“মনে রেখো এ সংসারে যারা কর বাস,
সং ছাড়ি সারটিতে রাখ অভিলাষ।”
জীবনের পথে চলতে চলতে আমাদের সামনে প্রতিদিন কত কিছু আসে।
সবকিছুই কি সমান গুরুত্বপূর্ণ?
অয়ন তখন নবম শ্রেণিতে উঠেছে।
বয়সটা এমন, যখন পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, নতুন নতুন কৌতূহল—সবকিছুই তাকে টানে।
স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে সে প্রথমে বই খুলত।
কিন্তু বইয়ের পাশে রাখা মোবাইলটাই যেন তাকে বেশি করে ডাকত।
একদিন রাহুল তাকে বলল, “নতুন একটা ভিডিও এসেছে। দেখেছিস?”
অয়ন বই বন্ধ করে মোবাইলটা হাতে নিল।
— “না, দেখিনি।”
— “দারুণ! পাঁচ মিনিটের।”
পাঁচ মিনিটের ভিডিও শেষ হলো। তারপর আরেকটা। তারপর আরেকটা।
অয়ন যখন মোবাইলটা নামিয়ে রাখল, তখন প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে।
টেবিলের ওপর বইটা ঠিক আগের জায়গাতেই পড়ে আছে।
সে বই খুলল। অঙ্কের কয়েকটি সমস্যা সমাধান করতে হবে।
প্রথম অঙ্কটা করতে গিয়ে আটকে গেল।
মনে হলো— “আজ থাক। কাল ভালো করে করব।”
পরদিন স্কুলে শিক্ষক খাতা দেখতে চাইলেন।
অয়ন খাতা খুলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
খাতায় অঙ্কগুলো অসম্পূর্ণ।
শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি পারবে, অয়ন। কিন্তু শুধু পারলেই হবে না, সময়মতো কাজটাও করতে হবে।”
অয়ন মাথা নিচু করল।
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু সেদিন কথাটা তার মনে একটু দাগ কাটল।
তবুও অভ্যাস বদলাল না।
কয়েকদিন পর স্কুলে একটি আন্তঃশ্রেণি ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হলো।
অয়ন খেলতে খুব ভালোবাসত।
বিকেলের পর বিকেল মাঠে কাটতে লাগল।
খেলা খারাপ কিছু নয়। শরীর সুস্থ রাখতে খেলাধুলা দরকার। বন্ধুত্ব, দলগত কাজ, শৃঙ্খলা—খেলার মধ্যেও অনেক শিক্ষা আছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, অয়ন ধীরে ধীরে খেলার সময় আর পড়ার সময়ের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।
একদিন বাবা বললেন, “খেলবি, অবশ্যই খেলবি। কিন্তু নিজের ভবিষ্যতের জন্যও তো সময় রাখতে হবে।”
অয়ন হেসে বলল, “চিন্তা করো না বাবা। পরীক্ষা এখনও অনেক দেরি।”
বাবা আর কিছু বললেন না।
কারণ কিছু কথা মানুষকে বলে বোঝানো যায় না। সময়ই একদিন সেই কথার অর্থ বুঝিয়ে দেয়।
পরীক্ষা এগিয়ে এল।
অয়ন তখন একসঙ্গে অনেক কিছু সামলাতে গিয়ে বুঝল—সময়কে জমিয়ে রাখা যায় না।
যে অধ্যায়গুলো মাসখানেক আগে পড়া যেত, এখন সেগুলো কয়েক রাতের মধ্যে শেষ করতে হবে।
বন্ধুরা যখন পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি গুছিয়ে নিচ্ছে, অয়ন তখন বইয়ের পাতা উল্টে চলেছে দ্রুত হাতে।
রাতে পড়তে বসে হঠাৎ তার মনে হলো— “আমি যদি প্রতিদিন একটু একটু করে পড়তাম!”
কিন্তু এখন আর সেই প্রতিদিনগুলো তার হাতে নেই।
পরীক্ষা শেষ হলো।
ফল প্রকাশের দিন অয়ন আশানুরূপ নম্বর পেল না।
রাহুল ভালো করেছে।
অয়ন চুপ করে ফলের কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাড়ি ফেরার পথে সে প্রথমবার ভাবল— সব আনন্দ কি সত্যিই সমান?
এক ঘণ্টার একটি ভিডিও তাকে কী দিয়েছিল?
কয়েক ঘণ্টার অতিরিক্ত খেলা কি তার পরীক্ষার ফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
না। কিন্তু তখনও সে পুরো উত্তরটা জানত না।
সে শুধু বুঝতে শুরু করেছিল— জীবনে এমন কিছু আছে, যা মুহূর্তের আনন্দ দেয়। আর এমন কিছু আছে, যা ভবিষ্যৎ তৈরি করে। দুটিকে এক করে ফেললে সমস্যা হয়।
সেদিন রাতে অয়ন বই খুলে বসেছিল। মোবাইলটা টেবিলের অন্য প্রান্তে রেখে।
কতক্ষণ পড়েছিল, সে জানত না।
কিন্তু সেই রাতে প্রথমবার তার মনে হয়েছিল— সময়কে শুধু কাটিয়ে দিলেই হয় না। সময়কে কোথায় ব্যয় করছি, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
জানালার বাইরে তখন রাত গভীর।
ঘড়ির কাঁটা নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে।
অয়ন বইয়ের পাতায় চোখ রাখল।
তার সামনে তখনও অনেক বছর পড়ে আছে।
সে জানত না, সেই “অনেক বছর” একদিন কত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।