। কিন্তু এখন আর তাকে সত্য থেকে দূরে রাখা যাবে না।”
বিশাখার চোখ অয়নের ফাইলের দিকে চলে গেল।
অয়নের মুখ মনে পড়ল।
তার সততা, পরিশ্রম, মায়ের চিকিৎসার সময় তার পাশে দাঁড়ানো—সবকিছু।
কিন্তু সেই মানুষটির বাবা ছিল সেই বিক্রমবাবু, যাঁর কারণে তাদের পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছিল।
বিশাখার ভিতরে যেন দুটি মানুষ লড়াই করছিল।
একজন বলছিল—
“সে বিক্রমবাবুর ছেলে।”
অন্যজন নিঃশব্দে বলছিল—
“কিন্তু সে অয়ন।”
অয়নের মা ধীরে বললেন,
— “আমি আজ তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে আসিনি। কারণ কিছু ক্ষতির জন্য শুধু ক্ষমা চাইলেই তা পূরণ হয় না।”
তিনি দলিলগুলোর দিকে তাকালেন।
— “আমি যা পারি, তা ফিরিয়ে দিতে চাই।”
বিশাখা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
মহিলা বললেন,
— “যে সম্পত্তি অন্যায়ভাবে তোমাদের কাছ থেকে চলে গিয়েছিল, তার হিসাব আমি দেখেছি। যতটা সম্ভব, সব ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করব।”
বিশাখার চোখ ভিজে উঠল।
কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না।
কারণ সম্পত্তির কাগজের চেয়েও বড় প্রশ্নটি তখন তার সামনে দাঁড়িয়ে—
সে কি অয়নকে তার বাবার অপরাধ দিয়ে বিচার করবে?
নাকি অয়নকে তার নিজের পরিচয়ে চিনবে?
বিশাখার চোখের সামনে একের পর এক পুরোনো দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল।
বাবার মুখ।
বাবার অসহায়তা।
মায়ের কান্না।
বাড়ি হারানোর দিনগুলো।
অভাবের সংসার।
আর সেই নাম—
বিক্রমবাবু।
যে মানুষটির নাম শুনলেই এতদিন তার বুকের ভিতর একটা চাপা রাগ তৈরি হত।
আজ সেই মানুষটির ছেলেটিই তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ।
বিশাখা নিজের মনেই বলল,
— “তাহলে অয়ন কে?”
সে নিজেই উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করল।
বিক্রমবাবুর ছেলে?
নাকি সেই অয়ন, যে নিজের বাবার পরিচয় গোপন করে আমাদের বাড়িতে এসেছিল?
হঠাৎ তার মনে পড়ল প্রথম দিনের কথা।
অয়ন তখন চাকরি খুঁজে পাচ্ছিল না।
পকেটে টাকা শেষ। মুখে হতাশা।
তবু কারও কাছে নিজের বাবার নাম বলেনি।
বিশাখাই তাকে কারখানায় কাজের সুযোগ করে দিয়েছিল।
তারপর সে দেখেছে—অয়ন কীভাবে বদলে গেছে।
যে ছেলে একসময় লাখ লাখ টাকা খরচ করত, সেই ছেলে নিজের হাতে পরিশ্রম করে টাকা জমিয়েছে।
কাজে ভুল হলে দায়িত্ব নিয়েছে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
কাউকে ঠকানোর চেষ্টা করেনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা—সুধা দেবীর চিকিৎসার সময় নিজের সঞ্চয় নিয়ে এক মুহূর্তও ভাবেনি।
বিশাখা চোখ বন্ধ করল।
মনের ভিতর যেন দুটি কণ্ঠ কথা বলছে।
একটি বলছে—
“ও বিক্রমবাবুর ছেলে।”
অন্যটি বলছে—
“কিন্তু ও বিক্রমবাবু নয়।”
প্রথম কণ্ঠ আবার বলল—
“যে মানুষের জন্য তোমাদের পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে, তার ছেলেকে কীভাবে তুমি নিজের জীবনসঙ্গী করবে?”
