চার তরুণ আর ছ' বছরের একটি মেয়ে একসঙ্গে হাসছে
ছ' বছরের হাসি — একটি গল্প
🌿

ছ' বছরের হাসি

সম্পূর্ণ গল্প · ৬টি পর্ব

চার বন্ধুর অন্ধকার দিন · সিম্পার সঙ্গে প্রথম দেখা · যে ঘরে ভয় ঢুকতে পারেনি · শহরজুড়ে তল্লাশি · সত্যের মুখোমুখি · নতুন জীবনের দরজা

সূচিপত্র দেখুন ↓
আপনি আগে এই পর্যন্ত পড়েছিলেন।

শহরটা ব্যস্ত। দিনের আলোয় তার রাস্তায় ভিড়, গাড়ির হর্ন, দোকানপাটের হইচই — জীবন যেন নিজের গতিতেই ছুটে চলেছে। অথচ সেই একই শহরের এক কোণে চার তরুণের জীবন যেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল।

অয়ন, রাহুল, সৈকত আর প্রদীপ — চারজন কলেজ থেকেই বন্ধু। চারজনই উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী, আর এক সময় নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখেছিল।

একজন ভালো চাকরি করবে, একজন ব্যবসা শুরু করবে, একজন বিদেশে যাবে — কত পরিকল্পনাই না করেছিল তারা!

কিন্তু পড়াশোনা শেষ হতেই বাস্তব জীবন তাদের সামনে সম্পূর্ণ অন্য এক ছবি তুলে ধরল।

একের পর এক চাকরির পরীক্ষা।

একের পর এক ইন্টারভিউ।

আর তারপর, প্রতিবারই একই উত্তর—

"আপনি নির্বাচিত হননি।"

প্রথমে মন খারাপ হলেও তারা হাল ছাড়েনি। অয়ন প্রতিদিন খবরের কাগজে চাকরির বিজ্ঞাপন খুঁজত। সৈকত বিভিন্ন কোম্পানির ওয়েবসাইটে আবেদন করত। রাহুল টিউশনি করে কোনোরকমে নিজের খরচ চালাত। আর প্রদীপ দিনের পর দিন কাজের খোঁজে এ জায়গা থেকে সে জায়গায় ঘুরে বেড়াত।

কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেল।

চাকরি আর এল না।

একদিন অয়নের বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন,

— "এত পড়াশোনা করে কী লাভ হল? সংসারে একটা টাকাও তো আনতে পারিস না!"

অয়নের কোনো উত্তর ছিল না।

মাথা নিচু করে সে নিজের ঘরে ফিরে গেল।

সৈকতের পরিবারেরও অবস্থা ভালো ছিল না। মা অসুস্থ। কখনও কখনও মায়ের ওষুধ কিনতে বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করতে হত তাকে।

রাহুলের বাবা বারবার বলতেন,

— "তুই শান্ত ছেলে, বুদ্ধিমান ছেলে। ভালো চাকরি নিশ্চয়ই পাবি।"

কিন্তু বাবার সেই আশার কথার আড়ালে সংসারের টাকার টানাটানি ক্রমশ বাড়ছে, তা রাহুল টের পেত।

আর প্রদীপ?

তার স্বভাবটা একটু আলাদা।

রাগী, জেদি, অধৈর্য।

একের পর এক ব্যর্থতা তাকে দিনে দিনে আরও কঠিন করে তুলছিল।

• • •

এক সন্ধ্যায় চার বন্ধু শহরের এক পুরনো চায়ের দোকানে বসেছিল।

টেবিলে চার কাপ চা। কিন্তু কেউ একটাও কথা বলছিল না।

শেষে নীরবতা ভাঙল প্রদীপই।

— "আর কতদিন?"

রাহুল মুখ তুলে তাকাল।

— "কী?"

— "আর কতদিন এইভাবে চলবে? চাকরি নেই, টাকা নেই, রোজ বাড়িতে অপমান। আমাদের মতো ছেলেদের জন্য কি সত্যিই এই সমাজে কোনো জায়গা নেই?"

সৈকত ধীরে ধীরে বলল,

— "আমি তো অন্তত চেষ্টা করে যাচ্ছি।"

প্রদীপ তিক্ত হাসি হাসল।

— "চেষ্টা? আর কত বছর চেষ্টা করবি? যতদিন না নিজের বাড়ির লোক ঘাড় ধরে বার করে দেয়?"

অয়ন চুপ করে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

— "আমাদের একটা রাস্তা বার করতেই হবে।"

কথাটা শুনে বাকি তিনজন তার দিকে তাকাল।

সেই সন্ধ্যায় তারা অনেকক্ষণ কথা বলল।

চাকরি, ব্যবসা, ঋণ — একে একে সব সম্ভাবনার কথা উঠল। কিন্তু প্রতিটা রাস্তাই যেন একটা বন্ধ দরজায় গিয়ে শেষ হচ্ছিল।

শেষে প্রদীপ নিচু গলায় বলল,

— "একটা উপায় আছে, যাতে খুব তাড়াতাড়ি অনেক টাকা পাওয়া যায়।"

রাহুল ভুরু কুঁচকে তাকাল।

— "কী উপায়?"

প্রদীপ চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে এগিয়ে এল।

তারপর এমন একটা কথা বলল, যার পর চার বন্ধুর জীবন আর কোনোদিন আগের মতো রইল না।

— "শহরের শিল্পপতি অশোক আগরওয়ালকে চিনিস?"

অয়ন বলল,

— "চিনি। বিরাট ব্যবসা। শহরের বাইরে বড় কারখানাও আছে।"

প্রদীপ বলল,

— "ওঁর একটা মেয়ে আছে। ছ' বছর বয়স।"

রাহুলের বুকটা ধক করে উঠল।

— "তারপর?"

