গোধূলির আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। রাস্তার দুপাশের দোকানগুলোতে একে একে আলো জ্বলে উঠেছে। চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে কাপ-পিরিচের শব্দ, কোথাও আবার ভাজা পেঁয়াজির গন্ধে সন্ধ্যার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
সেই ব্যস্ত রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো রিক্সা। রিক্সাটার রং অনেক আগেই উঠে গেছে। লোহার শরীরে জায়গায় জায়গায় জং ধরেছে। সিটের চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে পুরোনো তুলো।
রিক্সার পাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন রহিম মিয়া। বয়স তাঁর পঁয়ষট্টি পেরিয়েছে। একসময় যে পা দিয়ে সারাদিন রিক্সা চালিয়ে অনায়াসে দশ-পনেরো কিলোমিটার চলে যেতেন, সেই পা এখন সামান্য পথ গেলেই কাঁপতে শুরু করে। বিশেষ করে হাঁটু দুটো।
রিক্সায় উঠে প্যাডেলে পা রাখলেন তিনি। একবার চাপ দিলেন। রিক্সা একটু এগোল। আবার চাপ দিলেন। লোহার পুরোনো চেনটা কট করে শব্দ করে উঠল।
রহিম মিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“চল বাবা... আর একটু চল।”
এই রিক্সাটাই এখন তাঁর ভরসা। অথচ মাত্র চার বছর আগেও এই মানুষটিকে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করত না যে এমন দিন তাঁর জীবনে আসতে পারে।
চার বছর আগে এই একই রাস্তা দিয়ে যখন রহিম মিয়া বেরোতেন, তখন মানুষ তাঁকে দেখে আঙুল তুলে বলত—
“ঐ যে! এক কোটি টাকার লটারি জেতা রহিম মিয়া!”
কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। কেউ কাছে এসে হাত মেলাত। কেউ আবার হাসতে হাসতে বলত,
“রহিম ভাই, আমাদের কথাটা কিন্তু ভুলে যাবেন না!”
তখন রহিম মিয়ার মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকত। তিনি ভাবতেন—
“আমার জীবন বদলে গেছে।”
সত্যিই বদলে গিয়েছিল। কিন্তু যেভাবে তিনি ভেবেছিলেন, সেভাবে নয়।
ছোটবেলার স্বপ্ন
রহিম মিয়ার লটারির নেশা আজকের নয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র নয় বছর। বাবা ছিলেন দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।
স্কুলে পড়াশোনা বেশিদিন করা হয়নি রহিমের। সংসারের প্রয়োজনেই ছোটবেলায় চায়ের দোকানে কাজ শুরু করতে হয়েছিল। সারাদিন টেবিল পরিষ্কার করা, গ্লাস ধোয়া, চা পৌঁছে দেওয়া—এই ছিল তাঁর কাজ।
দিন শেষে মালিক যখন হাতে কয়েকটা কয়েন দিতেন, রহিম সেগুলো মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে বাড়ির পথে হাঁটতেন। কিন্তু রাস্তার মোড়ে একটা ছোট্ট দোকান ছিল। সেখানে ঝুলত রঙিন লটারির টিকিট। টিকিটগুলো যেন রহিমকে ডাকত। লাল, নীল, হলুদ কাগজের ওপর বড় বড় সংখ্যা।
দোকানদার বলত, “একটা নাও রহিম! আজ ভাগ্য খুলে যেতে পারে!”
প্রথম দিন রহিম শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছিল। দ্বিতীয় দিনও দেখেছিল। তৃতীয় দিন পকেট থেকে একটা কয়েন বের করেছিল। দোকানদার একটা টিকিট তার হাতে তুলে দিয়েছিল।
সেদিন টিকিটটা হাতে নিয়ে রহিমের মনে হয়েছিল—
“হয়তো এটাই আমার ভাগ্য বদলানোর রাস্তা।”
টিকিটে পুরস্কার উঠল না। পরের সপ্তাহে আবার কিনল। সেবারও উঠল না। তারপর? আরও একটা। আরও একটা। এভাবেই শুরু হয়েছিল।
রিক্সার হ্যান্ডেল আর লটারির টিকিট
বয়স বাড়ল। চায়ের দোকানের কাজ ছেড়ে রহিম রিক্সা চালানো শুরু করল। সকালে রিক্সা নিয়ে বেরোত। রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরত। কিন্তু প্রতিদিনের আয়ের একটা ছোট অংশ সে আলাদা করে রাখত লটারির জন্য।
বন্ধুরা বলত, “রহিম, এসব বাদ দে। টাকা জমা রাখ।”
রহিম হেসে বলত, “একদিন দেখিস, এই টিকিটই আমাকে বড়লোক বানাবে।”
কেউ হাসত। কেউ বলত, “স্বপ্ন দেখিস বেশি।” কিন্তু রহিম ছাড়েনি।
এক কাপ চা কম খেয়ে সে টিকিট কিনেছে। নতুন জামা না কিনে টিকিট কিনেছে। কখনো বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসের টাকাও লটারিতে ঢেলেছে। তার মনে একটাই বিশ্বাস—
“একদিন আমারও দিন আসবে।”
বছরের পর বছর কেটে গেল। দশ বছর। বিশ বছর। ত্রিশ বছর। চল্লিশ বছর। রহিমের চুলে পাক ধরল। তারপর একদিন বয়স পঁয়ষট্টির কাছাকাছি পৌঁছল। কিন্তু লটারির টিকিট কেনার অভ্যাস গেল না। বরং এখন তার কাছে এটা একটা নেশার মতো হয়ে গেছে।
সেই সকাল
চার বছর আগে এক সাধারণ সকাল। রহিম সেদিনও রিক্সা নিয়ে বেরিয়েছিল। পকেটে ছিল কয়েকটা খুচরো টাকা। রাস্তার মোড়ে সেই পরিচিত লটারির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দোকানদার বলল, “রহিম কাকা, আজ কিন্তু নতুন সিরিজ এসেছে।”
রহিম হেসে বলল, “দে দেখি।”
দোকানদার কয়েকটা টিকিট সামনে ধরল। রহিম একটা টিকিট তুলে নিল। দশ টাকার টিকিট। টিকিটটা পকেটে রেখে সে রিক্সা নিয়ে চলে গেল। তারপর দিনটা অন্য দিনের মতোই কেটে গেল।
কিন্তু সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে রহিম যখন টিকিটের নম্বরটা মিলিয়ে দেখল—তার হাত কেঁপে উঠল। একবার দেখল। আবার দেখল। তারপর চোখের সামনে টিকিটটা ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
দোকানের ছোট্ট টেলিভিশনে যে নম্বরগুলো দেখানো হচ্ছিল, তার সঙ্গে তার টিকিটের নম্বর মিলে যাচ্ছে! রহিম বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে দৌড়ে পাশের দোকানে গেল।
বলল, “ভাই... একবার দেখে দাও তো!”
দোকানদার টিকিটটা হাতে নিয়ে নম্বর মিলিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
“রহিম কাকা...”
“কী হয়েছে?”
“আপনার টিকিটে...”
লোকটা আবার নম্বর মিলাল। তারপর বলল—
“আপনার এক কোটি টাকা লেগেছে!”
রহিম যেন কথাটার অর্থই বুঝতে পারল না। “কী বললি?” “এক কোটি টাকা, কাকা!”
চারপাশে কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে গেল। কেউ টিকিট দেখতে চাইছে। কেউ রহিমের হাত ধরছে। কেউ বলছে, “কাকা, আপনি তো আজ কোটিপতি!”
রহিম মিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। এত বছর ধরে যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন—সেটা সত্যি হয়েছে!
সেদিন রাতে তিনি ঘুমোতে পারেননি। বারবার পকেট থেকে টিকিট বের করেছেন। দেখেছেন। আবার ভাঁজ করে রেখেছেন। মনে মনে বলেছেন—
“এবার আর আমাকে রিক্সা চালাতে হবে না।”
তিনি জানতেন না—সেদিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিপদের দরজাটাও খুলে গিয়েছিল।
কারণ এক কোটি টাকা পাওয়া যতটা কঠিন, এক কোটি টাকা ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন।
এক কোটি টাকা! খবরটা ছড়িয়ে পড়তে রহিম মিয়ার গ্রামের বেশি সময় লাগল না। যে মানুষটাকে এতদিন সবাই চিনত একজন সাধারণ রিক্সাওয়ালা হিসেবে, হঠাৎ সেই মানুষটিই হয়ে গেল গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়। কেউ অভিনন্দন জানাতে আসে। কেউ মিষ্টির বাক্স নিয়ে আসে। কেউ আবার বহু বছর পর এসে বলে—
“রহিম ভাই, আমাকে চিনতে পারছেন?”