বিশাখার চোখে জল এসে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— “আমি জানি না...”
সেই রাতেই অয়ন তার সঙ্গে দেখা করতে এল।
বিশাখা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।
অয়ন বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।
— “বিশাখা, তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?”
কোনো উত্তর নেই।
অয়ন আবার বলল,
— “মা তোমাদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি সব জেনেছি।”
বিশাখা এবার ধীরে বলল,
— “শুধু সম্পত্তির কথা নয়।”
অয়ন থেমে গেল।
বিশাখা তার দিকে তাকাল। চোখে জল।
— “তুমি আমাকে আগে বলোনি।”
— “তুমি জেনে গেছ?”
বিশাখা মাথা নাড়ল।
— “তুমি... বিক্রমবাবুর ছেলে।”
অয়ন চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হল না।
তারপর অয়ন বলল,
— “হ্যাঁ।”
বিশাখার গলা কেঁপে উঠল।
— “তুমি জানতে যে উনি আমাদের কী করেছিলেন?”
— “সবটা জানতাম না।”
— “কিন্তু তুমি জানতেও পারতে।”
অয়ন চুপ।
বিশাখা বলল,
— “তোমার বাবা আমাদের জীবন শেষ করে দিয়েছিলেন।”
অয়নের চোখেও জল এসে গেল।
— “আমি জানি।”
— “তবু তুমি আমাদের বাড়িতে এলে?”
— “আমি তখন কিছুই জানতাম না তোমাদের সঙ্গে কী হয়েছিল।”
একটু থেমে অয়ন বলল,
— “জানার পরও আমি তোমাদের ছেড়ে যাইনি।”
বিশাখা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অয়ন ধীরে বলল,
— “বিশাখা, আমি আমার বাবাকে বেছে নিইনি।”
— “কিন্তু তাঁর সম্পত্তি পেয়েছ।”
— “হ্যাঁ।”
— “তাঁর নাম পেয়েছ।”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে তাঁর ভুলের ছায়াও তোমার সঙ্গে থাকবে।”
অয়ন মাথা নিচু করল।
— “থাকবে।”
তারপর সরাসরি বিশাখার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কিন্তু আমি তাঁর মতো হতে চাই না।”
বিশাখার চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
অয়ন বলল,
— “তুমি যদি আমাকে প্রত্যাখ্যান করো, আমি তোমাকে দোষ দেব না।”
— “কিন্তু একটা কথা বলব।”
— “কী?”
— “আমার বাবার অন্যায়ের জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা না করলেও চলবে। শুধু আমাকে আমার নিজের কাজ দিয়ে বিচার করো।”
বিশাখা কোনো উত্তর দিল না।
অয়ন চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই বিশাখা বলল,
— “অয়ন।”
সে ফিরে তাকাল।
— “তুমি কি তোমার বাবার সব সম্পত্তি রাখবে?”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “যেটা আইনগতভাবে আমাদের প্রাপ্য নয়, সেটা নয়।”
— “আর আমাদের?”
— “তোমাদের যা অন্যায়ভাবে নেওয়া হয়েছিল, তা তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”
বিশাখা তাকিয়ে রইল।
অয়ন বলল,
— “আমার কাছে সম্পত্তির চেয়ে তোমার পরিবারের সম্মান বড়।”
সেই রাতে বিশাখা মায়ের পাশে বসে ছিল।
সুধা দেবী অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন,
— “তুই অয়নকে ভালোবাসিস?”
বিশাখা মাথা নিচু করল।
অনেকক্ষণ পর বলল,
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে ভয়টা কোথায়?”