প্রদীপ ঠান্ডা গলায় বলল,

— "যদি কয়েকটা দিনের জন্য মেয়েটাকে আমরা সরিয়ে রাখি...?"

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রাহুল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

— "তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?"

প্রদীপ শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।

— "কেন?"

— "একটা ছোট বাচ্চাকে অপহরণ? এটা অপরাধ! তুই বুঝতে পারছিস কী বলছিস?"

অয়নেরও অস্বস্তি বাড়ছিল।

সৈকত কিছুই বলল না।

কিন্তু প্রদীপ এবার নিজের যুক্তি সাজাতে শুরু করল।

— "আমরা কারও কোনো ক্ষতি করব না। শুধু কয়েকটা দিন রাখব। তারপর টাকা নিয়ে ছেড়ে দেব। অশোক আগরওয়ালের কাছে কয়েক কোটি টাকা কিছুই না।"

রাহুল কঠিন গলায় বলল,

— "টাকা নেই বলেই কি অপরাধ করা জায়েজ হয়ে যায়?"

প্রদীপ চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর অয়ন বলল,

— "আজ রাতটা বাড়ি ফিরে যাই। এই কথা আর কখনও বলিস না।"

চারজনই উঠে পড়ল।

• • •

কিন্তু সেই রাতে কেউই ঠিকমতো ঘুমাতে পারল না।

অয়নের মাথায় একই কথা ঘুরছিল — আমরা কি সত্যিই এত নিচে নামতে পারি?

সৈকতের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল মায়ের মুখটা।

রাহুল নিজেকে বারবার বলছিল—

"যা-ই হোক না কেন, একটা বাচ্চার কোনো ক্ষতি আমি হতে দেব না।"

আর প্রদীপ?

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকার শহরের দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—

"টাকা হাতে এলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।"

কিন্তু কেউই জানত না, খুব শিগগিরই ছ' বছরের একটা ছোট্ট মেয়ে তাদের এই অন্ধকার পরিকল্পনার ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়াবে।

আর সেই ছোট্ট মেয়েটিই বদলে দেবে চারজনের জীবন।

ক্রমশ… 🌸

• • •

পর্ব ২

সিম্পার সঙ্গে প্রথম দেখা

সূচিপত্রে ফিরুন ↑

অনেক দ্বিধার পর চার বন্ধু একদিন সিম্পাকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করল। কিন্তু তারপর তারা কী করবে, তা তারা নিজেরাই জানত না।

সুযোগ যখন এল আর তারা সিম্পার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ছ' বছরের মেয়েটা একটুও ভয় পেল না। বরং বড় বড় চোখ করে চারজনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— "তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?"

প্রদীপ একটু কড়া গলায় বলল,

— "কয়েকটা দিন আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে তোমাকে।"

সিম্পা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "কেন?"

এবার রাহুল আর চুপ করে থাকতে পারল না। সিম্পার সামনে বসে নরম গলায় বলল,

— "আমরা খুব বিপদে আছি, সোনা। আমাদের কারও চাকরি নেই। বাড়িতে অনেক কষ্ট। টাকার জন্য আমরা খুব কষ্ট পাচ্ছি।"

সিম্পা মন দিয়ে শুনল।

তারপর তার ছোট্ট গলায় বলল,

— "তাহলে তোমরা কাঁদছ কেন?"

চার বন্ধু একে অপরের দিকে তাকাল।

অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— "আমরা একটা অন্যায় করতে চলেছি।"

সিম্পা একটু চুপ করে থেকে বলল,

— "কিন্তু আমার বাবার তো অনেক টাকা!"

প্রদীপ বলল,

— "সেই জন্যেই তো..."

কিন্তু কথাটা সে শেষ করতে পারল না।

সিম্পা হঠাৎ বলল,

— "আমি তোমাদের সঙ্গে যাব।"

রাহুল চমকে উঠল।

— "তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে?"

সিম্পা মাথা নাড়ল।

— "হ্যাঁ। বাবার অনেক টাকা, আর সেই জন্য বাবা গরিব লোকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না।"

চারজনই হতভম্ব হয়ে গেল।

সিম্পা বাচ্চাদের সরল ভাষায় বলে চলল,

— "একদিন এক কাকু বাবার কাছে টাকা চাইতে এসেছিল। বাবা খুব বকেছিল। কাকুটা কাঁদছিল।"

একটু থেমে সে আবার বলল,

— "আর একজন দাদু এসেছিল। বাবার লোকেরা তাকেও বার করে দিয়েছিল।"

রাহুলের মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

সিম্পা এবার বলল,

— "বাবাকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।"

প্রদীপ এতক্ষণ কঠিন মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল। কথাটা শুনে তার মুখেও যেন একটুখানি হাসি খেলে গেল।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল যা, তা কেউ বুঝতে পারেনি — এই ছোট্ট মেয়েটাই খুব শিগগিরই চারজনের জীবন বদলে দিতে চলেছে।

আর রাহুলের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—

"এই নিষ্পাপ বাচ্চাটার সঙ্গে আমরা কি সত্যিই এত বড় অন্যায় করতে চলেছি?"

