সূচিপত্রে ফিরুন
আপনি আগে এই পর্বটি পড়ছিলেন — সেখান থেকে চালিয়ে যাবেন?
নদীর ধারে সূর্যাস্তে বসে থাকা একজন মানুষ, স্রোতের দিকে তাকিয়ে
নদী কখনও পেছনে ফিরে দেখে না — সে শুধু বয়ে চলে।
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার

পর্ব ৬ : সময় নদীর স্রোতের মতো

জন্মদিনের রাতের পর অয়নের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছিল।

বাইরে থেকে দেখলে কিছুই বদলায়নি।

সকাল হয়। অফিস হয়। সংসারের কাজ চলে। মানুষজনের সঙ্গে দেখা হয়। দিন শেষে রাত নামে।

কিন্তু অয়ন এখন আগের মতো সময়কে শুধু ঘড়ির কাঁটায় মাপত না।

সে সময়কে অনুভব করতে শুরু করেছিল।

একদিন অফিসে যাওয়ার পথে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সে দেখল, একটি দোকানের সামনে কয়েকজন মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।

কেউ একজন বলল,

— “আর মাত্র দুই মিনিট!”

কাছেই একটি ফুটবল ম্যাচের বড় পর্দায় খেলা চলছে।

দলটি এক গোলে এগিয়ে।

ম্যাচের শেষ মুহূর্ত।

দর্শকদের মুখে টানটান উত্তেজনা।

এক মিনিট।

তারপর আরও কয়েকটি সেকেন্ড।

প্রতিপক্ষ মরিয়া হয়ে আক্রমণ করছে।

যে দলটি এতক্ষণ সময়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল, তারাই এখন চাইছে সময় যেন দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

কেউ বলছে—

— “রেফারি, বাঁশি বাজান!”

অয়ন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল।

তার মনে হলো, সময়ের মূল্য কত অদ্ভুত!

একই এক মিনিট।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেলে সেই এক মিনিটের মূল্যও বদলে যায়।

কখনও এক মিনিট মনে হয় খুব দীর্ঘ।

কখনও এক ঘণ্টাও চোখের পলকে চলে যায়।

কয়েকদিন পর আরেকটি ঘটনা ঘটল।

অফিস থেকে ফেরার সময় অয়ন রাস্তা পার হচ্ছিল।

হঠাৎ ডান দিক থেকে একটি বাইক দ্রুতগতিতে এসে তার একেবারে পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

অয়ন এক পা পিছিয়ে গেল।

বাইকটি চলে গেল কয়েক হাত দূরে।

সবকিছু ঘটল এক মুহূর্তে।

সে কিছুক্ষণ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রইল।

বুকের ভেতরটা ধকধক করছে।

তারপর ধীরে ধীরে মনে হলো—

মাত্র এক সেকেন্ড।

একটি সেকেন্ড আগে যদি সে রাস্তার মাঝখানে পৌঁছে যেত?

একটি সেকেন্ড পরে যদি বাইকটি আসত?

একটু এদিক-ওদিক হলেই হয়তো আজকের সন্ধ্যাটা অন্যরকম হতে পারত।

অয়ন আকাশের দিকে তাকাল।

সেদিন তার কাছে সময় আর ঘণ্টা, মিনিট কিংবা সেকেন্ডের হিসাব ছিল না।

সময় তখন হয়ে উঠেছিল—

জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের একটি সূক্ষ্ম রেখা।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অয়ন বারান্দায় বসে ছিল।

তার মেয়ে পড়াশোনা করছিল।

হঠাৎ সে বলল,

— “বাবা, কাল আমার প্রজেক্টটা জমা দিতে হবে।”

অয়ন বলল,

— “হয়ে গেছে?”

মেয়ে মাথা নেড়ে বলল,

— “না। ভাবছিলাম রাতে করব।”

অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

— “রাত তো আসবেই। কিন্তু সময়টা কি তোমার জন্য থেমে থাকবে?”

মেয়ে বাবার দিকে তাকাল।

অয়ন আর কিছু বলল না।

সে বুঝেছিল, সময়ের শিক্ষা বক্তৃতা দিয়ে বোঝানো যায় না।

কখনও একটি দেরি করে ওঠা সকাল শেখায়।

কখনও পরীক্ষার ফল।

কখনও খেলার শেষ কয়েকটি মিনিট।

আবার কখনও একটি দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া এক সেকেন্ড।

অয়ন সেদিন রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

দূরে নদীর ওপর আলো পড়েছে।

জলের স্রোত নিরন্তর এগিয়ে যাচ্ছে।

এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—

মানুষের জীবনও কি এমন নয়?

নদী কখনও পেছনে ফিরে দেখে না, কোন পাথর কোথায় ছিল।

সে শুধু বয়ে চলে।

সময়ও তাই।

শৈশব চলে যায়।

কৈশোর চলে যায়।

যৌবন চলে যায়।

চাকরির বয়স চলে যায়।

একদিন অবসরও এসে দাঁড়ায়।

আমরা চাই বা না চাই—জীবনের প্রতিটি অধ্যায় নিজের সময়মতো শেষ হয়ে যায়।

কিছু মুহূর্ত আমরা আনন্দে কাটাই।

কিছু মুহূর্ত দুঃখে।

কিছু মুহূর্ত ব্যস্ততায়।

আর কিছু মুহূর্ত অকারণে হারিয়ে ফেলি।

কিন্তু সময় কাউকেই আলাদা করে হিসাব দেয় না।

সে শুধু চলে যায়।

অয়ন নিজের খাতাটা খুলল।

জন্মদিনের রাতে লেখা তিনটি সংকল্পের নিচে আজ আরেকটি বাক্য লিখল—

“সময়কে ধরে রাখা যায় না। কিন্তু সময়কে অর্থপূর্ণ করা যায়।”

কলমটা নামিয়ে সে অনেকক্ষণ সেই কথাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, এতদিন সে সময়কে হারানোর ভয় পেয়েছে।

এবার থেকে সে সময়কে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে।

কারণ নদীর স্রোতকে থামানো যায় না।

কিন্তু একজন মানুষ চাইলে তার নৌকাটাকে সঠিক দিকে চালাতে পারে।

আর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো সেটাই—

স্রোত কত দ্রুত বয়ে গেল, সেটা নয়। সেই স্রোতের মধ্যে আমরা আমাদের জীবনকে কোন দিকে নিয়ে গেলাম?

অয়ন জানত না সামনে তার জন্য আর কত বছর অপেক্ষা করছে।

কিন্তু আজকের দিনটি তার হাতে ছিল।

আর সে সিদ্ধান্ত নিল—

আজকের দিনটিকে আর শুধু পার করে দেবে না।