রহিম মিয়া সবাইকে চিনতে পারতেন না। কিন্তু সবাইকে বিশ্বাস করতেন।
এই বিশ্বাসটাই ধীরে ধীরে তাঁর সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠল।
টাকা হাতে আসার আগেই স্বপ্ন শুরু
লটারির টাকা হাতে পাওয়ার আগেই রহিম মিয়া পরিকল্পনা করে ফেলেছিলেন। তিনি আর রিক্সা চালাবেন না। একটা দামি গাড়ি কিনবেন। বাড়িটা ভেঙে নতুন করে বানাবেন। ছেলের ব্যবসা করবেন। বন্ধুদের সাহায্য করবেন। গ্রামের মানুষকে টাকা দেবেন। আর নিজের জীবনে আর কখনো অভাব থাকবে না।
ব্যাংকের ম্যানেজার তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, “টাকাটা সরাসরি হাতে না নিয়ে আগে একটা নিরাপদ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখুন। হঠাৎ পাওয়া এত বড় অঙ্কের টাকা পরিকল্পনা ছাড়া খরচ করবেন না।”
রহিম মাথা নেড়ে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, বুঝেছি।”
কিন্তু সত্যি বলতে তিনি কিছুই বোঝেননি। ব্যাংকের কাগজপত্র, কর, বিনিয়োগ, সুদ, ঝুঁকি—এসব তাঁর কাছে ছিল অচেনা জগত। তিনি শুধু বুঝেছিলেন—
“আমার কাছে এখন অনেক টাকা আছে।”
আর সেই অনুভূতিটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলের শুরু করল।
প্রথম বড় কেনাকাটা
টাকা হাতে আসার কিছুদিনের মধ্যেই রহিম মিয়া একটি ঝকঝকে এসি গাড়ি কিনলেন। গাড়িটা যখন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল, গ্রামের মানুষ দেখতে ভিড় করল। রহিম মিয়া গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে হাসলেন।
কেউ বলল, “রহিম কাকা, গাড়িটা তো একেবারে শহুরে!”
রহিম গর্ব করে বললেন, “এখন থেকে আমিও বড়লোক!”
কিন্তু একটা ছোট সমস্যা ছিল। তিনি গাড়ি চালাতেই জানতেন না। তাই চালক রাখতে হলো। গাড়ির পেট্রোল, চালকের বেতন, সার্ভিসিং, বিমা—সব মিলিয়ে প্রতি মাসে একটা বড় অঙ্কের টাকা বেরোতে লাগল।
কিন্তু রহিম এসবকে খরচ বলে মনে করতেন না। তিনি ভাবতেন—
“টাকা আছে, খরচ হবে না তো কী হবে?”
রাজপ্রাসাদ
এরপর শুরু হলো বাড়ি বানানোর কাজ। পুরোনো কুঁড়েঘর আর তাঁর পছন্দ হচ্ছিল না। গ্রামের মোড়ের কাছে বিশাল জমির ওপর তৈরি হতে লাগল তিনতলা বাড়ি। মার্বেল। দামি টাইলস। এসি। ঝাড়বাতি। বড় গেট। দামি আসবাব। সবকিছুতেই যেন রহিম মিয়া প্রমাণ করতে চাইছিলেন—
“আমি আর সেই পুরোনো রহিম নই।”
বাড়ির কাজ শেষ হতে না হতেই তিনি বন্ধুদের নিয়ে বড় ভোজ দিলেন। শত শত মানুষের খাওয়া হলো।
কেউ বলল, “রহিম ভাই, আপনি তো সত্যিই রাজা হয়ে গেছেন!”
রহিম হেসে বললেন, “আল্লাহ দিয়েছেন। সবাই মিলে খাব।”
কিন্তু কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করল না—“এই টাকা কতদিন থাকবে?” আর রহিম নিজেও সেই প্রশ্ন করেননি।
সাহায্যের নামে টাকা বিলানো
সবচেয়ে বড় সমস্যা শুরু হলো তখন, যখন গ্রামের মানুষ বুঝে গেল—রহিম মিয়া টাকা দিতে না করেন না।
একজন এল—“কাকা, মেয়ের বিয়ে।” রহিম দিলেন ৫০ হাজার টাকা।
আরেকজন এল—“ছেলের ব্যবসা শুরু করব।” দিলেন এক লাখ।
কেউ বলল—“বাড়িতে অসুখ।” দিলেন আরও টাকা।
কেউ সত্যিই অসহায় ছিল। আবার কেউ শুধু রহিমের সরলতার সুযোগ নিচ্ছিল। রহিম কোনো যাচাই করতেন না। কেউ চোখে পানি আনলেই তাঁর মন নরম হয়ে যেত। তিনি ভাবতেন—
“আমার কাছে এত টাকা। অন্যকে দিলে আমার কীই বা কমবে?”