বিশাখা মায়ের হাত ধরে বলল,
— “ওর বাবার কথা মনে পড়লে ভয় হয়।”
সুধা দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “তোর বাবার সঙ্গে যা হয়েছে, তার জন্য তোর কষ্ট থাকবে। সেটা কোনোদিন মুছে যাবে না।”
তারপর মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “কিন্তু একজন মানুষের বাবার পাপ আর সেই মানুষের নিজের চরিত্র এক জিনিস নয়।”
বিশাখা মায়ের দিকে তাকাল।
সুধা দেবী বললেন,
— “তুই অয়নকে দেখেছিস। ও কীভাবে বদলেছে, তুই নিজের চোখে দেখেছিস।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর বললেন,
— “সিদ্ধান্তটা তোর।”
সে রাতে বিশাখার ঘুম এল না।
মা ঘুমিয়ে পড়ার পর সে চুপচাপ উঠে এল। ঘরের কোণে রাখা পুরোনো টিনের বাক্সটা খুলল।
ভিতরে বাবার একটা ছবি। ভাঙা কাচের ফ্রেমে বাঁধানো।
বিশাখা অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটি সারাজীবনে কারও একটা পয়সাও ঠকাননি।
বাবার কাছ থেকে সে কী পেয়েছিল?
জমি নয়। বাড়ি নয়। কোনো দলিলে যার নাম লেখা যায় না, এমন কিছু।
সৎ থাকার জেদ। একশো টাকা বেশি এলে ফেরত দিয়ে আসার অভ্যাস।
ছবিটা বুকের কাছে ধরে সে চুপ করে বসে রইল।
তার মনে হল, উত্তরাধিকার তো শুধু সম্পত্তির হয় না।
একজন বাবার কাছ থেকে পেয়েছে সততা। আরেকজন পেয়েছে সম্পত্তি।
প্রশ্ন শুধু একটাই—যা পেয়েছে, তা নিয়ে সে কী করে।
পরের দিন সকালে সুধা দেবীর পুরোনো বাড়ির উঠোনে বিশাখা একা বসে ছিল।
তার সামনে টেবিলের ওপর রাখা কয়েকটি কাগজ।
সম্পত্তির দলিল।
যে সম্পত্তি একসময় তাদের পরিবারের ছিল।
যে সম্পত্তির কথা মা বহু বছর কাউকে বলেননি।
আর সেই কাগজগুলোর পাশে রাখা অয়নকে নিয়ে একটি ফাইল।
বিশাখা ফাইলটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার হাত কাঁপছিল।
কারণ আজ সে এমন একটি সত্য জেনেছে, যা তার কাছে অয়নের পুরো পরিচয়টাকেই বদলে দিয়েছে।
অয়ন—
বিক্রমবাবুর ছেলে।
ঠিক তখনই বাড়ির সামনে একটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামলেন অয়নের মা।
বিশাখা উঠে দাঁড়াল।
অয়নের মা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললেন,
— “সুধা দেবী কি বাড়িতে আছেন?”
বিশাখা তাঁকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল।
সুধা দেবী তাঁকে দেখে অবাক হয়ে বললেন,
— “আপনি এখানে?”
অয়নের মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “আমি আজ একটা কথা বলতে এসেছি।”
সুধা দেবী চুপ করে রইলেন।
অয়নের মা বিশাখার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “আমার ছেলে বদলে গেছে।”
বিশাখা মাথা নিচু করল।
— “যে অয়ন একসময় টাকার মূল্য বুঝত না, সে এখন নিজের হাতে পরিশ্রম করে টাকা উপার্জন করে। অন্যের কষ্ট বোঝে। নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখেছে।”
তিনি একটু থামলেন।
— “আর আমি জানি, এই পরিবর্তনটা সম্ভব হয়েছে তোমার জন্য।”
বিশাখা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
— “আমার জন্য?”
অয়নের মা মৃদু হেসে বললেন,
— “হ্যাঁ। তোমার সততা, তোমার পরিশ্রম আর তোমার মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ অয়নকে বদলে দিয়েছে।”
সুধা দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “কিন্তু আপনার স্বামীর জন্য আমাদের পরিবার যে কষ্ট পেয়েছে...”
