অয়ন এবার কলেজে উঠেছে।
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন পরিবেশ। নতুন বন্ধু, নতুন স্বাধীনতা, নতুন স্বপ্ন।
স্কুলের সেই ছোট্ট মাঠের বদলে এখন তার সামনে বড় পৃথিবী।
কখনও সে খুব আনন্দে থাকে। আবার কোনো দিন সামান্য ব্যর্থতাতেই মন খারাপ হয়ে যায়।
একদিন কলেজে পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো।
অয়ন ভেবেছিল ভালো করবে।
কিন্তু ফল হাতে নিয়ে তার মুখটা শুকিয়ে গেল।
প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম নম্বর।
বন্ধুদের কেউ খুব ভালো করেছে। কেউ বৃত্তিও পেয়েছে।
অয়ন চুপচাপ কলেজের বারান্দায় বসে রইল।
তার বন্ধু রাহুল এসে পাশে বসল।
— “কী হয়েছে?”
অয়ন বলল, — “আমার দ্বারা কিছু হবে না মনে হয়।”
রাহুল হেসে বলল, — “একটা পরীক্ষার ফল দিয়ে জীবন ঠিক হয় না।”
অয়ন কোনো উত্তর দিল না।
সেদিন বাড়ি ফিরে তার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।
বাবা বুঝতে পেরে বললেন, — “ব্যর্থতা এসেছে, ঠিক আছে। কিন্তু ব্যর্থতার সঙ্গে বসে থেকো না। ওকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাও।”
কথাটা অয়নের মনে রইল।
কয়েকদিন পর কলেজে একটি প্রতিযোগিতা হলো। অয়ন সেখানে অংশ নিল।
অবিশ্বাস্যভাবে সে প্রথম হলো।
যে ছেলেটি কয়েকদিন আগেই ভেবেছিল তার দ্বারা কিছু হবে না, সেই ছেলেটিই সেদিন মঞ্চে উঠে পুরস্কার নিল।
বন্ধুরা হাততালি দিল।
অয়নও হাসল।
কিন্তু ফেরার পথে তার মনে হলো— কয়েকদিন আগের দুঃখ কোথায় গেল?
যে দুঃখটাকে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে হয়েছিল, সেটাই তো আজ আর নেই।
সেদিন সে প্রথমবার বুঝল— সুখও স্থায়ী নয়, দুঃখও নয়।
জীবনে ভালো সময় আসবে, আবার খারাপ সময়ও আসবে।
কিন্তু সময় নিজে থেমে থাকে না। সে এগিয়ে যায়।
কলেজের শেষ বর্ষে অয়ন চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
তার সামনে তখন অনেকগুলো পথ।
কেউ বলল সরকারি চাকরির চেষ্টা কর। কেউ বলল বেসরকারি চাকরি ভালো। কেউ বলল ব্যবসা কর।
অয়ন সবকিছু নিয়ে ভাবতে লাগল।
একদিন রাহুল বলল, — “তুই একটা সিদ্ধান্ত নে। সবকিছু একসঙ্গে করতে গেলে কোনো কিছুই ঠিকমতো হবে না।”
অয়ন বুঝল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো কোন পথে সময় দেওয়া উচিত, সেটা ঠিক করা।
সে একটি লক্ষ্য বেছে নিল।
প্রথম পরীক্ষায় ব্যর্থ হলো। দ্বিতীয়বারও। তৃতীয়বারও।
প্রতিবারই মনে হলো—আর হবে না।
কিন্তু এবার সে আগের অয়নের মতো হাল ছেড়ে দিল না।
ব্যর্থতাকে সে এবার ফলাফল হিসেবে দেখল, পরিচয় হিসেবে নয়।
প্রতিবার ভুলগুলো লিখে রাখল। কোথায় কমতি ছিল, তা খুঁজে বের করল। তারপর আবার প্রস্তুতি নিল।
কয়েক মাস পর একটি পরীক্ষায় সে ভালো ফল করল।
চাকরি পেল না এখনও, কিন্তু এবার তার আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে।
সে বুঝল— জীবনের সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় সবই আসা-যাওয়া করে।
কিন্তু একটি জিনিস নীরবে এগিয়ে যায়— সময়।
ব্যর্থতার সময়ও সময় চলে যায়। সাফল্যের সময়ও সময় চলে যায়।
আমরা কাঁদি বা হাসি—ঘড়ির কাঁটা তার নিজের পথেই হাঁটে।
সেদিন রাতে অয়ন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
কিছু মুহূর্ত আনন্দের। কিছু দুঃখের। কিছু গর্বের। কিছু আফসোসের।
কিন্তু কোনো মুহূর্তই আর ফিরে আসে না।
অয়ন তখনও জানত না, সামনে তার জীবনের এমন একটি সময় আসছে, যখন তাকে শুধু ব্যর্থতার সঙ্গে নয়—নিজের অতীতের সঙ্গেও হিসাব মেলাতে হবে।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল।
আর অয়ন ধীরে ধীরে জীবনের পরের অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে গেল।