সেদিন ছিল ভীষণ বর্ষার দুপুর।
নামী হাসপাতালের সামনের ফুটপাত জুড়ে তখন বৃষ্টির জল জমে ছোট ছোট স্রোত তৈরি হয়েছে। পথচারীরা কেউ ছাতা মাথায়, কেউ পলিথিনের আড়ালে, কেউ বা দৌড়ে হাসপাতালের গেটের দিকে ছুটছে।
আমি পড়ে ছিলাম এক হকারের দোকানের সামনে।
আমার চারপাশে আরও কত পুরোনো জিনিস — ব্যাগ, ঘড়ি, বই, কিছু খেলনা আর কয়েকটি ছাতা।
হকার মাঝে মাঝে আমাকে তুলে দেখাচ্ছিল।
"বেশ মজবুত ছাতা। পুরোনো, কিন্তু একদম কাজের।"
আমি চুপ করে ছিলাম।
পুরোনো তো হয়েছি।
কিন্তু আমার মনে এখনও একটা পুরোনো মানুষের স্মৃতি একটুও পুরোনো হয়নি।
সুকুমার চ্যাটার্জ্জী।
কত বছর হয়ে গেল!
আমি জানি না।
তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল সেই চায়ের দোকানে। তিনি আমাকে টেবিলের পাশে রেখে চলে গিয়েছিলেন।
তারপর কত মানুষের হাত ঘুরে আজ আমি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি!
হয়তো আমার জীবনের শেষটাও এখানেই।
হয়তো কোনো অচেনা মানুষ আমাকে কিনে নিয়ে যাবে।
ঠিক তখনই দূর থেকে একজন বৃদ্ধ মানুষকে এগিয়ে আসতে দেখলাম।
প্রথমে তাঁকে চিনতে পারিনি।
চুলে আগের চেয়ে অনেক বেশি পাক ধরেছে।
মুখে বয়সের রেখা।
চোখে মোটা চশমা।
হাঁটার গতি আগের মতো দ্রুত নয়।
তবু তাঁর হাঁটার সেই পরিচিত ভঙ্গি...
আমার ভেতরের কোথাও যেন একটা পুরোনো ঘণ্টা বেজে উঠল।
এ কি... সুকুমারবাবু?
তিনি ধীরে ধীরে হকারের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিলেন।
হকার আমাকে তুলে ধরল।
"কর্তাবাবু, এই ছাতাটা নিন। খুব মজবুত। জলে একটুও ভিজবেন না।"
সুকুমারবাবু ছাতাটার দিকে তাকালেন।
তারপর হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরলেন।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো —
আমি আবার বাড়ি ফিরে এসেছি।
তাঁর আঙুল আমার বাঁকা কাঠের হাতলটার ওপর বুলিয়ে গেল।
একবার... দুবার...
হঠাৎ তাঁর হাত থেমে গেল।
তিনি হাতলটা চোখের কাছে নিয়ে এলেন।
বৃষ্টির আলো-আঁধারিতে খোদাই করা দুটি অক্ষর এখনও স্পষ্ট —
S.K.
তিনি স্থির হয়ে গেলেন।
কয়েক সেকেন্ড যেন পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেল।
হকার কিছু বুঝতে না পেরে বলল,
"কী হলো কর্তাবাবু? নেবেন তো?"
সুকুমারবাবু কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু ছাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে করে বললেন,
"এই দাগটা..."
আঙুল দিয়ে তিনি হাতলের খোদাই করা অক্ষর দুটো ছুঁয়ে দেখলেন।
"এটা তো আমি নিজেই করেছিলাম!"
হকার অবাক।
"আপনার ছাতা?"
সুকুমারবাবু এবার আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন বহু বছর পর হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রিয়জনকে ফিরে পেয়েছেন।
"হ্যাঁ..."
