সুকুমারবাবুর হাত ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর আমার জীবনে যেন আর কোনো স্থির ঠিকানা রইল না।
যে মানুষটির হাতের মুঠোয় বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে ছিলাম, সেই হাত থেকে বেরিয়ে আমি এখন এক সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের সঙ্গে চলেছি।
বাজারের ভিড় পেরিয়ে লোকটি আমাকে মাথার ওপর মেলে ধরে দ্রুত হাঁটছিল।
তার গায়ে পুরোনো মলিন জামা, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল। হাঁটার ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছিল, শহরের অলিগলি তার বেশ পরিচিত।
বৃষ্টি একটু কমতেই সে আমাকে বন্ধ করে কাঁধে রাখল।
তারপর শহরের ভিড় ছেড়ে ঢুকে গেল এক সরু গলিতে।
আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার গন্তব্য কোথায়।
কিছুক্ষণ পর আমরা পৌঁছলাম শহরতলির এক পুরোনো বাজারে।
সেটা সাধারণ বাজার নয়।
এখানে নতুন জিনিসের চেয়ে পুরোনো জিনিসের সংখ্যাই বেশি। ভাঙা রেডিও, পুরোনো ঘড়ি, ব্যবহৃত ব্যাগ, মরচে ধরা লোহার জিনিস, পুরোনো বই — কী নেই সেখানে!
লোকটি আমাকে একটি দোকানের সামনে রেখে দোকানদারকে বলল,
"ছাতাটা নেবেন? ভালো জিনিস।"
দোকানদার আমাকে হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক দেখল।
আমার কালো কাপড় তখনও বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। আটটি লোহার শিকও শক্তপোক্ত।
সে কিছুক্ষণ দরদাম করে শেষ পর্যন্ত লোকটির হাতে কুড়ি টাকা দিল।
এই প্রথম বুঝলাম —
আমার মূল্য নির্ধারিত হয়ে গেল কুড়ি টাকা।
অবশ্য জিনিসের দাম দিয়ে তার স্মৃতির মূল্য কি কখনো মাপা যায়?
সুকুমারবাবুর সঙ্গে কাটানো সেই বছরের পর বছর কি কুড়ি টাকার সমান?
আমি চুপ করে রইলাম।
সেদিনই আমাকে কিনে নিল এক কলেজপড়ুয়া ছেলে।
ছেলেটি আমাকে হাতে নিয়ে বেশ খুশি।
দোকানদার বলল,
"ছাতাটা কিন্তু বেশ মজবুত। অনেক দিন চলবে।"
ছেলেটি হাসল।
"এইটাই তো চাই। নতুন ছাতা কিনলে মাসখানেকেই নষ্ট হয়ে যায়।"
তারপর আমাকে ব্যাগের পাশে গুঁজে নিয়ে সে চলে গেল।
আমার নতুন জীবন শুরু হলো কলেজে।
প্রতিদিন সকালে ছেলেটি আমাকে নিয়ে বের হতো।
বাসস্ট্যান্ড, রাস্তা, কলেজের করিডর — সব জায়গাতেই আমি তার সঙ্গে থাকতাম।
বৃষ্টি হলে আমাকে মাথার ওপর মেলে ধরত।
রোদ হলে কখনো কখনো ব্যাগের পাশে ঝুলিয়ে রাখত।
তার কয়েকজন বন্ধু আমাকে নিয়ে খুব মজা করত।
একদিন একজন বলল,
"তোর ছাতাটার বয়স তো তোর বাবার থেকেও বেশি মনে হচ্ছে!"
আরেকজন হেসে বলল,
"এই ছাতা দিয়ে বৃষ্টি আটকাবে, না ইতিহাস?"
সবাই হেসে উঠল।
ছেলেটিও হাসল।
আমি কিছু মনে করলাম না।
কারণ আমি জানতাম, আমার গায়ে বয়সের দাগ থাকলেও আমি এখনও শক্ত আছি।
তবু রাত নামলে আমার মন খারাপ হতো।
ছেলেটি যখন ঘুমিয়ে পড়ত, আমি ঘরের এক কোণে চুপ করে পড়ে থাকতাম।
তখন মনে পড়ত সুকুমারবাবুর কথা।
তাঁর ধীর পায়ের শব্দ।
আমাকে ভাঁজ করার সময় হাতের সেই পরিচিত স্পর্শ।
বাড়ির বারান্দার সেই কোণ।
আর তাঁর পকেটে রাখা লজেন্সের মিষ্টি গন্ধ।
কখনো কখনো মনে হতো —
সুকুমারবাবু কি আমাকে খুঁজেছিলেন?
চায়ের দোকানে ফিরে গিয়ে কি তিনি আমাকে না পেয়ে অবাক হয়েছিলেন?
হয়তো দোকানদারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন —
"আমার ছাতাটা কোথায়?"
হয়তো কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করেছিলেন।
তারপর হয়তো বাড়ি ফিরে নিজেকেই দোষ দিয়েছেন।
আমি জানতাম না।
শুধু মনে মনে চাইতাম, একদিন যদি আবার তাঁর হাতের স্পর্শ পাই!
কিন্তু মানুষের ইচ্ছেমতো তো জীবন চলে না।
কয়েক মাস কেটে গেল।
একদিন বিকেলে কলেজ ছুটির পর ছেলেটি বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল। আকাশ তখন পরিষ্কার ছিল। হঠাৎ দূরে কালো মেঘ জমল।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো প্রবল ঝড়।
ছেলেটি আমাকে খুলে মাথার ওপর ধরল।
বাতাস এত জোরে বইছিল যে আমাকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আমি প্রাণপণে মাটিতে থাকার চেষ্টা করছিলাম।
কিন্তু হঠাৎ —
একটা প্রচণ্ড দমকা হাওয়া!
আমার হুকটা ছেলেটির হাত থেকে পিছলে গেল।
আমি আকাশে উঠে গেলাম।
একবার... দুবার... তিনবার...
তারপর বাতাস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলল একটি চলন্ত রিকশার ওপর।
রিকশাওয়ালা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি।
কিছুদূর যাওয়ার পর সে পেছনে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেল।
রিকশা থামিয়ে আমাকে তুলে নিল।
আমাকে খুলে দেখে সে মৃদু হেসে বলল,
"বাহ! বেশ মজবুত তো!"
তারপর আমাকে রিকশার পেছনে রেখে আবার যাত্রা শুরু করল।
সেদিন সন্ধ্যায় সে আমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরল।
তার ছোট্ট মেয়েটি আমাকে দেখে আনন্দে ছুটে এল।
"বাবা! ছাতা!"
রিকশাওয়ালা হেসে বলল,
"হ্যাঁ, তোর জন্য এনেছি।"
মেয়েটি আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল।
সেই মুহূর্তে অনেক দিন পর আমার মনে হলো —
হয়তো আবার কোনো মানুষের ঘর পেলাম।
কিন্তু আমি জানতাম না, এই ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে আমার সম্পর্কও খুব বেশিদিনের হবে না।
কারণ আমার জীবনের পথ তখনও অনেক লম্বা।
আর সামনে অপেক্ষা করছিল আরও এক অদ্ভুত মোড়...