সূচিপত্রে ফিরুন
আপনি আগে এই পর্বটি পড়ছিলেন — সেখান থেকে চালিয়ে যাবেন?
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার

পর্ব ৪ : কী পেলাম, কী হারালাম

সময় কখন যে মানুষকে এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে নিয়ে যায়, তা বোঝা যায় না।

অয়ন এখন চাকরি করছে।

নিজের আয় আছে। সংসারের দায়িত্ব আছে। মাসের শুরুতে বেতন আসে, মাসের শেষে হিসাব মেলাতে হয়।

একসময় যে ছেলেটি পরীক্ষার খাতা হাতে নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করত, এখন তার চিন্তা অনেক বড়।

বাড়ির খরচ। বাবা-মায়ের প্রয়োজন। সংসারের নানা দায়িত্ব। অফিসের কাজ।

সব মিলিয়ে দিনগুলো যেন ছোট হয়ে এসেছে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা অফিস। সন্ধ্যার পর বাড়ি।

কখনও ক্লান্ত শরীরে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা, কখনও মোবাইল হাতে নিয়ে অকারণে সময় কাটানো।

একদিন রাতে আলমারি গোছাতে গিয়ে অয়ন পুরোনো একটি ফাইল বের করল।

ভেতরে স্কুলের রিপোর্ট কার্ড। কলেজের কিছু কাগজ। পুরোনো সার্টিফিকেট। আর একটি ছবি।

ছবিটায় সে আর রাহুল দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের মাঠে।

দুজনের বয়স তখন খুব কম।

অয়ন ছবিটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।

তারপর হঠাৎ হাসিটা থেমে গেল।

ছবির পেছনে রাহুলের হাতের লেখা— “একদিন আমরা অনেক বড় হব।”

অয়ন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

রাহুল সত্যিই অনেক বড় হয়েছে।

নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। নতুন কিছু শিখেছে। বছরের পর বছর নিজের দক্ষতা বাড়িয়েছে।

আর অয়ন?

সে খারাপ নেই। চাকরি আছে। সংসার আছে।

কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো— সে কি তার সামর্থ্যের পুরোটা ব্যবহার করতে পেরেছে?

প্রশ্নটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলল।

সেই রাতে ঘুম এল না।

সে বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

মনে পড়তে লাগল জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো।

যে কোর্সটা করবে বলে শেষ পর্যন্ত করেনি।

যে বইটা পড়বে বলে কিনেছিল, এখনও আলমারিতে পড়ে আছে।

যে পরীক্ষাটা দেওয়ার কথা ছিল, শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি না থাকায় আর দেয়নি।

যে সুযোগটা এসেছিল, নিজের ওপর বিশ্বাস না থাকায় ফিরিয়ে দিয়েছিল।

একটা একটা করে স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল।

কোনোটাই একা খুব বড় ভুল নয়।

কিন্তু ছোট ছোট অবহেলা একসঙ্গে মিলে যে কতটা বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে, সেটা অয়ন সেদিন প্রথমবার বুঝতে পারল।

পরদিন অফিসে রাহুলের সঙ্গে দেখা হলো।

অনেকদিন পর দুজনের দেখা।

চায়ের দোকানে বসে গল্প করতে করতে রাহুল বলল, — “তুই এখনও নতুন কিছু শেখার কথা ভাবিস?”

অয়ন একটু হেসে বলল, — “ভাবি তো।”

— “তাহলে শুরু করিস না কেন?”

অয়ন চুপ।

রাহুল বলল, — “সময় না থাকার অজুহাত দিস না। সময় সবারই সীমিত। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন কাজটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি।”

কথাটা অয়নের মনে গেঁথে গেল।

সে বুঝল, এতদিন সে সময়ের অভাবকে দায়ী করেছে।

কিন্তু সত্যিটা হয়তো অন্য জায়গায়।

তার কাছে সময় ছিল।

শুধু সময়ের একটা অংশকে সে গুরুত্ব দেয়নি।

সেদিন বাড়ি ফিরে অয়ন নিজের ডেস্ক পরিষ্কার করল।

পুরোনো বইগুলো বের করল।

একটি খাতা খুলে প্রথম পাতায় লিখল— “যা হারিয়েছি, তার হিসাব নয়। এখন যা আছে, তার ব্যবহার।”

তারপর নিচে লিখল— “প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা নিজের জন্য।”

সেদিন থেকে তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেল না।

পরদিনও অফিস ছিল। সংসারের কাজ ছিল। ক্লান্তিও ছিল।

কিন্তু দিনের শেষে সেই এক ঘণ্টা সে নিজের জন্য রাখল।

কখনও বই পড়ল। কখনও নতুন কিছু শিখল। কখনও নিজের পুরোনো অসমাপ্ত কাজ শেষ করল।

কিছুদিন পর সে বুঝল— নিজেকে বদলানোর জন্য সবসময় বড় কোনো সুযোগের প্রয়োজন হয় না।

ছোট ছোট সময়ও যথেষ্ট—যদি তাকে গুরুত্ব দেওয়া যায়।

কিন্তু অয়ন জানত না, জীবনের সবচেয়ে কঠিন হিসাবটা এখনও বাকি।

কারণ সামনে আসছিল তার চল্লিশতম জন্মদিন।

আর সেই জন্মদিনেই একটি প্রশ্ন তাকে এমনভাবে নাড়া দেবে, যার উত্তর এড়িয়ে যাওয়া আর সম্ভব হবে না।

“আর একটি বছর চলে গেল—আমি আসলে কী পেলাম?”

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল।

অয়নও এগিয়ে চলল তার জীবনের সেই প্রশ্নের দিকে।