অয়নের মা মাথা নিচু করলেন।
— “আমি জানি। সেই অন্যায় আমি অস্বীকার করছি না।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন,
— “তাই আমি চাই, অতীতের অন্যায়ের ভার যেন আমাদের সন্তানদের জীবন নষ্ট না করে।”
তিনি এবার সরাসরি সুধা দেবীর দিকে তাকালেন।
— “আমি বিশাখাকে আমার পুত্রবধূ করতে চাই।”
বিশাখা স্তব্ধ হয়ে গেল।
সুধা দেবীও কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না।
অয়নের মা ধীরে বললেন,
— “আমার সংসার ভেঙে গেছে। অয়নের বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কও অনেক আগেই শুধু নামের মধ্যে বেঁচে ছিল। আমি চাই, অন্তত আমার ছেলের সংসারটা যেন সত্যিকারের সংসার হয়।”
তারপর বিশাখার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুমি যদি রাজি হও, আমি তোমাকে শুধু পুত্রবধূ হিসেবে নয়, নিজের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করব।”
বিশাখার চোখে জল এসে গেল।
সে মায়ের দিকে তাকাল।
সুধা দেবী ধীরে ধীরে তার হাত ধরে বললেন,
— “সিদ্ধান্তটা তোমার।”
বিশাখা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল অয়নের মুখ।
যে অয়ন একদিন নিজের বাবার পরিচয় লুকিয়ে বেঁচেছিল।
যে অয়ন নিজের হাতে কাজ করে বদলে গিয়েছিল।
যে অয়ন তার মায়ের চিকিৎসার জন্য নিজের সঞ্চয় দিতে চেয়েছিল।
আর যে অয়ন নিজের বাবার অন্যায়কে নিজের অধিকার বলে আঁকড়ে ধরেনি।
বিশাখা ধীরে ধীরে চোখের জল মুছে বলল,
— “আমি অয়নকে তার বাবার পরিচয়ে বিচার করতে চাই না।”
একটু থেমে সে বলল,
— “আমি যে অয়নকে চিনেছি, আমি তাকেই চিনি।”
অয়নের মা চোখের জল মুছে মৃদু হাসলেন।
সুধা দেবীর চোখেও তখন জল।
আর সেই মুহূর্তে যেন দুই পরিবারের বহু বছরের দূরত্ব একটু একটু করে কমে এল।
অয়নের পরিচয় আর শুধু তার বাবার নাম নয়।
তার নিজের কাজই তার নতুন পরিচয় তৈরি করেছে।
পরের শীতে সেই একই মাঠে আবার নাটক হল।
বাঁশের কাঠামো। টিনের ছাউনি। মঞ্চের দু’পাশে দুটি আলো।
এবার সামনের সারিতে পাশাপাশি বসে ছিলেন সুধা দেবী, বিশাখা আর অয়ন।
একটু দূরে রেখাদেবী। তাঁর পাশে অচিন্ত।
অয়ন প্রথমে চিনতে পারেনি। তারপর চিনল—রাস্তার ওপারের সেই রোগা ছেলেটি।
অচিন্তও তাকে দেখল।
দুজনের মধ্যে একটিও কথা হল না।
আলো নিভে গেল।
নাটকের শেষ দৃশ্যে একজন বৃদ্ধ বলছিলেন—
“অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করো। কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার নামে নিজের হাতে অন্যায় কোরো না।”
নাটক শেষ হলে মাঠজুড়ে করতালি পড়ল।
অচিন্ত চুপ করে বসে রইল। তার চোখে জল।
তার মনে পড়ে গেল সেই পুরোনো রাত। সেই নাটক। সেই কথাটি—“নাটকে লোকশিক্ষা হয়।”
এবার সে কথাটির অর্থ অন্যভাবে বুঝল।
ফেরার পথে অয়ন একটু থামল। অচিন্তের দিকে ফিরে মাথা নাড়ল। অচিন্তও ধীরে মাথা নাড়ল।
একই মঞ্চ। একই কথা।
এবার দুই তরুণই সেই কথার একই অর্থ নিয়ে ঘরে ফিরল।
মানুষ তার বাবার পাপের উত্তরাধিকারী হতে বাধ্য নয়;
সে চাইলে সত্যের উত্তরাধিকারী হতে পারে।