কিন্তু তিনি জানতেন না—
সম্পদ যত বড়ই হোক, হিসেব ছাড়া খরচ করলে একদিন তা শেষ হবেই।
নগদ টাকার প্রতি অদ্ভুত বিশ্বাস
ব্যাংকে টাকা রাখা নিয়েও রহিমের ভয় ছিল। তিনি বলতেন, “নিজের চোখের সামনে টাকা থাকলে তবেই তো নিরাপদ।” তাই ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলে এনে কখনো তোশকের নিচে, কখনো আলমারিতে, কখনো চালের ড্রামে রেখে দিতেন।
বাড়ির লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত।
একদিন তাঁর স্ত্রী বলেছিলেন, “এভাবে এত টাকা ঘরে রাখা ঠিক হচ্ছে?”
রহিম হেসে বলেছিলেন, “ভয় কীসের? টাকা তো আমারই।”
তিনি বুঝতে পারেননি—
টাকা শুধু নিজের হলেই হয় না, তাকে নিরাপদে রাখতেও জানতে হয়।
হিসেবহীন খরচ
প্রথম বছর রহিম মিয়া বুঝতেই পারলেন না কত টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বছরেও তাঁর জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন এল না। বরং খরচ আরও বাড়ল। আগে যেখানে মাসে কয়েক হাজার টাকায় সংসার চলত, এখন শুধু বাড়ি আর গাড়ির পেছনেই চলে যাচ্ছিল বিপুল টাকা।
তার ওপর আত্মীয়স্বজনের দাবি। বন্ধুদের আবদার। বিভিন্ন ব্যবসায় টাকা দেওয়া। কারও কথায় জমি কেনা। কারও কথায় ব্যবসায় টাকা ঢালা। কোথাও কোনো লিখিত হিসেব নেই। কোথাও কোনো পরিকল্পনা নেই। শুধু একটা বিশ্বাস—
“আমার তো এক কোটি টাকা আছে!”
কিন্তু এক কোটি টাকা আর আগের জায়গায় ছিল না। ধীরে ধীরে সেই কোটি টাকার পাহাড় ছোট হতে শুরু করেছে।
ম্যানেজারের সতর্কবার্তা
একদিন ব্যাংকের ম্যানেজার রহিমকে ডেকে বললেন, “রহিম শেখ, আপনার খরচের হিসেবটা একটু দেখেছেন?”
রহিম হেসে বললেন, “আরে সাহেব, এত চিন্তা করেন কেন? আমার তো অনেক টাকা।”
“অনেক টাকা থাকা আর অনেকদিন টাকা থাকা—এক জিনিস নয়।”
রহিম কথাটা শুনে হাসলেন। “আপনি ব্যাংকের লোক। টাকা নিয়ে চিন্তা করাই আপনার কাজ।”
ম্যানেজার আর কিছু বললেন না। শুধু বললেন, “একদিন এই কথাটা যেন খুব দেরিতে মনে না পড়ে।”
রহিম তখনও বুঝতে পারেননি কথাটার অর্থ।
সময় গড়িয়ে গেল। এক কোটি টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকার স্বপ্ন দেখা মানুষটি ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই কোটি টাকার মালিকানা হারানোর পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
আর তাঁর চারপাশে যারা এতদিন হাসিমুখে ঘুরত, তারা তখনও তাঁর টাকার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু কতদিন?
তৃতীয় বছর থেকেই রহিম মিয়া বুঝতে শুরু করেছিলেন—কিছু একটা যেন ঠিক নেই। আগের মতো ব্যাংক থেকে টাকা তুললে আর তেমন স্বস্তি লাগত না। একসময় যে অ্যাকাউন্টে কোটি টাকার অঙ্ক দেখে তাঁর বুক গর্বে ভরে উঠত, সেখানে এখন সংখ্যাগুলো দ্রুত ছোট হয়ে আসছে।
তবুও তিনি নিজেকে বোঝাতেন—
“এত টাকা খরচ করেছি, তাই একটু কমেছে। আবার ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু টাকা নিজে থেকে আর ফিরে এল না।
খরচের পাহাড়
গাড়ির খরচ চলছিল। বাড়ির খরচ চলছিল। বিদ্যুৎ বিল বাড়ছিল। কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছিল। আত্মীয়স্বজনের আবদারও কমেনি। তার ওপর যেসব ব্যবসায় রহিম টাকা দিয়েছিলেন, তার বেশিরভাগই আর ফেরত এল না।
কেউ ব্যবসা বন্ধ করে দিল। কেউ ফোন বন্ধ করে দিল। কেউ আবার সরাসরি বলল—
“রহিম ভাই, ব্যবসায় তো লাভ হয়নি। টাকা এখন দিতে পারব না।”
রহিম তখন বুঝলেন—
টাকা দেওয়া আর টাকা বিনিয়োগ করা এক জিনিস নয়।
গাড়ি তখন বোঝা
একদিন তাঁর গাড়ির চালক এসে বলল, “সাহেব, গাড়ির সার্ভিসিং করাতে হবে।”
রহিম বিরক্ত হয়ে বললেন, “কত লাগবে?”
“অনেকটা।”
রহিম পকেট থেকে টাকা বের করতে গিয়ে থেমে গেলেন। আগে এমন খরচে তিনি কখনো ভাবতেন না। এখন ভাবতে হচ্ছে।
কয়েক মাস পর গাড়িটা প্রায় ব্যবহারই বন্ধ হয়ে গেল। গ্যারেজের এক কোণে ধুলো জমতে লাগল। যে গাড়ি একসময় ছিল তাঁর গর্বের প্রতীক, সেটাই এখন তাঁর কাছে একটা খরচের বোঝা।
পেট্রোল নেই। সার্ভিসিং নেই। রক্ষণাবেক্ষণের টাকা নেই। রহিম দূর থেকে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।
রাজপ্রাসাদেও অন্ধকার
তারপর এল আরও বড় ধাক্কা। বিশাল বাড়ির বিদ্যুৎ বিল কয়েক মাস ধরে বাকি। বিলের কাগজ হাতে নিয়ে রহিম মিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
একসময় যে বাড়ির প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলত, সেই বাড়ির কয়েকটি ঘরের বাতি বন্ধ করে দিতে হলো। এসি বন্ধ। অপ্রয়োজনীয় ঘর বন্ধ। কর্মচারী কমানো হলো। তবুও খরচ সামলানো গেল না।
রহিম প্রথমবার বুঝলেন—
বাড়ি যত বড়, তার দায়িত্বও তত বড়।
মানুষগুলো কোথায় গেল?
সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলেন মানুষের আচরণে। যারা একসময় প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে আসত, তারা এখন আর আসে না।
যে বন্ধু বলত—“রহিম ভাই, আপনি আমার আপন ভাইয়ের মতো।” সেই বন্ধুই এখন ফোন করলে ব্যস্ত থাকে।
যে আত্মীয় বলত—“আপনি না থাকলে আমাদের কে আছে?” সেও এখন আর খবর নেয় না।
একদিন রহিম পুরোনো এক বন্ধুকে ফোন করে বললেন, “ভাই, অনেকদিন দেখা নেই। একদিন এসো।”
ওপাশ থেকে উত্তর এল, “আচ্ছা, সময় করে আসব।”
সে আর আসেনি। রহিম সেদিন বুঝলেন—
অনেক মানুষ তাঁকে ভালোবাসেনি। তারা ভালোবেসেছিল তাঁর টাকা।
শেষ ভরসাটাও গেল
চতুর্থ বছরের শুরুতে রহিমের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রায় খালি। বাড়ির ওপর দেনা। গাড়ি পড়ে আছে। ব্যবসায় দেওয়া টাকা ফেরত নেই। আর যাদের তিনি সাহায্য করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই এখন তাঁর পাশে নেই।
দেনা শোধ করতে অবশেষে বিশাল বাড়ির একটা বড় অংশ বিক্রি করতে হলো। যে বাড়ি নিয়ে তিনি একসময় গর্ব করতেন, সেটাই এখন তাঁর ঋণ শোধের উপায়।
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রহিম মিয়া চুপ করে রইলেন। একসময় যে গেট দিয়ে দামি গাড়ি ঢুকত, সেই গেট দিয়েই এখন ক্রেতারা আসছে।
একজন ক্রেতা বাড়িটা দেখে বলল, “বাড়িটা বেশ বড়। তবে দামটা একটু বেশি চাইছেন।”
রহিম মাথা নিচু করে বললেন, “যা পারেন দিন।”
তাঁর গলায় আর কোনো গর্ব ছিল না।
সেই পুরোনো ব্যাংক ম্যানেজার
একদিন রহিম মিয়া আবার ব্যাংকে গেলেন। সেই একই ম্যানেজার তখনও সেখানে ছিলেন। রহিমকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
“কেমন আছেন?”
