কালো সুতি কাপড়ের ওপর আটটি লোহার শিক দিয়ে বাঁধাই করা এক সাধারণ ছাতা আমি।
আমার গায়ে কোনো দামি নকশা নেই, নেই চকচকে রং। বাঁকা কাঠের হাতলটাও দেখতে খুব সাধারণ। তবে একটা জিনিস আমার ছিল — মজবুত শরীর আর দীর্ঘদিনের সঙ্গীর প্রতি গভীর টান।
বেশ কয়েক বছর ধরে আমি ছিলাম একজন অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রলোকের বিশ্বস্ত সঙ্গী।
তাঁর নাম সুকুমার চ্যাটার্জ্জী।
সুকুমারবাবু যখন চাকরি করতেন, তখনও আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। অফিস যাওয়ার পথে রোদে তাঁর মাথার ওপর ছায়া হয়ে থেকেছি, বর্ষার দিনে ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছি। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও আমাদের সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বরং তখন যেন আমাদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়েছিল।
সকালবেলা বাজারে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে হাতে নিতেন।
কখনো হাঁটতে হাঁটতে আমার হাতলের ওপর আঙুল দিয়ে টোকা দিতেন। কখনো আবার বাড়ি ফিরে আমাকে বারান্দার এক কোণে দাঁড় করিয়ে রেখে বলতেন,
"এই তো, আজও বেশ কাজ করলি!"
আমি কথা বলতে পারতাম না।
কিন্তু মনে মনে ভাবতাম —
"আপনার সঙ্গে থাকতে পারাটাই তো আমার কাজ।"
আমার বাঁকা কাঠের হাতলের একটা বিশেষত্ব ছিল।
বহু বছর আগে সুকুমারবাবু নিজেই সেখানে ছোট করে তাঁর নামের আদ্যক্ষর খোদাই করেছিলেন —
S.K.
তখন হয়তো তিনি ভাবেননি, এই ছোট্ট দুটি অক্ষর একদিন আমার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু সে গল্প অনেক পরের।
সেদিনের কথা বলি।
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা কেমন যেন ভারী হয়ে ছিল। সুকুমারবাবু শহরের বড় বাজারে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বেরিয়েছিলেন।
আমি ছিলাম তাঁর হাতেই।
বাজারে তখন যথারীতি ভিড়।
সবজি বিক্রেতাদের হাঁকডাক, মাছের বাজারের গন্ধ, দোকানিদের ক্রেতা ডাক — সব মিলিয়ে চারপাশ সরগরম।
হঠাৎ দুপুরের দিকে আকাশ কালো হয়ে এল।
এক ঝটকা বাতাস বইল।
তারপর —
ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল।
মানুষজন যে যেদিকে পারল ছুটতে শুরু করল।
সুকুমারবাবু তাড়াতাড়ি আমাকে মেলে ধরলেন।
আমার কালো কাপড়ের নিচে আশ্রয় নিয়ে তিনি বাজারের ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর সামনে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান দেখতে পেলেন।
দোকানের টিনের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তিনি সেখানে ঢুকে পড়লেন।
আমাকে তিনি টেবিলের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখলেন।
তারপর দোকানদারকে বললেন,
"এক কাপ চা দিন তো।"
আমি তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ ক্রমশ বেড়ে চলেছে।
টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে —
টুপটাপ... ঝমঝম...
সুকুমারবাবু ধীরে ধীরে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন।
আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম।
কারণ আমি জানতাম, চা শেষ হলেই তিনি আমাকে তুলে নেবেন।
প্রতিদিনের মতো আবার আমরা পাশাপাশি হাঁটব।
কিন্তু সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে চলেছিল।
চা শেষ করে সুকুমারবাবু পকেট থেকে টাকা বের করলেন।
দোকানদারকে দাম মিটিয়ে দিলেন।
তারপর কাঁধে ব্যাগ তুলে নিলেন।
বাইরে তখনও বৃষ্টি।
তিনি একটু তাড়াহুড়ো করে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
ভাবলাম, এখনই নিশ্চয় ফিরে আসবেন।
কিন্তু তিনি ফিরলেন না।
আমি আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম।
তারপর বুঝলাম —
তিনি আমাকে ভুলে গেছেন।
আমার আটটি লোহার শিক যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
যে মানুষটির সঙ্গে এত বছর কাটালাম, তিনি কি সত্যিই আমাকে ফেলে চলে গেলেন?
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল।
চায়ের দোকানে নতুন লোক আসছিল, কেউ চা খাচ্ছিল, কেউ বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ছাউনির নিচে দাঁড়াচ্ছিল।
কেউ আমাকে লক্ষ্য করছিল না।
শেষ পর্যন্ত একজন মাঝবয়সী ভবঘুরে লোক দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।
তার জামাকাপড় ভিজে একাকার।
সে চারপাশে তাকাল।
তারপর তার চোখ পড়ল আমার ওপর।
লোকটি আমাকে তুলে নিল।
একবারও জিজ্ঞেস করল না —
"এই ছাতাটা কার?"
দোকানদারও কিছু বলল না।
লোকটি আমাকে খুলে মাথার ওপর ধরল।
তারপর দ্রুত পায়ে বাজারের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেল।
আমি পিছনে ফিরে তাকালাম।
সুকুমারবাবু কোথাও নেই।
সেদিন প্রথমবার মনে হলো —
মানুষের কাছে কোনো জিনিস হারিয়ে যাওয়া হয়তো খুব ছোট ঘটনা।
কিন্তু যে জিনিসটি হারিয়ে যায়, তার কাছে?
তার কাছে সেটাই হয়তো পুরো পৃথিবী বদলে যাওয়ার মুহূর্ত।
লোকটি আমাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে, আমি জানতাম না।
শুধু জানতাম —
সুকুমারবাবুর হাত থেকে আমি এখন অনেক দূরে চলে যাচ্ছি।
আর আমার জীবনের আসল যাত্রা —
এইমাত্র শুরু হয়েছে।