সূচিপত্রে ফিরুন
আপনি আগে এই পর্বটি পড়ছিলেন — সেখান থেকে চালিয়ে যাবেন?
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার

পর্ব ৫ : আর একটি বছর

অয়নের চল্লিশতম জন্মদিন।

সকাল থেকেই বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ।

মা সকালে পায়েস রান্না করেছেন। স্ত্রী বাজার থেকে অয়নের পছন্দের কিছু খাবার এনেছে। মেয়েটা নিজের হাতে একটা ছোট্ট কার্ড বানিয়ে বাবার হাতে দিয়ে বলল,

— “বাবা, শুভ জন্মদিন!”

অয়ন মেয়েকে জড়িয়ে ধরল।

সারাদিন ফোনে শুভেচ্ছা এসেছে।

বন্ধুদের মেসেজ।

সহকর্মীদের শুভেচ্ছা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক পোস্ট।

সব মিলিয়ে দিনটা আনন্দেই কাটল।

সন্ধ্যায় কেক এল।

ঘরের আলো কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হলো।

কেকের ওপর চল্লিশটি মোমবাতি।

সবাই একসঙ্গে বলল—

“হ্যাপি বার্থডে!”

অয়ন মোমবাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর একে একে সেগুলো নিভিয়ে দিল।

সবাই হাততালি দিল।

মেয়েটা বলল,

— “বাবা, কী হলো? এত চুপ করে আছ কেন?”

অয়ন হেসে বলল,

— “কিছু না।”

কিন্তু সত্যিই কি কিছু না?

রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর অয়ন একা বসে রইল।

টেবিলের ওপর জন্মদিনের কেকের শেষ টুকরোটা পড়ে আছে।

পাশে সেই মোমবাতিগুলো।

সে একটি মোমবাতি হাতে তুলে নিল।

হঠাৎ তার মনে হলো—

আজ কি সত্যিই তার জীবনে আরও একটি বছর যোগ হলো?

নাকি—

তার জীবন থেকে আরও একটি বছর চলে গেল?

প্রশ্নটা তার মাথা থেকে আর সরল না।

সে একটা খাতা বের করল।

পাতার ওপরে লিখল—

“আমার গত এক বছর”

তারপর নিচে কয়েকটি প্রশ্ন।

আমি কী শিখেছি?

কিছুক্ষণ কলম থেমে রইল।

একটি নতুন দক্ষতা?

না।

একটি নতুন বই?

দু-একটি।

কোনো অসমাপ্ত কাজ শেষ করেছি?

কিছু।

পরিবারকে সময় দিয়েছি?

হ্যাঁ, কিন্তু আরও দেওয়া যেত।

নিজের জন্য সময়?

খুব কম।

সমাজের জন্য কিছু?

সামান্য।

অয়ন অনেকক্ষণ খাতার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর দ্বিতীয় প্রশ্ন লিখল—

“আমার এক বছর কোথায় গেল?”

এবার উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ হলো।

অফিসের ব্যস্ততা।

অপ্রয়োজনীয় ফোন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

অকারণ ভিডিও।

ক্লান্তির পরে উদ্দেশ্যহীন সময় কাটানো।

সবকিছু যোগ করলে একটা অস্বস্তিকর সত্য সামনে এল।

বছরটা চলে গেছে।

কিন্তু বছরটাকে সে কতটা ব্যবহার করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে পরিষ্কার ছিল না।

অয়ন চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেল।

বাইরে রাত।

রাস্তার আলো জ্বলছে।

দূরে কোনো বাড়িতে এখনও টেলিভিশনের শব্দ।

সবকিছু স্বাভাবিক।

শুধু অয়নের ভেতরে যেন কিছু একটা বদলে গেছে।

সে ভাবল—

শৈশবে একটা দিন মানে ছিল অনেক বড় একটা সময়।

স্কুলে এক ঘণ্টা ক্লাস শেষ হতে চাইত না।

খেলার মাঠে দুই ঘণ্টা কখন চলে যেত, বোঝাই যেত না।

আর এখন?

সপ্তাহ কেটে যায়।

মাস কেটে যায়।

বছর কেটে যায়।

ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো যেন নিজেরাই উল্টে যায়।

অয়ন ডেস্কে ফিরে এসে খাতার নিচে আরেকটি প্রশ্ন লিখল—

“পরের জন্মদিনে আমি কী উত্তর দিতে চাই?”

এবার সে আর অনেক কিছু লিখল না।

মাত্র তিনটি বাক্য লিখল—

একটি নতুন দক্ষতা শিখব।

একটি ভালো অভ্যাস তৈরি করব।

আমার সময়ের একটা অংশ অন্যের কাজে লাগাব।

খাতা বন্ধ করার আগে অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার মনে হলো, জন্মদিনের সবচেয়ে বড় উপহার সে আজই পেয়েছে।

কেউ তাকে দেয়নি।

সে নিজেই নিজেকে দিয়েছে—

নিজের সময়ের হিসাব করার সাহস।

ঘড়িতে তখন রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে।

চল্লিশতম জন্মদিন শেষ।

একচল্লিশতম বছরের প্রথম দিন শুরু।

অয়ন জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল—

“এবার বছরটা শুধু পার করব না। বছরটাকে কাজে লাগাব।”

ঘড়ির কাঁটা চলতেই থাকল।

কিন্তু এবার অয়ন প্রথমবার তার চলার শব্দ শুনতে পেল।

গানের কথা: তপন সিংহ

চলচ্চিত্র: গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬)