অচেনা যুবকের নিয়ে আসা উপহারের ব্যাগ
বিশ্বাসের গল্প

বিশ্বাসের মূল্য

বিশ্বাস · সতর্কতা · এক কঠিন শিক্ষা

একদিন সকালে একজন শিক্ষকের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। তাঁর স্ত্রী দরজা খুলে দেখলেন, বিনয়ী হাসিমুখে এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে।

"সুপ্রভাত, কাকিমা। আপনি কেমন আছেন?"

"ভালো আছি, ধন্যবাদ। কী মনে করে এলে?"

"আমি স্যারের ছাত্র। আজ সকালে রাস্তায় স্যারের সঙ্গে দেখা হলো, প্রণাম করে বললাম আমি একটা ভালো চাকরি পেয়েছি। উনি খুব খুশি হলেন। তাই এই খুশির উপলক্ষে একটা ছোট উপহার নিয়ে এলাম।"

যুবকটি একটি বড় ব্যাগ এগিয়ে দিল।

"এর ভেতরে এক কেজি খাসির মাংস, রান্নার তেল, মশলাপাতি আর আরও কিছু জিনিস আছে। আজকের এই খুশির দিনে স্যার যেন ভালো করে খেতে পারেন, সেটাই চাই।"

স্ত্রী খুব খুশি হলেন।

"কী চমৎকার! ভেতরে এসো, বসো — আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি।"

চা খাওয়ার পর যুবকটি আবার বলল।

"কাকিমা, স্যার আমাকে বলেছেন গাড়িটা নিয়ে একটু কাজ সেরে আসতে। ওঁর ফোনটা কয়েকদিন ধরে খারাপ, তাই আপনাকে ফোন করতে পারেননি। আমি কি গাড়িটা নিতে পারি?"

কোনো দ্বিধা না করেই স্ত্রী রাজি হয়ে গেলেন।

"অবশ্যই — শুধু সময়মতো ফিরে এসো। আমি রান্না বসিয়ে দিচ্ছি।"

যুবকটি শিক্ষকের প্রিয় গাড়ি নিয়ে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর শিক্ষক সকালের হাঁটা সেরে বাড়ি ফিরলেন। ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে বাতাসে রান্নার গন্ধ শুঁকলেন।

"আজ এত সুন্দর রান্নার গন্ধ কীসের?"

স্ত্রী হেসে ছাত্রটির আসার কথা বললেন। শিক্ষকের মুখের ভাব বদলে গেল।

"আমার ছাত্র? আমি তো কাউকে পাঠাইনি। আর — তুমি ওকে গাড়িও দিয়ে দিলে?"

সারাদিন আর সারারাত অপেক্ষা করলেন তিনি। যুবকটি ফিরল না। গাড়িও না।

পরদিন সকালে শিক্ষক বাসে করে কলেজে গেলেন। গেটের দারোয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

"স্যার, আপনি বাসে করে এলেন কেন? আপনার গাড়ি তো গ্যারেজে আছে!"

শিক্ষক দৌড়ে গ্যারেজে গেলেন। গাড়িটা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, নিজের জায়গায়। ভেতরে একটা চিঠি অপেক্ষা করছিল।

"স্যার, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে বাজি ধরেছিল — যদি আমি আপনাকে ঠকিয়ে গাড়িটা নিয়ে যেতে পারি, তাহলে ওরা আমাকে দশ হাজার টাকা দেবে। আমি বাজিতে জিতেছি। আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য দুঃখিত। গাড়িতে তেল ভরে দিয়েছি আর দরজার লকও পাল্টে দিয়েছি। আপনার জন্য তিনটে সিনেমার টিকিট আর দুই হাজার টাকার খাবারের কুপনও রেখে যাচ্ছি। ভালো থাকবেন।"

চিঠিটা পড়ে শিক্ষক আর তাঁর স্ত্রী প্রায় হেসেই ফেললেন। ছেলেটা তাহলে একেবারে মন্দ নয়। পরদিন সন্ধ্যায় তাঁরা সিনেমা দেখতে গেলেন — বাড়ির কাজের লোকসহ তিনজনে — সিনেমা দেখলেন, ভালো করে খেলেন, আর সত্যিই আনন্দে কাটালেন সময়টা।

কিন্তু রাতের শেষে, পার্কিং এলাকায় ফিরে এসে দেখলেন, গাড়িটা নেই।

তার জায়গায় পড়ে ছিল আরেকটা চিঠি।

"স্যার, আপনি সত্যিই বড় সরল মানুষ। আপনি জানতেন না যে আসল চাবিটা এখনও আমার কাছেই আছে। সেই চাবি দিয়ে এবার সত্যিই আপনার গাড়িটা নিয়ে নিলাম। আর হয়তো আজ রাতে আপনারা এটাও বুঝলেন যে, বাড়ি খালি রেখে সবাই একসঙ্গে বাইরে যাওয়া কতটা বিপজ্জনক। এখন বাড়ি যান — আর দেখুন কী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।"

শিক্ষকের রক্ত হিম হয়ে গেল। তিনি একটা ট্যাক্সি ডেকে দ্রুত বাড়ির দিকে ছুটলেন।

দরজা জোর করে ভাঙা হয়েছে। প্রতিটা ঘর তছনছ। টেলিভিশন, গয়না, আসবাবপত্র — সব উধাও। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, একটা ট্রাক এনে বাড়িটা একেবারে খালি করে দেওয়া হয়েছে।

একমুহূর্তের ভুল বিশ্বাসের মূল্য দিতে হলো তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে।

সেই রাতে শিক্ষক বুঝলেন এমন এক সত্য, যা তিনি আগে কখনও সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করেননি — মানুষকে বিশ্বাস করা কোনো পাপ নয়। কিন্তু কোনো প্রশ্ন না তুলে, এক মুহূর্তও না থেমে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা কখনও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সতর্কতা আর বিশ্বাস — দুটোই পাশাপাশি চলা উচিত। কারণ এই পৃথিবীতে সত্যিকারের ভালো মানুষের পাশাপাশি এমন মানুষও আছে, যারা আপনার মানুষে-বিশ্বাসকেই আপনাকে ধ্বংস করার অস্ত্র বানিয়ে নেয়।

শিক্ষা

বিশ্বাস একটা মূল্যবান উপহার — কিন্তু তা অন্ধভাবে নয়। যা মূল্যবান, তা হাতে তুলে দেওয়ার আগে যাচাই করে নিন।

অন্ধবিশ্বাস হয়ে উঠতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ।