“শুক বলে ওঠ শারি ঘুমায়ো না আর,
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার।”
দুটি ছোট্ট লাইনের মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে মানুষের গোটা জীবনের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
এখানে ‘ঘুম’ শুধু চোখের ঘুম নয়। এই ঘুম হলো অলসতা, উদাসীনতা, আর সময়কে হেলায় হারিয়ে ফেলার প্রতীক।
মানুষ ভাবে— আজ না হয় থাক, কাল থেকে শুরু করব।
কিন্তু জীবন সবসময় সেই ‘কাল’-এর জন্য অপেক্ষা করে না।
অয়ন তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।
পড়াশোনায় সে খারাপ ছিল না। শিক্ষকরা তাকে নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। অঙ্ক ভালো লাগত, বিজ্ঞানের বই পড়তেও তার আগ্রহ ছিল। কিন্তু একটা সমস্যা ছিল—সে কোনো কাজ সময়মতো করতে চাইত না।
হোমওয়ার্ক? “পরে করব।”
পরীক্ষার প্রস্তুতি? “আরও তো কয়েকদিন বাকি।”
সকালে স্কুল? “আর পাঁচ মিনিট ঘুমাই।”
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
ঘড়িতে তখন সকাল ছ'টা।
অ্যালার্মের তীব্র শব্দে অয়নের ঘুম ভাঙল। বিছানার পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে অ্যালার্ম বন্ধ করল।
চোখ তখনও ভারী।
সে ভাবল, “আর পাঁচ মিনিট...”
বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে বাড়ছে।
পাঁচ মিনিট দশ মিনিট হয়ে গেল। দশ মিনিট কুড়ি মিনিট। অয়ন কিছুই টের পেল না।
হঠাৎ মায়ের গলা— “অয়ন! ওঠ! সাড়ে সাতটা বাজে!”
অয়ন ধড়মড় করে উঠে বসল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার চোখ কপালে। ৭টা ৩০!
আজ স্কুলে প্রার্থনা শুরু হয় আটটায়। তার মানে হাতে মাত্র তিরিশ মিনিট।
এরপর আর কোনো চিন্তা নেই। বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে জামা খোঁজা, ব্রাশ করতে করতে জুতোর ফিতে খোঁজা, এক হাতে ব্যাগ আর অন্য হাতে চিরুনি—
মা রান্নাঘর থেকে বললেন, “চা খাবি?”
“সময় নেই!”
“কিছু খেয়ে যা।”
“আজ থাক!”
দরজা দিয়ে বেরিয়ে অয়ন সাইকেলে উঠে পড়ল।
রাস্তা দিয়ে সাইকেল ছুটছে। ঘড়ির কাঁটা যেন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে।
স্কুল তখন আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু গেটের সামনে পৌঁছেই সে দেখল—প্রার্থনার ঘণ্টা বেজে গেছে।
বন্ধুরা মাঠে দাঁড়িয়ে। অয়ন সাইকেলটা রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে মাঠের দিকে এগিয়ে গেল।
তার বন্ধু রাহুল হেসে বলল, “আবার দেরি?”
অয়ন কোনো উত্তর দিল না। শুধু একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, আজ যদি সে মাত্র আধঘণ্টা আগে উঠত, তাহলে এতটা দৌড়াতে হতো না।
কিন্তু সেই মুহূর্তের আফসোসটুকু খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
ক্লাস শুরু হলো। পড়াশোনা হলো। টিফিন হলো। তারপর ছুটি।
বাড়ি ফিরে অয়ন ব্যাগটা একপাশে রেখে মোবাইল হাতে নিল।
মা বললেন, “আগে পড়তে বস।”
অয়ন বলল, “এই তো, একটু পরে।”
মা আর কিছু বললেন না।
সেদিন অয়ন জানত না— সকালে যে “আর পাঁচ মিনিট” তাকে স্কুলে দৌড় করিয়েছিল, বিকেলের এই “একটু পরে” একদিন তার জীবনের আরও অনেক বড় দৌড়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আর সময়? সে তো নিজের নিয়মেই এগিয়ে চলেছে। অয়নকে অপেক্ষা না করেই।