রহিম মৃদু হেসে বললেন, “ভালো নেই।”
ম্যানেজার তাঁকে বসতে বললেন। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রহিম বললেন,
“সাহেব... আমার টাকা কোথায় গেল?”
ম্যানেজার কোনো উত্তর দিলেন না। কম্পিউটারে কিছু হিসেব দেখলেন। তারপর একটা কাগজ বের করে রহিমের সামনে রাখলেন।
“আপনি যদি চান, একটা হিসেব দেখাতে পারি।”
রহিম বললেন, “দেখান।”
ম্যানেজার বললেন, “আপনি নয় বছর বয়স থেকে লটারির টিকিট কিনছেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে যদি প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে সেই টাকার একটা অংশ নিয়মিত সঞ্চয় করতেন, এবং দীর্ঘমেয়াদে উপযুক্ত বিনিয়োগে রাখতেন, তাহলে সেই ছোট ছোট টাকাগুলোও সময়ের সঙ্গে বড় হতে পারত।”
রহিম অবাক হয়ে তাকালেন। “কীভাবে?”
ম্যানেজার বললেন, “চক্রবৃদ্ধির কারণে।”
“ওটা আবার কী?”
ম্যানেজার এবার কাগজে সহজ করে লিখলেন—
মূল টাকা → লাভ → সেই লাভের ওপর আবার লাভ → আরও বড় টাকা।
“এটাই চক্রবৃদ্ধি। সময় যত বেশি, এর প্রভাব তত বেশি হতে পারে।”
রহিম চুপ করে রইলেন। ম্যানেজার আবার বললেন,
“আপনি লটারিতে ভাগ্যের অপেক্ষা করেছেন। অথচ নিয়মিত সঞ্চয় আর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই তৈরি করার সুযোগ আপনার ছিল।”
রহিম মাথা নিচু করলেন। প্রথমবার তাঁর মনে হলো—
এক কোটি টাকা হারানোই তাঁর সবচেয়ে বড় ক্ষতি নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো—তিনি কখনো শেখার চেষ্টা করেননি।
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে
ব্যাংক থেকে বেরিয়ে রহিম ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে হাঁটলেন। একসময় তাঁর পকেটে কোটি টাকার স্বপ্ন ছিল। আজ সেখানে মাত্র কয়েকটি নোট।
রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের পুরোনো রিক্সাটার দিকে তাকালেন। রিক্সাটা এখনও আছে। জং ধরেছে। সিট ছিঁড়েছে। চাকা দুর্বল। তবুও সেটাই এখন তাঁর একমাত্র সম্বল।
রহিম ধীরে ধীরে রিক্সার হ্যান্ডেলে হাত রাখলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠল চার বছর আগের সেই দিন—মানুষ চিৎকার করে বলছিল,
“এক কোটি টাকার রহিম মিয়া!”
আজ কেউ তাকে চিনতেই পারে না।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। কারণ রহিমের হাতে এখনও আছে মাত্র কুড়ি টাকা।
আর সেই কুড়ি টাকা দিয়েই তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন, যা প্রমাণ করবে—টাকা হারালেও অভ্যাস সবসময় হারায় না।
ব্যাংক থেকে বেরিয়ে সেদিন রহিম মিয়া অনেকক্ষণ রাস্তার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চার বছর আগের সেই দিনটার কথা বারবার মনে পড়ছিল। সেদিন সবাই বলেছিল—
“রহিম মিয়া এক কোটি টাকার লটারি জিতেছে!”
কথাটা সত্যি ছিল। লটারির ঘোষণায় পুরস্কারের অঙ্ক ছিল এক কোটি টাকা। কিন্তু রহিম মিয়া নিজেও তখন পুরো বিষয়টা বুঝতেন না। কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য কর্তন বাদ দেওয়ার পর তাঁর হাতে এসেছিল মোটামুটি পঁয়ষট্টি লাখ টাকা।
কিন্তু এই কথাটা গ্রামের মানুষ জানত না। আত্মীয়রা জানত না। বন্ধুরাও জানত না। সবাই শুধু জানত—
রহিম কোটি টাকার মালিক।
আর সেই “কোটি টাকার রহিম”-কে ঘিরেই শুরু হয়েছিল মানুষের প্রত্যাশা।
“আপনার তো কোটি টাকা!”
কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা চাইত। “রহিম ভাই, আপনার তো কোটি টাকা! আমাদের একটু সাহায্য করুন।”
কেউ ব্যবসার জন্য টাকা চাইত। “আপনার কাছে এত টাকা পড়ে আছে, আমাদের ব্যবসাটা দাঁড় করিয়ে দিন।”
কেউ আবার সরাসরি বলত, “আপনি তো এখন বড়লোক। আমাদের কথা একটু দেখবেন না?”
রহিম কাউকে বোঝাতেন না যে তাঁর হাতে আসলে এক কোটি টাকা নেই। তিনি নিজেও তখন টাকা-পয়সার হিসেব ঠিকমতো বুঝতেন না। মনে মনে ভাবতেন—
“পঁয়ষট্টি লাখ তো কম নয়। এত টাকা আমি জীবনে দেখিনি।”
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। পঁয়ষট্টি লাখকে তিনি সম্পদ হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন—খরচ করার মতো অনেক টাকা।
কোটি টাকার স্বপ্ন, পঁয়ষট্টি লাখের বাস্তবতা
প্রথমেই গেল গাড়ি। তারপর বিশাল বাড়ি। তারপর আসবাব। তারপর বন্ধুদের খাওয়ানো। তারপর আত্মীয়দের সাহায্য। তারপর বিভিন্ন ব্যবসায় টাকা দেওয়া। কোথাও হিসেব নেই। কোথাও বাজেট নেই। কোথাও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নেই।
আর একটা ভুল ধারণা সবসময় তাঁর মাথায় ঘুরত—
“আমার তো কোটি টাকা ছিল!”
এই “ছিল” শব্দটার গুরুত্ব তিনি বুঝতে পারেননি। পুরস্কারের ঘোষিত অঙ্ক ছিল এক কোটি। কিন্তু তাঁর হাতে এসেছিল তার চেয়ে অনেক কম। তারপর সেই টাকাও ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। একসময় পঁয়ষট্টি লাখের সেই টাকা কয়েক লাখে এসে দাঁড়াল। তারপর সেই কয়েক লাখও শেষ হয়ে গেল।
রাজপ্রাসাদ বিক্রি
যে বাড়িটা বানাতে গিয়ে রহিম একসময় বলেছিলেন, “এই বাড়ি আমার শেষ বয়সের আশ্রয় হবে।”
সেই বাড়িই এখন বিক্রি করতে হলো। দালাল এসে বাড়ির দাম বলল। রহিম জানতেন, দামটা কম। কিন্তু তাঁর হাতে আর কোনো পথ ছিল না। দেনা শোধ করতে হবে। বাড়ির একটা বড় অংশ বিক্রি হয়ে গেল।
দামি গাড়িটাও পড়ে রইল গ্যারেজে। একসময় যে গাড়িতে চড়ে রহিম গ্রামের রাস্তায় বেরোতেন, আজ সেটার দিকে তাকানোরও তাঁর ইচ্ছে হয় না। পেট্রোল কেনার টাকা নেই। মেরামতের টাকা নেই। গাড়িটা যেন তাঁর নিজের ভুলের একটা নীরব স্মৃতিস্তম্ভ।
মানুষগুলোও হারিয়ে গেল
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—যে মানুষগুলো কোটি টাকার রহিমকে ঘিরে থাকত, তারা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
যে বন্ধু প্রতিদিন বাড়িতে বসে চা খেত, সে আর আসে না। যে আত্মীয় বলত, “আপনি আমাদের পরিবারের একজন,” সে ফোন করলেও এখন কথাবার্তা সংক্ষিপ্ত রাখে।
রহিম ধীরে ধীরে বুঝলেন—তাঁর চারপাশে মানুষের সংখ্যা কমেনি। কমেছে টাকার জন্য মানুষের আগ্রহ।
তিনি একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বললেন, “তাহলে এতদিন ওরা আমাকে ভালোবাসেনি?”