তাঁর গলা ভারী হয়ে এল।
"এটা আমার ছাতা।"
হকার একটু হেসে বলল,
"তা হলে তো আরও ভালো! আপনি চিনতে পেরেছেন। নিয়ে যান।"
সুকুমারবাবু এবার আর কোনো কথা বললেন না।
পকেট থেকে টাকা বের করলেন।
হকার যে দাম বলেছিল, তার চেয়েও বেশি টাকা তাঁর হাতে দিয়ে দিলেন।
হকার বলল,
"কর্তাবাবু, এত টাকা লাগবে না।"
সুকুমারবাবু মৃদু হেসে বললেন,
"থাক।"
তারপর আমাকে শক্ত করে হাতে ধরলেন।
কত বছর পর সেই হাতের মুঠোয় ফিরে এলাম!
তিনি আমাকে খুললেন।
আমার পুরোনো লোহার শিকগুলো একটু কেঁপে উঠল।
কাপড়ের ভাঁজগুলো খুলে গেল।
তারপর আমি আবার মেলে ধরলাম নিজেকে।
ঠিক আগের মতো।
ঠিক সেই পুরোনো ছন্দে।
সুকুমারবাবু আমার নিচে দাঁড়ালেন।
বৃষ্টির জল আমার কালো কাপড়ের ওপর পড়তে লাগল।
টুপটাপ... ঝমঝম...
কিন্তু এবার সেই শব্দে আমার কোনো কষ্ট হচ্ছিল না।
বরং মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টিই যেন আমাদের ফিরে পাওয়ার উৎসব করছে।
সুকুমারবাবু ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলেন।
কিছুদূর গিয়ে তিনি থামলেন।
আমার হাতলের দিকে তাকালেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
"তুই আবার ফিরে এলি তাহলে?"
আমি কথা বলতে পারিনি।
তবু যদি পারতাম, হয়তো বলতাম —
"আমি তো কখনোই আপনাকে ছেড়ে যেতে চাইনি, সুকুমারবাবু। মানুষই আমাকে এক হাত থেকে আরেক হাতে পাঠিয়েছে। আমি শুধু অপেক্ষা করেছি — কবে আবার আপনার হাতে ফিরব।"
বৃষ্টি আরও জোরে নামছিল।
কিন্তু সেদিন আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় আমি আবার ফিরে এসেছি।
সুকুমারবাবুর মাথার ওপর।
তাঁর পরিচিত হাতের মুঠোয়।
তাঁর সঙ্গে বাড়ির পথে।
বহু বছর আগে যে জায়গা থেকে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেখানেই ফিরে এলাম।
তখন বুঝলাম —
কিছু সম্পর্কের কোনো কাগজের ঠিকানা লাগে না।
কিছু সম্পর্ককে পৃথিবীর যত দূরেই ছুড়ে দেওয়া হোক, তারা পথ চিনে নেয়।
কত মানুষের হাত ঘুরেছি আমি!
কেউ আমাকে কুড়িয়ে নিয়েছে, কেউ কিনেছে, কেউ উপহার পেয়েছে, কেউ আবার ভুল করে নিয়ে গেছে।
আমার গায়ের রং চটে গেছে।
লোহার শিকগুলো পুরোনো হয়েছে।
কাঠের হাতলে বয়সের দাগ পড়েছে।
কিন্তু আমার আসল পরিচয় হারায়নি।
সেই ছোট্ট দুটি অক্ষর —
S.K.
আর তার চেয়েও বড় পরিচয় —
আমি সুকুমার চ্যাটার্জ্জীর ছাতা।
সেদিন বৃষ্টির মধ্যে সুকুমারবাবুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হলো —
মানুষ অনেক সময় ভাবে, সে তার প্রিয় জিনিস হারিয়ে ফেলেছে।
আসলে হয়তো সেই জিনিসটিও তার মানুষটিকে খুঁজতে খুঁজতে পৃথিবীর পথে ঘুরে বেড়ায়।
আর কোনো কোনো হারানো জিনিস...
একদিন ঠিকই ফিরে আসে।
কারণ যার সঙ্গে সত্যিকারের টান আছে,
পৃথিবীর যত হাতই ঘুরতে হোক, শেষ পর্যন্ত সে তার নিজের মানুষের কাছেই ফিরে আসে। ☔❤️