ক্রমশ… 🌸

• • •

পর্ব ৩

যে ঘরে ভয় ঢুকতে পারেনি

সূচিপত্রে ফিরুন ↑

আস্তানায় সিম্পার প্রথম রাতটা কাটল অদ্ভুতভাবে।

চার বন্ধু ভেবেছিল, অচেনা পরিবেশে এসে ছ' বছরের একটা ছোট মেয়ে ভয় পাবে, কাঁদবে। বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য বায়না করবে।

কিন্তু সিম্পা যেন একেবারে অন্য ধাতুতে গড়া।

রাতের খাওয়ার পর সে অয়ন, রাহুল, সৈকত আর প্রদীপের দিকে একবার করে তাকিয়ে বলল,

— "তোমরা চারজন বন্ধু?"

অয়ন মাথা নাড়ল।

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে এখন আমারও চারজন বন্ধু হল!"

চারজনই চুপ করে গেল।

কেউই বলে উঠতে পারল না — "আমরা তোমার বন্ধু নই। আমরা তোমাকে অন্যায়ভাবে এখানে এনেছি।"

রাহুল শুধু বলল,

— "হ্যাঁ, আমরা তোমার সঙ্গেই আছি।"

সিম্পা নিশ্চিন্ত মনে শুয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ঘুমের নরম, মিষ্টি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

কিন্তু চার বন্ধুর চোখে ঘুম রইল না।

অয়ন ফিসফিস করে বলল,

— "কী সহজে আমাদের বিশ্বাস করে ফেলল!"

সৈকত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— "আমরা কত বড় অন্যায় করেছি, ভাবতে পারিস?"

প্রদীপ কিছুই বলল না।

শুধু ঘুমন্ত সিম্পার দিকে তাকিয়ে রইল।

পরদিন সকাল

জানালা দিয়ে রোদ এসে সিম্পার ঘুম ভাঙাল।

চোখ খুলে সে চারপাশে তাকাল।

তারপর বিছানা থেকে নেমে বলল,

— "গুড মর্নিং!"

রাহুল তখন জলখাবার তৈরি করছিল।

সে হেসে বলল,

— "গুড মর্নিং। কী খাবে?"

সিম্পা একটু ভেবে বলল,

— "তোমরা যা খাবে, আমিও তাই খাব।"

রাহুলের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

— "বেশ, তাহলে খিচুড়িই হোক।"

সিম্পা হাততালি দিয়ে উঠল।

— "আমি খিচুড়ি খুব ভালোবাসি!"

এদিকে প্রদীপ ঘরের মধ্যে একটা জিনিস খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল।

— "কোথায় গেল? কেউ কোনো জিনিস জায়গামতো রাখে না!"

তার গলার আওয়াজ শুনে অয়ন আর সৈকত দুজনেই চুপ করে গেল।

কিন্তু সিম্পা একটুও ভয় পেল না।

সে ধীরে ধীরে প্রদীপের কাছে গিয়ে তার শক্ত হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল,

— "রাগলে তোমাকে একটুও ভালো লাগে না। একটু হাসবে না?"

প্রদীপ যেন একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে থমকে গেল।

সে সিম্পার দিকে তাকাল।

এতদিন তার রাগ দেখলে সবাই সরে যেত। আর এই ছোট্ট মেয়েটা তার রাগকে ভয় না পেয়ে উল্টে তাকে হাসতে বলছে!

প্রদীপ মুখ ঘুরিয়ে নিল।

— "আমি... এমনিই রেগে গিয়েছিলাম।"

সিম্পা মিষ্টি করে বলল,

— "তাহলে আর রাগ কোরো না।"

প্রদীপের ঠোঁটের কোণে নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।

সিম্পা হাততালি দিয়ে বলল,

— "এই তো! এবার তোমাকে ভালো লাগছে।"

রান্না করতে করতে রাহুল পুরো দৃশ্যটা দেখছিল।

তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা।

চার নতুন বন্ধু

জলখাবার শেষ হতেই সিম্পা ঘরের এক কোণে রাখা একটা পুরনো লুডো বোর্ড খুঁজে পেল।

— "এটা কী?"

অয়ন বলল,

— "লুডো।"

— "খেলবে?"

চারজন একে অপরের দিকে তাকাল।

শেষে সবাই বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরেই ঘরের পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল।

সিম্পা জিতলে হাততালি দিত।

হেরে গেলে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকত।

প্রদীপ ইচ্ছে করে হেরে গেলে সে খুশি হয়ে বলত,

— "প্রদীপ দাদাই সবচেয়ে ভালো!"

প্রদীপ মুখটা কঠিন করে রাখত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে গলে যাচ্ছিল।

দুপুরে সিম্পা অয়নের কাছে গল্প শুনল।

সৈকতের কাছে ছবি আঁকা শিখল।

আর রাহুলের রান্না খেয়ে ঘোষণা করল,

— "রাহুল দাদা সবচেয়ে ভালো রান্না করে!"

চারজনের মুখেই হাসি।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল অপরাধবোধ।

কারণ তারা জানত — এই আনন্দের ছোট্ট জায়গাটা আসলে কোনো শিশুর ঘর নয়।

বিকেলের প্রশ্ন

বিকেলে সিম্পা জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

— "আমার বাবা কি আমাকে খুঁজছে?"

প্রশ্নটা শুনে চারজনই চুপ করে গেল।

রাহুল ধীরে ধীরে বলল,

— "হ্যাঁ। নিশ্চয়ই খুঁজছেন।"

— "আমার জন্য বাবা কি কাঁদছে?"

রাহুলের গলা ধরে এল।

অয়ন মাথা নিচু করল।

সৈকত জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

প্রদীপও এবার মুখ ঘুরিয়ে নিল।

সিম্পা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "আমি আমার বাবাকে খুব ভালোবাসি।"

এই একটা বাক্য যেন চারজনের বুকের উপর আরও ভারী একটা পাথর চাপিয়ে দিল।

রাহুল নিজেকে বলল—

"আর কতদিন আমরা এই বাচ্চাটাকে তার বাবার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারি?"

সেই রাতের কথোপকথন

সেই রাতে সিম্পা ঘুমিয়ে পড়ার পর চার বন্ধু আবার একসঙ্গে বসল।

রাহুল বলল,

— "আমাদের একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"

অয়ন বলল,

— "কী সিদ্ধান্ত?"

রাহুল দৃঢ় গলায় বলল,

— "আমরা কোনো টাকা নেব না।"

সৈকত মুখ তুলে তাকাল।

— "মানে?"

— "আমরা সিম্পাকে ফিরিয়ে দেব।"

ঘরে নীরবতা নেমে এল।

প্রদীপ এতক্ষণ চুপ করে ছিল।

সে ধীরে ধীরে বলল,

— "তুই ঠিকই বলেছিস।"

অয়ন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

— "তুইও রাজি?"

প্রদীপ কিছুক্ষণ ঘুমন্ত সিম্পার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

— "ওকে দেখার পর আমি আর টাকা চাইতে পারব না।"

রাহুল বলল,

— "আর তারপর?"

প্রদীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— "তারপর যা হওয়ার হবে। পুলিশের কাছে যেতে হলে যাব।"

সৈকত বলল,

— "আমরা কি আত্মসমর্পণ করব?"

কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।

তারপর অয়ন মাথা নাড়ল।

— "হ্যাঁ। ভুলটা যখন আমরা করেছি, তার দায়ও আমাদেরই নিতে হবে।"

ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের ঘর থেকে সিম্পার ঘুমজড়ানো গলা ভেসে এল—

— "রাহুল দাদা..."

রাহুল তাড়াতাড়ি উঠে গেল।

আধোঘুমে সিম্পা হাত বাড়িয়ে বলল,

— "তুমি আছ?"

রাহুল তার পাশে বসে হাতটা ধরে বলল,

— "আমি আছি।"

সিম্পা নিশ্চিন্তে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

রাহুল তার দিকে তাকিয়ে নিজেকে বলল—

"কাল তোমাকে তোমার বাবার কাছে ফিরিয়ে দেব, সিম্পা।"

কিন্তু পরদিন সকালে সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগাতে গিয়েই এমন কিছু ঘটবে, যা সিদ্ধান্তটা রাখা অনেক কঠিন করে তুলবে।

ক্রমশ… 🌸

• • •

পর্ব ৪

শহরজুড়ে তল্লাশি

সূচিপত্রে ফিরুন ↑

সেই রাতটা অশোক আগরওয়াল আর তাঁর স্ত্রীর জীবনের দীর্ঘতম রাত হয়ে উঠল।

বাড়ির বিশাল ঘরগুলোতে আলো জ্বলছিল, নিরাপত্তারক্ষীরা ছোটাছুটি করছিল, পুলিশ একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল — কিন্তু সিম্পার কোনো খোঁজ কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না।

অশোকের স্ত্রী একই কথা বারবার বলে যাচ্ছিলেন,

— "আমার মেয়েকে খুঁজে দাও। বলো, ও কোথায়!"

কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।

অশোক সাধারণত অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষ। ব্যবসার জগতে তাঁর কঠিন সিদ্ধান্তের কথা সবাই জানে। কিন্তু সেদিন সেই মানুষটাও ভেঙে পড়েছিলেন।

বারবার তিনি মেয়ের ঘরে গিয়ে ঢুকছিলেন।

সিম্পার ছোট্ট বিছানাটা খালি পড়ে আছে।

টেবিলের উপর তার প্রিয় পুতুলটা।

এক কোণে রঙপেন্সিল।

দেওয়ালে সিম্পার একটা অসমাপ্ত আঁকা।

অশোক স্থির হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

একটা ফোনের অপেক্ষা

রাত গভীর হল।

অশোকের মনে একটা ভয় ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছিল।

যদি অপহরণই হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই একটা ফোন আসবে।

মুক্তিপণ চাওয়া হবে।

কত টাকা, কোথায় পৌঁছে দিতে হবে — সব বলে দেওয়া হবে।

কিন্তু রাত কেটে গেল।

কোনো ফোন এল না।

একটাও না।

কোনো অচেনা নম্বর নয়।

কোনো বার্তা নয়।

মুক্তিপণের কোনো দাবিই নয়।

অশোক বারবার নিজের ফোনের দিকে তাকাচ্ছিলেন।

এক সময় তাঁর স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

— "কেউ ফোন করছে না কেন?"

অশোকের কোনো উত্তর ছিল না।

তিনি শুধু বললেন,

— "জানি না।"

স্ত্রী তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন,

— "টাকা চাইলে টাকা দেব। যত লাগে দেব। শুধু আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দিক।"

অশোক আবার চুপ করে গেলেন।

তাঁর মনে আরও ভয়ংকর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—

"টাকাই যদি উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে সিম্পাকে নিয়ে গেল কেন?"

এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে ছিল না।

থানায়

পরদিন সকালে অশোক আবার থানায় গেলেন।

তদন্তকারী অফিসার জিজ্ঞেস করলেন,

— "এখনও মুক্তিপণের কোনো ফোন আসেনি?"

অশোক মাথা নাড়লেন।

— "না।"

— "কোনো হুমকি?"

— "না।"

— "কোনো বার্তা?"

— "কিছুই না।"

পুলিশ অফিসাররাও অস্বস্তিতে পড়লেন।

অপহরণের বেশিরভাগ ঘটনায় অপরাধীরা কোনো না কোনোভাবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু এখানে — সম্পূর্ণ নীরবতা।

তদন্তকারী অফিসার বললেন,

— "এই নীরবতাটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।"

অশোক কাঁপা গলায় বললেন,

— "আমার মেয়ের কোনো ক্ষতি হতে দেবেন না — তাই না?"

অফিসার শান্তভাবে বললেন,

— "আমরা সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখছি।"

গোয়েন্দাদের তদন্ত

পরের দিন অশোকের বাড়িতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল এল।

দলের অভিজ্ঞ অফিসার অরিন্দম সেন প্রথমেই সিম্পার ঘরটা খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন।

তিনি সবকিছু লক্ষ করলেন — তার খেলনা, তার বই, তার আঁকার খাতা।

তারপর অশোককে জিজ্ঞেস করলেন,

— "আপনার কোনো শত্রু আছে?"

অশোক বললেন,

— "ব্যবসায় প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। কিন্তু আমার মেয়ের সঙ্গে কেউ এমন করবে, ভাবতে পারি না।"

গোয়েন্দা আবার জিজ্ঞেস করলেন,

— "সম্প্রতি কারও সঙ্গে বড় কোনো বিবাদ হয়েছে?"

অশোক এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

— "কয়েকজন কর্মী আমার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল। কেউ কেউ কাজও চেয়েছিল। কিন্তু..."

— "কিন্তু?"

— "সবাইকে তো সাহায্য করা যায় না।"

গোয়েন্দা তাঁর নোটবইয়ে কিছু লিখলেন।

তারপর বললেন,

— "আপনার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এমন কেউ আছেন, যিনি আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন?"

অশোক কয়েকটা নাম বললেন।

তদন্তকারীরা সেগুলো লিখে নিলেন।

শহরজুড়ে তল্লাশি

সিম্পার ছবি বিভিন্ন থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হল।

শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে তল্লাশি শুরু হল।

পুলিশ সম্ভাব্য সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

কিন্তু কোনো জোরালো সূত্র পাওয়া গেল না।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—

অপহরণকারীরা কোনো চিহ্নই রেখে যায়নি।

কোনো দাবি নেই।

কোনো ফোন নেই।

কোনো হুমকি নেই।

মুক্তিপণের কোনো উল্লেখই নেই।

অশোকের ভয় দিনে দিনে বাড়তে লাগল।

নিজে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েও তিনি স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

এদিকে...

শহরের এক নিরিবিলি প্রান্তে সেই বাড়িতে চার বন্ধু তখন সম্পূর্ণ অন্য এক মানসিক অবস্থায়।

সিম্পা সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যথারীতি সহজভাবে জিজ্ঞেস করল,

— "আজ আমরা কী খাব?"

রাহুল জোর করে হাসল।

— "খিচুড়ি।"

— "ইয়ে!"

সিম্পা হাততালি দিল।

কিন্তু চার বন্ধুর কারও মুখেই হাসি ছিল না।

অয়ন বাইরে থেকে ফিরে বলল,

— "পুলিশ সারা শহরে তল্লাশি চালাচ্ছে।"

সৈকত মাথা নিচু করল।

প্রদীপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— "আমরা কোনো ফোন করছি না।"

রাহুল তার দিকে তাকাল।

— "ফোন করার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা টাকা চাইছি না।"

অয়ন বলল,

— "কিন্তু পুলিশ যদি আমাদের খুঁজে পায়?"

রাহুল শান্তভাবে বলল,

— "পেলে পাবে। কিন্তু সিম্পাকে আমরা আর এক মুহূর্তও এখানে রাখতে পারি না।"

সিম্পা পাশেই বসে তার লুডোর ঘুঁটিগুলো সাজাচ্ছিল।

হঠাৎ সে মুখ তুলে বলল,

— "তোমরা আমাকে বাবার কাছে নিয়ে যাবে তো?"

রাহুলের চোখ ভিজে উঠল।

— "হ্যাঁ, সিম্পা।"

সিম্পা হাসল।

— "তাহলে আমি বাবাকে বলব, তোমরা আমাকে খুব ভালোভাবে রেখেছিলে।"

চার বন্ধু একে অপরের দিকে তাকাল।

তাদের অপরাধবোধ আরও ভারী হয়ে উঠল।

কিন্তু তারা জানত না—

অশোক আগরওয়ালের বাড়িতে তদন্তকারীরা তখন এমন একটা তথ্য পেয়েছেন, যা এই রহস্যের প্রথম দরজাটা খুলে দিতে পারে।

আর সেই সূত্রই শেষ পর্যন্ত তাঁদের সোজা পৌঁছে দেবে চার বেকার, মেধাবী তরুণের কাছে।

ক্রমশ… 🔍🌿

• • •

পর্ব ৫

সত্যের মুখোমুখি

সূচিপত্রে ফিরুন ↑

সেদিন গোয়েন্দা অরিন্দম সেন অশোক আগরওয়ালের বাড়িতে বসে একের পর এক সূত্র মিলিয়ে দেখছিলেন।

সিম্পার নিখোঁজ হওয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত দিকটা হল — কেউ কোনো মুক্তিপণ দাবি করেনি।

অরিন্দম বললেন,

— "আমার মনে হয় না এটা সাধারণ কোনো অপহরণ।"

অশোক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

— "তাহলে কী হতে পারে?"

— "এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে আপনার ব্যবসার যোগাযোগের পাশাপাশি আপনার ব্যক্তিগত জীবনও আমরা খতিয়ে দেখছি।"

অশোক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,

— "আমার মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত জীবনের কী সম্পর্ক?"

অরিন্দম শান্তভাবে বললেন,

— "অনেক সময় উদ্দেশ্য টাকা থাকে না — অন্য কোনো ক্ষোভও হতে পারে।"

কথাটা শুনে অশোক চুপ করে গেলেন।

একটি অস্বস্তিকর তথ্য

তদন্তকারীরা অশোকের বেশ কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বললেন।

এক পুরনো কর্মী ইতস্তত করে বললেন,

— "স্যার, একটা কথা বলব?"

— "বলুন।"

— "কিছুদিন আগে কয়েকজন শিক্ষিত ছেলে কাজের খোঁজে এসেছিল। খুব ভালো পড়াশোনা করেছিল ওরা। কিন্তু স্যার ওদের সঙ্গে খুব কড়া ভাষায় কথা বলেছিলেন।"

অরিন্দমের ভুরু কুঁচকে গেল।

— "কী বলেছিলেন ওদের?"

লোকটি একটু দ্বিধা করলেন।

— "ঠিক মনে নেই। তবে ছেলেগুলো খুব অপমানিত হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।"

আরেকজন কর্মী বললেন,

— "আগেও এমন হয়েছে।"

অরিন্দম কয়েকটা নাম লিখে নিলেন।

তদন্ত নতুন মোড় নিল।

চার বন্ধুর সিদ্ধান্ত

এদিকে আস্তানায় চার বন্ধু শেষবারের মতো একসঙ্গে বসল।

সিম্পা পাশের ঘরে পুতুল নিয়ে খেলছিল।

রাহুল বলল,

— "আজই ওকে ফিরিয়ে দিতে হবে।"

অয়ন মাথা নাড়ল।

— "হ্যাঁ।"

সৈকত বলল,

— "কিন্তু ওকে কি একেবারে বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেব?"

প্রদীপ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "যেভাবেই হোক, সিম্পাকে নিরাপদে তার বাবার কাছে পৌঁছতে হবে।"

রাহুল বলল,

— "আর তারপর?"

প্রদীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— "তারপর আমরা পালাব না।"

অয়ন তার দিকে তাকাল।

— "মানে?"

— "আমরা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করব।"

ঘর জুড়ে নীরবতা।

রাহুল ধীরে ধীরে বলল,

— "এটাই ঠিক কাজ।"

সিম্পার প্রশ্ন

খেলতে খেলতে সিম্পা তাদের কাছে এসে দাঁড়াল।

— "তোমরা কোথাও যাচ্ছ?"

রাহুল তার মাথায় হাত রেখে বলল,

— "হ্যাঁ। তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।"

সিম্পা খুশি হয়ে বলল,

— "আমাকে দেখে বাবা কী খুশিই না হবে।"

তারপর একটু ভেবে বলল,

— "কিন্তু তোমরা আমার সঙ্গে যাবে না?"

রাহুলের চোখ নেমে গেল।

— "আমাদের একটা কাজ আছে।"

সিম্পা বুঝল না।

সে চারজনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— "তোমরা খারাপ লোক নও।"

কথাটা শুনে প্রদীপ হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিল।

তার চোখে জল এসে গিয়েছিল।

সে তাড়াতাড়ি মুখটা মুছে নিল।

অশোকের অস্বস্তি

সেই সময় তদন্তকারীরা অশোক আগরওয়ালের কাছে একটা তালিকা নিয়ে এলেন।

তাতে কয়েকটা নাম ছিল।

তার মধ্যে ছিল অয়ন, রাহুল, সৈকত আর প্রদীপের নাম।

অশোক কিছুক্ষণ নামগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

হঠাৎ তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।

— "এই ছেলেগুলো..."

অরিন্দম জিজ্ঞেস করলেন,

— "আপনি এদের চেনেন?"

অশোক ধীরে ধীরে বললেন,

— "হ্যাঁ। কয়েক মাস আগে ওরা আমার অফিসে এসেছিল।"

— "কাজের খোঁজে?"

— "হ্যাঁ।"

— "তারপর?"

অশোক চুপ করে গেলেন।

অরিন্দম বললেন,

— "আপনি কি ওদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন?"

প্রশ্নটা শুনে অশোকের মুখ ভারী হয়ে এল।

একটু পরে তিনি বললেন,

— "হয়তো... আমি একটু বেশিই কঠোর হয়েছিলাম।"

অরিন্দম বললেন,

— "কী বলেছিলেন ওদের?"

অশোক কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু মেয়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ফেরার পথ

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে চার বন্ধু সিম্পাকে নিয়ে রওনা দিল।

সিম্পা সেদিন অদ্ভুত রকম খুশি ছিল।

সে বারবার বলছিল,

— "আমি বাবাকে একটা কথা বলব।"

রাহুল জিজ্ঞেস করল,

— "কী কথা?"

— "বলব, তোমরা আমাকে খুব ভালোভাবে রেখেছিলে।"

অয়ন আর সৈকত দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

প্রদীপ গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।

রাহুল সিম্পার দিকে তাকিয়ে নিজেকে বলল,

"তুমি আমাদের জীবনে এসে আমাদের অপরাধী বানাওনি, সিম্পা। তুমি দেখিয়ে দিলে — আমরা এখনও আবার ভালো মানুষ হতে পারি।"

এদিকে থানায়

গোয়েন্দা অরিন্দম সেনের টেবিলে পড়ে ছিল চার বন্ধুর একটা ছবি।

তিনি এক অফিসারকে বললেন,

— "এদের খুঁজে বার করুন।"

অফিসার জিজ্ঞেস করলেন,

— "অপহরণের সঙ্গে এদের যোগ নিশ্চিত?"

অরিন্দম বললেন,

— "এখনও নয়।"

তারপর একটু থেমে যোগ করলেন,

— "কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপারটা এখানেই — সিম্পা যদি সত্যিই ওদের কাছে থাকে, তাহলে এতদিনেও ওরা মুক্তিপণ চাইল না কেন?"

এই প্রশ্নের উত্তর তখনও কারও কাছে ছিল না।

কিন্তু সেই উত্তর খুব শিগগিরই সামনে আসতে চলেছিল।

কারণ চার বন্ধু ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—

তারা সিম্পাকে ফিরিয়ে দিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করবে।

আর সেই সাক্ষাৎই অশোক আগরওয়াল, সিম্পা আর চার বন্ধুর জীবন চিরতরে বদলে দেবে।

ক্রমশ… 🌿🔍

• • •

শেষ পর্ব

নতুন জীবনের দরজা

সূচিপত্রে ফিরুন ↑

তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

অশোক আগরওয়ালের বিশাল বাড়ির সামনে হঠাৎ একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল।

প্রথমে নামল রাহুল।

তারপর অয়ন, সৈকত আর প্রদীপ।

আর সবার শেষে ছোট্ট সিম্পা।

বাড়িটা দেখেই সিম্পা আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

— "মা!"

দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে এলেন অশোকের স্ত্রী।

মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।

— "সিম্পা! সোনা আমার! এতদিন কোথায় ছিলি?"

সিম্পাও মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

— "আমি ভালোই ছিলাম, মা।"

তারপর মায়ের হাত ধরে চার তরুণের দিকে দেখিয়ে বলল,

— "ওরা আমাকে খুব যত্নে রেখেছিল।"

অশোক একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল। কিন্তু চার তরুণের দিকে চোখ পড়তেই তাঁর মুখ কঠিন হয়ে গেল।

বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা এগিয়ে এল।

কিন্তু রাহুল হাত তুলে তাদের থামাল।

— "ওদের কিছু করার দরকার নেই।"

তারপর অশোকের দিকে ফিরে বলল,

— "আমরা ভয়ংকর একটা ভুল করেছি। সিম্পাকে নিয়ে আসার কোনো অধিকার আমাদের ছিল না।"

অয়ন মাথা নিচু করে বলল,

— "আমরা একটা টাকাও দাবি করিনি।"

সৈকত বলল,

— "আমরা শুধু... ভুল পথে পা বাড়িয়ে ফেলেছিলাম।"

প্রদীপ এতক্ষণ চুপ করে ছিল।

সে এগিয়ে এসে বলল,

— "দোষটা সবচেয়ে বেশি আমার। আমিই সবাইকে এর মধ্যে টেনে এনেছি।"

তারপর চারজন একসঙ্গে বলল,

— "আমরা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে এসেছি।"

অশোকের প্রশ্ন

অশোক অনেকক্ষণ ধরে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

— "টাকাই যদি না চাইবে, তাহলে আমার মেয়েকে নিয়ে গেলে কেন?"

অয়ন মাথা নিচু করে বলল,

— "আমরা অনেকদিন ধরে বেকার। বাড়িতে টাকার অভাব, অপমান, অনবরত অশান্তি... আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।"

রাহুল বলল,

— "কিন্তু সিম্পাকে নিয়ে আসার পর আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, কত বড় ভুল করেছি।"

অশোক সিম্পার দিকে তাকালেন।

— "ওরা তোকে কী করেছে?"

সিম্পা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

— "ওরা আমার সঙ্গে খেলেছে!"

অশোক হতভম্ব হয়ে গেলেন।

সিম্পা একে একে বলতে লাগল,

— "অয়ন দাদা আমাকে গল্প বলেছে। সৈকত দাদা আমার সঙ্গে ছবি এঁকেছে। রাহুল দাদা খিচুড়ি রান্না করে আমাকে খাইয়েছে।"

তারপর প্রদীপের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

— "আর প্রদীপ দাদা তো খুব রাগী। আমি বলেছিলাম, রাগলে তোমাকে ভালো লাগে না। তারপর ও হাসত!"

প্রদীপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

অশোকের চোখ স্থির হয়ে রইল সামনে দাঁড়ানো চারটে মুখের উপর।

তিনি বুঝলেন — এরা পেশাদার অপরাধী নয়।

এরা ভয়ংকর একটা ভুল করেছে।

কিন্তু সেই ভুলের মধ্যেও এই কয়েকটা দিন তারা সত্যিকারের যত্নে তাঁর মেয়েকে রেখেছে।

আর সবচেয়ে বড় কথা—

তারা একবারও মুক্তিপণ চায়নি।

চাইলে তারা পালিয়ে যেতে পারত।

তার বদলে তারা নিজেরাই সিম্পাকে ফিরিয়ে এনেছে, আর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে এসেছে।

অশোকের উপলব্ধি

অশোক ধীরে ধীরে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন।

নিজের অতীতের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠতে লাগল।

কত মানুষ তাঁর কাছে কাজের খোঁজে এসেছে।

কত গরিব মানুষ তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে এসেছে।

কতবার তিনি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।

কত তরুণ চাকরির আশায় তাঁর অফিসে ঢুকেছে — আর তিনি তাদের কথা বলারই সুযোগ দেননি।

তিনি চার বন্ধুর দিকে তাকালেন।

— "তোমরা আমার কাছে চাকরির খোঁজে এসেছিলে?"

অয়ন মাথা নাড়ল।

— "হ্যাঁ।"

— "আমি কি তোমাদের অপমান করেছিলাম?"

চারজনই চুপ করে রইল।

সেই নীরবতাই উত্তর হয়ে গেল।

অশোক একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেললেন।

— "অপরাধটা তাহলে তোমাদের। কিন্তু তোমরা এই জায়গায় এসে পৌঁছলে কেন, তার কিছুটা দায় আমারও।"

রাহুল অবাক হয়ে মুখ তুলল।

অশোক বললেন,

— "তোমরা যা করেছ, তা ক্ষমার যোগ্য নয়। কিন্তু তোমরা নিজেরাই আমার মেয়েকে ফিরিয়ে এনেছ, আর পুলিশের সামনে দাঁড়াতে এসেছ — এটাও আমি উপেক্ষা করতে পারি না।"

তিনি এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

— "আমি তোমাদের একটা সুযোগ দিতে চাই।"

নতুন এক পরীক্ষা

অশোক পুলিশকে পুরো ঘটনাটা জানালেন।

তিনি স্পষ্ট করে বললেন, চার তরুণ নিরাপদে তাঁর মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং কোনোদিন কোনো মুক্তিপণ দাবি করেনি।

তিনি বুঝতেন, আইনি প্রক্রিয়া নিজের পথেই চলবে। তবু তিনি ঠিক করলেন, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান না নিয়ে আইনের সীমার মধ্যে থেকে যতটা সম্ভব তাদের পাশে দাঁড়াবেন।

তারপর তিনি চারজনকে বললেন,

— "যদি সত্যিই জীবন বদলাতে চাও, তাহলে একটা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেটা প্রমাণ করো।"

চারজনই অবাক হয়ে গেল।

অশোক বললেন,

— "দয়া করে আমি তোমাদের চাকরি দেব না।"

— "তাহলে?"

— "প্রমাণ করতে হবে, তোমরা এর যোগ্য।"

পরদিন তাঁর কোম্পানিতে একটি বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করা হল।

লিখিত পরীক্ষা।

সমস্যা সমাধান।

কারিগরি দক্ষতা।

যুক্তি ও বিশ্লেষণ।

তারপর ইন্টারভিউ।

চারজনই নিজেদের সবটুকু দিয়ে পরীক্ষা দিল।

ফল প্রকাশের দিন অশোক নিজেই তাদের ডেকে পাঠালেন।

হেসে বললেন,

— "তোমরা চারজনই উত্তীর্ণ হয়েছ।"

চারজনের চোখ জলে ভরে উঠল।

প্রদীপ চুপি চুপি বলল,

— "স্যার, আমরা কি সত্যিই এই সুযোগের যোগ্য?"

অশোক বললেন,

— "পরীক্ষায় তোমরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছ। এবার জীবনেও প্রমাণ করো।"

কয়েক মাস পরে

সময় এগিয়ে চলল।

অয়ন কোম্পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ শুরু করল।

রাহুলের দক্ষতা খুব তাড়াতাড়ি সবার নজরে পড়ল।

সৈকত কারিগরি বিভাগে নিজেকে প্রমাণ করল।

আর প্রদীপ?

যে ছেলেটা এক সময় সামান্য কারণেই রেগে যেত, সে ধীরে ধীরে নিজের রাগকে সামলাতে শিখল।

একদিন অফিস থেকে বেরিয়ে চার বন্ধু পাশাপাশি হাঁটছিল।

প্রদীপ হঠাৎ বলল,

— "মনে আছে, এই সবকিছু কীভাবে শুরু হয়েছিল?"

সৈকত হেসে ফেলল।

— "ভুলি কী করে?"

অয়ন বলল,

— "আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।"

রাহুল মৃদু হাসল।

— "আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা।"

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা ছোট্ট গলা ডেকে উঠল,

— "দাদারা!"

চারজন পিছন ফিরে তাকাল।

সিম্পা ছুটে আসছে তাদের দিকে।

সে কাছে এসে প্রদীপের হাত ধরে বলল,

— "আজ রাগ করোনি তো?"

প্রদীপ হেসে বলল,

— "না।"

সিম্পা বলল,

— "তাহলে তুমি এখন ভালো ছেলে!"

চারজনই হেসে ফেলল।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে অশোক দৃশ্যটা দেখছিলেন।

তাঁর মনে হল—

কখনও কখনও একটা ছোট্ট শিশুর নিষ্পাপ হাসি এমন কিছু করতে পারে, যা জ্ঞানী মানুষের বড় বড় উপদেশও পারে না।

শেষ কথা

চার বন্ধু কোনোদিন নিজেদের অতীত ভোলেনি।

বরং সেই ভুলটাকে তারা জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হিসেবে সঙ্গে নিয়ে চলেছে।

তারা বুঝেছিল—

অভাব মানুষকে পরীক্ষায় ফেলতে পারে, কিন্তু অন্যায়কে কখনও সঠিক করে তোলে না।

অপমান মানুষকে ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু অন্যায়ের পথ বেছে নেওয়ার অধিকার কখনও দেয় না।

আর ঠিক ততটাই তারা শিখেছিল—

একটা ভুল সিদ্ধান্ত মানুষের গোটা জীবন শেষ করে দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের অনুশোচনা, সাহস আর সৎ পরিশ্রম সেই জীবনকে আবার নতুন করে গড়েও তুলতে পারে।

সিম্পার ছোট্ট একটা হাসি চার তরুণকে অপরাধের অন্ধকারের কিনারা থেকে ফিরিয়ে এনেছিল।

আর সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের জীবনের নতুন এক অধ্যায়—

অপরাধের নয়, সততার।
হতাশার নয়, পরিশ্রমের।
পরাজয়ের নয়, নতুন করে শুরু করার।

🌸 সমাপ্ত 🌸

সূচিপত্রে ফিরুন ↑