কোনো উত্তর এল না।
ম্যানেজারের শেষ শিক্ষা
কয়েকদিন পর রহিম আবার সেই ব্যাংকের ম্যানেজারের কাছে গেলেন।
ম্যানেজার তাঁকে দেখে বললেন, “আপনি খুব চুপচাপ হয়ে গেছেন।”
রহিম মৃদু হেসে বললেন, “আমার টাকা নেই।”
ম্যানেজার বললেন, “টাকা নেই—এটা দুঃখের। কিন্তু আপনি চাইলে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।”
রহিম চুপ করে রইলেন।
ম্যানেজার বললেন, “আপনি এক কোটি টাকা জিতেছিলেন। কিন্তু কর কাটার পর হাতে পেয়েছিলেন প্রায় পঁয়ষট্টি লাখ। সেই পঁয়ষট্টি লাখেরও একটা অংশ যদি নিরাপদে রেখে দিতেন, একটা অংশ ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতেন, আর খরচের জন্য আলাদা সীমা ঠিক করতেন—তাহলে আজ পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত।”
রহিম নিচের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তো ভেবেছিলাম টাকা থাকলেই সব ঠিক থাকবে।”
ম্যানেজার ধীরে বললেন, “না রহিম। টাকা থাকা যথেষ্ট নয়।”
তারপর একটু থেমে বললেন—
“টাকাকে আপনার জন্য কাজ করাতে জানতে হয়।”
ম্যানেজার আবার বললেন, “আপনি এত বছর লটারিতে টাকা দিয়েছেন। যদি সেই অভ্যাসের বদলে ছোট অঙ্কের নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করতেন, তাহলে হয়তো লটারির প্রয়োজনই হতো না।”
রহিম এবার মাথা তুললেন। “তাহলে আমি কি শুরু করতে পারতাম?”
“অবশ্যই।”
“অল্প টাকা দিয়ে?”
“অবশ্যই।”
ম্যানেজার হাসলেন।
“সম্পদ তৈরির জন্য সবসময় বড় টাকা লাগে না। সময়, নিয়মিত সঞ্চয় আর সঠিক আর্থিক সিদ্ধান্ত—এই তিনটিই অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”
আবার সেই রিক্সা
চার বছর পর। গোধূলির আলো। রাস্তার মোড়ে সেই পুরোনো রিক্সা।
রহিম মিয়া আবার রিক্সার সিটে বসেছেন। হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চুল সাদা। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। প্যাডেলে চাপ দিতেই হাঁটুতে ব্যথা হয়।
তবুও রিক্সা চলছে। কারণ জীবন থেমে থাকে না।
শেষ দশ টাকা
সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর পকেটে ছিল মাত্র কুড়ি টাকা। রাস্তার পাশের দোকানে গিয়ে তিনি দশ টাকা দিয়ে এক কাপ লিকার চা কিনলেন। গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেন।
তারপর পকেট থেকে বাকি দশ টাকার নোটটা বের করলেন। সামনের লটারির দোকানের দিকে তাকালেন।
দোকানদার তাঁকে দেখে হেসে বলল, “রহিম কাকা, একটা টিকিট দেব?”
রহিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল চার বছর আগের সেই দিন। এক কোটি টাকা। ভিড়। আত্মীয়। বন্ধু। দামি গাড়ি। বিশাল বাড়ি। তারপর—শূন্যতা। রিক্সা। দেনা। অভাব। ম্যানেজারের কথা।
“টাকাকে আপনার জন্য কাজ করাতে জানতে হয়।”
রহিমের আঙুলে ধরা দশ টাকার নোটটা কাঁপছিল।
দোকানদার আবার বলল, “কাকা, ভাগ্য খুলে যেতে পারে!”
রহিম টিকিটগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর—সে কী করল? সে কি টিকিটটা কিনল? নাকি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা এবার সত্যিই বুঝতে পারল?
কয়েক সেকেন্ড পর রহিম ধীরে ধীরে দশ টাকার নোটটা পকেটে ঢুকিয়ে দিল। দোকানদার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রহিম শুধু বলল—
“ভাগ্যের ওপর আর কতদিন ভরসা করব?”
তারপর রিক্সার হ্যান্ডেল ধরলেন। ধীরে ধীরে প্যাডেলে চাপ দিলেন। রিক্সা এগিয়ে গেল অন্ধকার হয়ে আসা রাস্তার দিকে।
হয়তো তাঁর কাছে আর কোটি টাকা নেই। হয়তো বিশাল বাড়ি নেই। হয়তো দামি গাড়িও নেই। কিন্তু সেদিন প্রথমবার তাঁর হাতে ফিরে এসেছিল এমন একটি জিনিস, যা কোটি টাকা দিয়েও কেনা যায় না—
আর্থিক বোধ।
ভাগ্য একদিন আপনাকে টাকা দিতে পারে। কিন্তু সেই টাকা ধরে রাখতে হলে জ্ঞান প্রয়োজন।
আয় করা গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্চয় করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আর সঠিকভাবে সম্পদ তৈরি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি যদি হঠাৎ এক কোটি টাকা পান, আপনি কি রহিম মিয়ার মতো খরচ করবেন, নাকি সেই টাকা দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন?